দেশজুড়ে

সংকটের মধ্যেও ঐতিহ্যের টানে কর্মব্যস্ত মৃৎশিল্পীরা

মাটি সংকটে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন গ্যাস সরবরাহ বন্ধে বাড়ছে খরচ রপ্তানিতে চাহিদা থাকলেও সংকটে উৎপাদনে ভাটা ২২ টাকা মূলধনের প্রতিষ্ঠানের এখন ১০ কোটির সম্পদ

পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী বিজয়পুরে এখন চলছে মৃৎশিল্পীদের নিরলস কর্মযজ্ঞ। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কেউ মাটি প্রস্তুত, কেউ সানকি-দধির বাটি তৈরি, আবার কেউ আলপনা আঁকা কিংবা প্রতিকৃতি গড়ায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সমান তালে যুক্ত এই কাজে। তবে গ্যাস ও এঁটেল মাটির সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় উদ্বেগে রয়েছেন কারিগররা। দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হলেও প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেয়ে এ ঐতিহ্যবাহী শিল্প হুমকির মুখে রয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

সরেজমিনে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর রুদ্রপাল মৃৎশিল্প সমবায় সমিতি লিমিটেডে গিয়ে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাত্র ১৫ জন সদস্য নিয়ে ১৯৬১ সালে প্রগতি সংঘের নামে শুরু হয় এ মৃৎশিল্পের কার্যক্রম। শুরুতে প্রতিজন এক টাকায় একটি শেয়ার এবং ৫০ পয়সা আমানত রেখে অনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। ষাটের দশকে এদেশের সমবায় আন্দোলনের পথিকৃৎ ব্যক্তিত্ব ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সমাজবিজ্ঞানী প্রয়াত ড. আখতার হামিদ খানের উদ্যোগে বিজয়পুর রুদ্রপাল মৃৎশিল্প সমবায় সমিতির নামকরণ করা হয়। ২২ টাকা ৫০ পয়সা মূলধন নিয়ে শুরু হয় তাদের পথচলা।

‘পহেলা বৈশাখ উৎসব সার্বজনীন। এ উৎসবের বাকি আর মাত্র কয়েক দিন। দিনটিকে কেন্দ্র করে শহর-গ্রামে মেলাসহ বিভিন্ন উৎসব আয়োজন করা হয়। সেখানে মাটির হাঁস-মুরগি, হাতি-ঘোড়া, মাছ কিংবা পশুপাখি, মাটির ব্যাংক, মগ ও গ্লাসের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। এছাড়াও বাঙালির ঐতিহ্যবাহী খাবার পান্তা ইলিশের জন্য সানকি এবং দই-চিড়ার জন্য ছোটবড় মাটির দধির বাটির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।’

আরও পড়ুন- বিলুপ্তপ্রায় মৃৎশিল্প প্রাণ ফিরে পায় পহেলা বৈশাখেমৃৎশিল্পে জীবন চলছে না কুমারদের প্রায় বিলীনের পথে মৃৎশিল্পের ঐতিহ্য

তবে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রুদ্রপাল মৃৎশিল্প সমবায় সমিতিটি ধ্বংস করে দেয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭৫ হাজার টাকা আর্থিক প্রণোদনা দেন। এরপর পুনরায় ঘুরে দাঁড়ায় এ সমবায় সমিতি। বর্তমানে সমিতির সদস্য সংখ্যা ২৫০ জন। স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মূল্য দাঁড়িয়ে প্রায় ১০ কোটি টাকা।

স্থানীয়রা জানায়, কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার উত্তর বিজয়পুর, দক্ষিণ বিজয়পুর, তেগুরিয়াপাড়া, গাংকুল, বারোপাড়া, দুর্গাপুর ও নোয়াপাড়া গ্রামের আট শতাধিক পাল ও কুমোর সম্প্রদায়ের মানুষ মাটির হাঁড়ি-পাতিল তৈরি করতেন শত বছর ধরে। বর্তমানে এ কাজ করছে প্রায় শতাধিক পরিবার। বিজয়পুরের মাটির তৈরি জিনিসপত্রের চাহিদা ও সুনাম দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও পৌঁছেছে।

‘২০১৭ সালের পর থেকে আমাদের গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বাখরাবাদ কর্তৃপক্ষকে বহুবার লিখিতভাবে জানানো হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বাধ্য হয়ে আমরা এখন সনাতন পদ্ধতিতে পণ্য উৎপাদন করছি। এতে আমাদের সময় ও খরচ উভয় বেড়েছে।’

মৃৎশিল্পী সুমন চন্দ্র পাল বলেন, পহেলা বৈশাখ উৎসব সার্বজনীন। এ উৎসবের বাকি আর মাত্র কয়েক দিন। দিনটিকে কেন্দ্র করে শহর-গ্রামে মেলাসহ বিভিন্ন উৎসব আয়োজন করা হয়। সেখানে মাটির হাঁস-মুরগি, হাতি-ঘোড়া, মাছ কিংবা পশুপাখি, মাটির ব্যাংক, মগ ও গ্লাসের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। এছাড়াও বাঙালির ঐতিহ্যবাহী খাবার পান্তা ইলিশের জন্য সানকি এবং দই-চিড়ার জন্য ছোটবড় মাটির দধির বাটির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে আমরা এসব পণ্য তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছি।

দধির বাটি তৈরির কারিগর শিল্পী চক্রবর্তী বলেন, গত ৫ বছর ধরে এ প্রতিষ্ঠানে রয়েছি। সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কাজ করি। বেতন পাই মাত্র ৬ হাজার ৫০০ টাকা। এ টাকা দিয়ে ছেলের পড়ালেখা ও পরিবারের খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হয়।

‘গত ৫ বছর ধরে এ প্রতিষ্ঠানে রয়েছি। সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কাজ করি। বেতন পাই মাত্র ৬ হাজার ৫০০ টাকা। এ টাকা দিয়ে ছেলের পড়ালেখা ও পরিবারের খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হয়।’

বিজয়পুর রুদ্রপাল মৃৎশিল্প সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি দ্বীপক চন্দ্রপাল বলেন, ১৯৯১ সালে সরকারি খরচে আমাদের এককভাবে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ওই সংযোগ থেকে আবাসিক ও অবৈধ সংযোগ যুক্ত করায় ২০১৭ সালের পর থেকে আমাদের গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বাখরাবাদ কর্তৃপক্ষকে বহুবার লিখিতভাবে জানানো হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বাধ্য হয়ে আমরা এখন সনাতন পদ্ধতিতে পণ্য উৎপাদন করছি। এতে আমাদের সময় ও খরচ উভয় বেড়েছে। আর্থিক ক্ষতিরও সম্মুখীন হচ্ছি। বিজয় পুরের পণ্য দেশের চাহিদা মিটিয়ে জাপান, মালয়েশিয়া, কাতার ও আবুধাবিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। গ্যাস সংকটের কারণে অনেক মালের চাহিদা থাকলেও উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না।

আরও পড়ুন- ২০০ বছরের মৃৎশিল্পের টিকে থাকার লড়াইব্যস্ততার পরিবর্তে অস্তিত্ব টেকানোর লড়াইয়ে মৃৎশিল্পীরা

তিনি বলেন, বর্তমানে ৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করেন এই প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু মাটি ও গ্যাস সংকটের কারণে এসব পণ্য তৈরিতে আমরা হিমসিম খাচ্ছি। কারিগরদের উপযুক্ত বেতন-ভাতাও দিতে পাচ্ছি না। গ্যাস সংযোগ চালু হলে আমাদের এ সংকট কেটে যাবে। এ বিষয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে দ্বীপক চন্দ্র পাল বলেন, যেকোনো মাটি দিয়ে পণ্য তৈরি করা যায় না। আবার মাটির সন্ধান পেলেও প্রশাসনের কড়াকড়িতে মাটি সংগ্রহ করা যায় না। আমরা চাই কোনো প্রকার হয়রানি ছাড়াই যেন মাটি সংগ্রহ করতে পারি। এতে করে বিজয়পুর মিৎশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব, অন্যথায় আস্তে আস্তে সংকুচিত হয়ে আসবে।

এ বিষয়ে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুজন চন্দ্র রায় বলেন, তাদের বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে জেলা প্রশাসককে (ডিসি) অবগত করায় তিনি এরই মধ্যে মৃৎশিল্প পরিদর্শন করেছেন। তাদের দাবি অনুযায়ী আমরা সেখানে একটি আধুনিক বিক্রয় কেন্দ্র স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করা হবে। তাছাড়া গ্যাসসহ অন্যান্য সমস্যা সামাধানের বিষয়ে পর্যায়ক্রমে কাজ করা হবে। আমরা কোনোভাবেই মৃৎশিল্পকে হারাতে চাই না।

এফএ/এএসএম