বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সবশেষ নির্বাচন নিয়ে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) তদন্ত প্রতিবেদনকে ‘ত্রুটিপূর্ণ’, ‘খামখেয়ালি’ এবং ‘আইনি ভিত্তিহীন’ আখ্যা দিয়ে তা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন সদ্য সাবেক সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল। এ ঘটনায় তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।
বুলবুল তার বিবৃতিতে বলেন, এনএসসির করা এই তদন্ত একটি ‘দুরভিসন্ধিমূলক উদ্যোগ’ এবং ৫ এপ্রিল ২০২৬ জমা দেওয়া প্রতিবেদন আইনের দৃষ্টিতে বৈধ নয়। তিনি আরও বলেন, ওই নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়া বিসিবির সংবিধান মেনেই পরিচালিত হয়েছিল এবং নির্বাচন ছিল স্বচ্ছ।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর গঠিত তিন সদস্যের বৈধ নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়। সেই কমিশনের প্রধান ছিলেন বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ হোসাইন। নির্বাচন কমিশনার হিসেবে ছিলেন সিআইডির প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি সিবগত উল্লাহ এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের নির্বাহী পরিচালক (যুগ্ম সচিব)।
বুলবুল জানান, নির্বাচনের আগে ১৫টি ক্লাব এবং তামিম ইকবালের কাউন্সিলরশিপ নিয়ে যেসব আপত্তি উঠেছিল, সেগুলো ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বর কোয়াসি-জুডিসিয়াল শুনানির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছিল। তার দাবি, এরপর নির্ধারিত সময়েই ৬ অক্টোবর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনকে ‘ফিক্সিং’ বলে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা কিছু সাবেক ক্রিকেটারের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে তৈরি করা একটি ভিত্তিহীন প্রচারণা।
বুলবুলের দাবি, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের এই তদন্তের কোনো এখতিয়ারই নেই। তার মতে, একটি স্বায়ত্তশাসিত ক্রীড়া সংস্থার সমাপ্ত নির্বাচন প্রক্রিয়া তদন্ত করার ক্ষমতা এনএসসির নেই। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সংবিধান অনুযায়ী সদস্য বোর্ডগুলোকে সরকারি হস্তক্ষেপ থেকে মুক্তভাবে পরিচালিত হতে হয়। এনএসসির এই তদন্তকে তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিহিংসা বলে আখ্যা দেন এবং বলেন, এই প্রতিবেদন আইনি ভাষায় ‘কো নন জুডিসিবাস’, অর্থাৎ এখতিয়ার না থাকায় এটি বাতিলযোগ্য।
বিবৃতিতে তিনি বিসিবির নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া এবং নতুন অ্যাডহক কমিটি গঠনকেও অবৈধ বলে দাবি করেন। তার মতে, নির্বাচিত বোর্ড ভেঙে দিয়ে তামিম ইকবালের নেতৃত্বে যে অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়েছে, তা সংবিধানবিরোধী এবং আইসিসির নিয়মেরও লঙ্ঘন। তিনি বলেন, এনএসসির এমন কোনো ক্ষমতা নেই, যাতে একটি নির্বাচিত বোর্ডকে ভেঙে দেওয়া যায়- শুধু বিশেষ কিছু চরম পরিস্থিতি ছাড়া, যা এখানে ঘটেনি। তার দাবি, এই অ্যাডহক কমিটি একটি ভুয়া ‘সত্তা’ এবং তাদের কর্তৃত্ব বিসিবির পক্ষ থেকে স্বীকৃত নয়।
বুলবুল বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করছে। তার মতে, সরকার যদি ভোটকে অগ্রাহ্য করে এবং আইনকে পাশ কাটিয়ে একটি সমাপ্ত নির্বাচন প্রক্রিয়াকে অস্থিতিশীল করে, তাহলে তা বাংলাদেশের ক্রিকেটকে গভীর অন্ধকারে ঠেলে দেবে। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ক্রিকেটের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এমন পরিস্থিতিতে কে বাংলাদেশের ক্রিকেট লিগে বিনিয়োগ করবে বা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজনের ওপর আস্থা রাখবে।
তিনি আরও দাবি করেন, এই রাজনৈতিক অস্থিরতা ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ের ক্রিকেটারদের উন্নয়ন ও ক্রিকেটের পথচলা অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, যখন দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩ শতাংশে নেমে এসেছে এবং শিল্প উৎপাদনও সংকুচিত হচ্ছে, তখন খেলাধুলায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ দেশের অর্থনীতি বা তরুণদের কোনো উপকার করবে না।
বিবৃতির শেষে বুলবুল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তার দাবি, নির্বাচিত বোর্ডের বৈধতা রক্ষা এবং ক্রিকেট প্রশাসনের স্বাধীনতা বজায় রাখতে আইসিসির দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর নিরপেক্ষ তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের বৈধতা কোনো সরকারি সংস্থা পরবর্তীতে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে না। বুলবুলের দাবি, হাইকোর্ট অন্য কোনো রায় না দেওয়া পর্যন্ত তিনিই বিসিবির একমাত্র বৈধ সভাপতি হিসেবে দায়িত্বে আছেন।
এর আগে মঙ্গলবার বিকাল ৪টার পর আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন বিসিবির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। এরপর তামিম ইকবালকে সভাপতি করে ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটির নাম ঘোষণা করা হয়। যে কমিটি আগামী তিন মাস বোর্ড চালাবে ও নির্বাচন আয়োজন করবে। এরপর বিসিবিতে এসে তামিম বাকি সদস্যদের নিয়ে মিটিং করেন। তারপর প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, দেশের ক্রিকেটের ভাবমূর্তি উদ্ধার করাই তার কমিটির লক্ষ্য।
এসকেডি/এএমএ