জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, অপচয় ও লুটপাটের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল অনুষদের ডিন ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম।
তিনি বলেন, জ্বালানি খাতে অনিয়ম ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের ‘জ্বালানি অপরাধী’ হিসেবে চিহ্নিত করে দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট: বাংলাদেশে এর প্রভাব এবং মোকাবিলায় কর্মপন্থা নির্ধারণ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন।
জ্বালানি সংকটের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়ী করে ড. শামসুল আলম বলেন, কোথায় নিয়ে গেছে রিনিউয়েবল এনার্জি? কোনো প্রমোশন নেই, বাতিল করেছেন, ভালো কথা। কিন্তু তার চেয়ে ভালো বিনিয়োগ এনে ভালো ব্যবস্থা তৈরি করতে পেরেছেন, তার কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি। এ ধরনের সিদ্ধান্তের ফলে বিপর্যয় তৈরি হয়েছে এবং নিজেরাই ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তুলেছে।
তিনি বলেন, জ্বালানি খাতে বহু প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও এর অনেকগুলোর কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ। কোথাও প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ নেটওয়ার্ক নির্মাণে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি সাতক্ষীরায় গ্যাস নেটওয়ার্ক স্থাপনের বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, যেখানে বাস্তবে গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনা নেই, সেখানেও বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। একইভাবে ভেড়ামারা থেকে খুলনা পর্যন্ত গ্যাস ট্রান্সমিশন লাইন নির্মাণ করা হলেও ভবিষ্যতে ওই লাইনে গ্যাস যাওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, এগুলো একটি-দুটি প্রকল্প নয়, হাজার হাজার এমন প্রকল্প রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে কোম্পানিগুলো মুনাফা দেখালেও প্রকৃতপক্ষে তা লুণ্ঠনের ফল।
সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার মতে, প্রায় ৭৫টির মতো কোম্পানি ভেঙে ভেঙে তৈরি করা হয়েছে, কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মুনাফা, ব্যয় ও সরকারের প্রাপ্তির হিসাব স্বচ্ছ নয়।
এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেন, সরকারকে স্পষ্ট করে বলতে হবে, এসব কোম্পানি কত মুনাফা করছে এবং সেই মুনাফা থেকে রাষ্ট্র কত পাচ্ছে।
জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করে ড. শামসুল আলম বলেন, আইন লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অপরাধ ঘটলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বরং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো অনেক ক্ষেত্রে নিজেরাই আইন ভঙ্গ করছে। অথচ এসব অপরাধ শাস্তিযোগ্য হলেও তার কোনো প্রতিকার দেখা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সহায়ক হিসেবে কাজ না করে উল্টো কোম্পানিগুলোর পরিচালনায় যুক্ত হয়ে পড়েছে। এতে করে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হচ্ছে। অবসরপ্রাপ্ত আমলারা বিভিন্ন কোম্পানির চেয়ারম্যান বা সদস্য হয়ে কার্যত মালিকের ভূমিকায় চলে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ড. শামসুল আলম বলেন, অনেক প্রকল্পে পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন বা সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। ফলে এসব কোম্পানি কার্যত সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং জবাবদিহি ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
জ্বালানি খাতে ঘাটতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, যে ঘাটতির কথা বলা হচ্ছে, তা আসলে লুণ্ঠনমূলক দায়। এই দায় কমিয়ে আনার জন্য স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা করতে হবে।
তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিয়ন্ত্রক কমিশনকে নির্দেশ দিয়ে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে, যেখানে কীভাবে এই লুণ্ঠনমূলক দায় কমানো যায় তা নির্ধারণ থাকবে।
ড. শামসুল আলম বলেন, যারা এসব অনিয়ম ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত, তাদের ‘জ্বালানি অপরাধী’ হিসেবে চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। যদি এই বিচার না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতেও একইভাবে দুর্নীতি ও অর্থ পাচার চলতেই থাকবে।
এমএএস/ইএ