স্ক্যানার বিকল হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে (পিসিটি) চার দিন ধরে বন্ধ কনটেইনার ডেলিভারি। এতে বিপাকে পড়েছে টার্মিনালটি দিয়ে পণ্য আনা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। দেশের একমাত্র বিদেশি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এ কনটেইনার টার্মিনালে আটকা পড়েছে শত শত কনটেইনার।
সরবরাহ নিতে না পেরে আমদানি করা কাঁচামাল সংকটে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে অনেক শিল্প-কারখানায়—এমন অভিযোগ উদ্যোক্তাদের। তবে বুধবার (৮ এপ্রিল) বিশেষ ব্যবস্থাপনায় কনটেইনার সরবরাহ দেওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছে কাস্টমস।
আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, শিপিং ব্যবসায়ীসহ পিসিটি ব্যবহারকারী বেশ কয়েক অংশীজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পিসিটিতে স্ক্যানারটি বিকল থাকায় সরাসরি কনটেইনার ডেলিভারি বন্ধ রয়েছে। এতে বেসরকারি ডিপোগুলোতে কোনো কনটেইনার নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি আনচেকড ডেলিভারিও নিতে পারছেন না আমদানিকারকরা। এতে আমদানি করা কাঁচামাল সংকটে পড়েছে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান।
ব্যবহারকারীদের অভিযোগ, পিসিটির নিজস্ব সমস্যার কারণে কনটেইনার ডেলিভারি দিতে না পারলেও শিপিং ডেমারেজসহ আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে আমদানিকারকদের।
৯০ শতাংশ ম্যাটেরিয়ালস আমরা চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করি। পিসিটি এবং বন্দর ও তাদের আওতাধীন ডিপোগুলো থেকে পণ্য ডেলিভারি নেই। কিন্তু স্ক্যানার নষ্ট থাকায় পিসিটি থেকে গত ৫ এপ্রিল থেকে আমরা আনচেকড ডেলিভারি নিতে পারছি না।-প্রাণ-আরএফএলের চিফ সাপ্লাই চেইন অফিসার তানজির হেলাল
পিসিটিতে পণ্য খালাস নেওয়ার কাজে যুক্ত সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান অনির্বানের জেটি সরকার মো. মহিউদ্দিন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘গত ৫ মার্চ থেকে পিসিটিতে স্ক্যানার বিকল। এতে আনচেকড কনটেইনার ডেলিভারি হচ্ছে না। কিন্তু কাভার্ডভ্যানে এলসিএল পণ্য খালাস হচ্ছে। আমরাও মঙ্গলবার খালাস নিয়েছি। তবে ডেলিভারি না হওয়ায় পিসিটিতে বর্তমানে শত শত এফসিএল কনটেইনার আটকা পড়েছে।’
পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল
দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প গ্রুপ প্রাণ-আরএফএলের চিফ সাপ্লাই চেইন অফিসার তানজির হেলাল জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রাণ-আরএফএল যৌথভাবে বছরে প্রায় ৪০ হাজার এককের বেশি কনটেইনার নানান কাঁচামাল আমদানি করে। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ ম্যাটেরিয়ালস আমরা চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করি। পিসিটি এবং বন্দর ও তাদের আওতাধীন ডিপোগুলো থেকে পণ্য ডেলিভারি নেই। কিন্তু স্ক্যানার নষ্ট থাকায় পিসিটি থেকে গত ৫ এপ্রিল থেকে আমরা আনচেকড ডেলিভারি নিতে পারছি না।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের খাদ্যপণ্যের আমদানি করা কাঁচামালে যাতে বাইরের ক্ষতিকর কোনো পদার্থ মিশতে না পারে এজন্য পুরো কনটেইনারসহ কারখানায় নিয়ে আসি। এ কারণে পোর্ট থেকে কনটেইনার বের করতে স্ক্যানিং করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু স্ক্যানার নষ্ট থাকায় গত চারদিন আমরা কোনো কনটেইনার বের করতে পারিনি। এতে আমাদের প্রায় দেড়শোর মতো কনটেইনার বন্দরে আটকে আছে।’
পিসিটি থেকে আমাদের ডিপোগুলোতে প্রতিদিন গড়ে ৪-৫শ কনটেইনার আসে। কিন্তু স্ক্যানার বিকল থাকায় কয়েকদিন ধরে কোনো কনটেইনার আসছে না। কনটেইনারগুলো পিসিটিতে আটকা আছে।-বিকডা মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বিপ্লব
তানজির বলেন, ‘এসব কাঁচামাল না পাওয়ায় আমাদের দুটি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এতে ভোক্তারা নির্ধারিত সময়ে আমাদের পণ্যগুলো পাবেন না। আবার উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকসহ কারখানার অপারেশনাল ব্যয়গুলো করতে হচ্ছে।’
স্ক্যানার বিকল থাকলেও বন্দরের নির্ধারিত ডেমারেজ গুনতে হতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘একইভাবে শিপিং লাইনের ডেমারেজও গুনতে হচ্ছে। এর মধ্যে বন্দরের ডেমারেজ মওকুফ পেলেও শিপিং লাইনগুলোর ডেমারেজ আমাদের ওপর বর্তাবে। এতে আমরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। ৫ এপ্রিল থেকে আমরা কনটেইনারপ্রতি ৭২ ডলার করে ডেমারেজ গুনছি। সব মিলিয়ে সমস্যাটি ছোট হলেও শিল্পের বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে।’
বেসরকারি ডিপো মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বিপ্লব জাগো নিউজকে বলেন, ‘পিসিটি থেকে আমাদের ডিপোগুলোতে প্রতিদিন গড়ে ৪-৫শ কনটেইনার আসে। কিন্তু স্ক্যানার বিকল থাকায় কয়েকদিন ধরে কোনো কনটেইনার আসছে না। কনটেইনারগুলো পিসিটিতে আটকা আছে।’
পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল
তিনি বলেন, ‘ফ্রি টাইমে চারদিন পর বন্দর ও শিপিং ডেমারেজ আসার কথা। যেহেতু টার্মিনালের নিজস্ব সমস্যার জন্য কনটেইনার ডেলিভারি দিতে পারছে না, সেক্ষেত্রে তাদের ডেমারেজ তারা মওকুফ করতে পারে। তবে বিদেশি শিপিং লাইনগুলো ডেমারেজ গুনতে হতে পারে। এতে আমদানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’
আরএসজিটির হেড অব কমার্শিয়াল সৈয়দ আরেফ সরওয়ার জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা মাসে মাসে স্ক্যানারের সার্ভিসিং করি। কনটেইনার ডেলিভারিতে বড় কোনো সমস্যা ছিল না। টেকনিক্যাল যে সমস্যাগুলো হয়েছিল, সেগুলো আমরা সলভ করেছি। বুধবার বিকেল থেকে কনটেইনার ডেলিভারি শুরু হয়েছে।
পিসিটি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চলে। বন্দরের কোনো হস্তক্ষেপ থাকে না। তবে স্ক্যানার বিকল হলেও কাস্টমসে আবেদন করে আমদানিকারক কনটেইনার ডেলিভারি নিতে পারেন। এক্ষেত্রে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ম্যানুয়ালি কনটেইনারের পণ্য পরীক্ষা করে খালাসের ব্যবস্থা নেয়।-চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) এনামুল করিম
তবে চট্টগ্রাম কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়ার্ডিং অ্যাসোসিয়েশনের (সিঅ্যান্ডএফ) সাধারণ সম্পাদক মো. শওকত আলী জাগো নিউজকে বলেন, ‘বুধবার বিকেল থেকে বিকল্প ব্যবস্থায় কনটেইনার ডেলিভারির পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আরসিজিটিতে গত কয়েকদিন ধরে স্ক্যানার বিকল। এতে টার্মিনালটি থেকে কনটেইনার ডেলিভারি বন্ধ ছিল। ফলে আমদানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যে কারণে আমরা কাস্টমস কমিশনারকে বলে আজ (বুধবার) বিকেল থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় কনটেইনার ডেলিভারির ব্যবস্থা করেছি। বিকেল তিনটা থেকে কনটেইনার ডেলিভারি শুরু হয়েছে।’
আরও পড়ুনচালু হচ্ছে পতেঙ্গা টার্মিনাল, ‘অগ্রগতি’ নেই বে-টার্মিনালেরপণ্য হ্যান্ডলিংয়ে গতি বাড়াবে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালচট্টগ্রাম বন্দরে প্রথম বিদেশি অপারেটরের কার্যক্রম শুরু
কথা হলে আরএসজিটির হেড অব কমার্শিয়াল সৈয়দ আরেফ সরওয়ার জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা মাসে মাসে স্ক্যানারের সার্ভিসিং করি। কনটেইনার ডেলিভারিতে বড় কোনো সমস্যা ছিল না। টেকনিক্যাল যে সমস্যাগুলো হয়েছিল, সেগুলো আমরা সলভ করেছি। বুধবার বিকেল থেকে কনটেইনার ডেলিভারি শুরু হয়েছে।’
জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব অর্থায়নে নগরীর পতেঙ্গায় পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) নির্মাণ করে। বিগত সরকারের আমলে জিটুজি ভিত্তিক সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) সৌদি আরবভিত্তিক প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালকে (আরএসজিটি) পিসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। চুক্তি মোতাবেক পিসিটিতে ১৭০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার কথা ছিল আরএসজিটির। এর বড় অংশ আধুনিক যন্ত্রপাতি আমদানিতে ব্যয় করার কথা।
২০২৪ সালের ১০ জুন প্রথম বাণিজ্যিক জাহাজ ভেড়ার মাধ্যমে অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু হয় পিসিটির। ইতোমধ্যে চারটি শিপ-টু-শোর (এসটিএস) গ্যান্ট্রি ক্রেন সংযোজন হয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাস থেকে নিজস্ব কনটেইনার স্ক্যানার স্থাপন করা হয়। আরএসজিটির বর্তমানে বার্ষিক সক্ষমতা আড়াই লাখ টিইইউএস। পুরোদমে অপারেশনে গেলে টার্মিনালটিতে চুক্তি মোতাবেক বছরে ছয় লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডেল করার কথা রয়েছে।
এমডিআইএইচ/এএসএ