ঘড়ির কাঁটা ঠিক রাত ১২টা ২২ মিনিট। শিশু আয়মান সাদিককে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স এসে থামলো বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের গেটে। অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে নিশ্বাসের সঙ্গে লড়ছে এক বছরের শিশুটি। মায়ের কোলে নিস্তেজ দেহ, মুখে অক্সিজেন মাস্ক। চোখে আতঙ্ক, মুখে নেই কোনো সাড়াশব্দ।
দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সের গেট খুলে দেওয়া হয়। আগে নামেন শিশু আয়মানের বাবা আজিজুল হাকিম। কাঁপা কণ্ঠে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘যশোর থেকে আসছি। ডাক্তার কইছে ভর্তি করাইতে, বলেই ছুটে যান জরুরি বিভাগের দিকে।’
কিন্তু সেই দৌড় থেমে যায় মাত্র ৩৩ মিনিটে। হাসপাতালের ভেতরে ঢোকার সময় যে আশার আলো ছিল, বের হওয়ার সময় কপালে চিন্তার ভাঁজ। শিশুটিকে কোলে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা। পাশে নির্বাক বাবা, চোখে অসহায়তার ছাপ। সিট নেই, এই দুটি শব্দ যেন তাদের সব পথ বন্ধ করে দেয়।
আরও পড়ুন:হামের টিকা সংকট নাকি অবহেলা, প্রাদুর্ভাবের নেপথ্যে কী?হামের টিকা সংকট ও অপুষ্টিতে বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকিহামের সংক্রমণ ঠেকাতে যে পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের
ছেলেকে শিশু হাসপাতালে ভর্তি করানোর জন্য ফোনে একের পর এক আত্মীয়কে অনুরোধ করে চেষ্টা করেন বাবা। কেউ কোনো সমাধান দিতে পারেন না। অবশেষে আবার ছুটে চলে অ্যাম্বুলেন্স, অজানা কোনো গন্তব্যে, অজানা কোনো হাসপাতালে সিটের আশায়।
রাত ১২টা ১২ মিনিট। যাত্রাবাড়ী থেকে সিএনজিতে করে দুই বছরের রায়হানকে নিয়ে আসেন তার মা-বাবা। সাত দিনের জ্বর, হঠাৎ শ্বাসকষ্ট। শিশুটির মা বলেন, ‘ডাক্তার বলছে হাম। হঠাৎ নিশ্বাস নিতে পারছে না। তাই শিশু হাসপাতালে এসেছি ভর্তি করানোর জন্য।’
কিন্তু ২৮ মিনিট পর রাত ১২টা ৪০ মিনিটে সিট না পেয়ে ছেলেকে বুকে চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে যান সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে সিটের আশায়।
বৃহস্পতিবার দিনগত রাত ১২টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত জাগো নিউজের এ প্রতিবেদক শিশু হাসপাতালে সরেজমিনে দেখেন, এক ঘণ্টায় ১৩ শিশুকে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে আসেন অভিভাবকরা। সবাই হামে আক্রান্ত। কেউ এসেছেন ঢাকার মধ্যে থেকে কেউ আবার অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে বিভিন্ন জেলা থেকে।
জানা গেছে, চলতি বছরে হামে যত মৃত্যু হয়েছে, তা গত দুই দশকে সর্বোচ্চ। এই সময়ে পাঁচবার হামে মৃত্যুর ঘটনা জানা যায়। ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি মারা যায় ১০ জন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে হামে প্রতিবছর কতজন আক্রান্ত হয়, তার হিসাব নিয়মিত করা হলেও মৃত্যুর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় না। দেশে হামে মৃত্যুর হার ছিল ১০ লাখে ১ শতাংশ। এখন তা বেড়ে হয়েছে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ।
সংক্রমণের মূল কারণ হিসেবে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতিকে চিহ্নিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বিশেষ করে দুই বছরের কম বয়সী শিশুরা, যারা গত দুই বছরে বিভিন্ন কারণে হামের টিকার এক বা একাধিক ডোজ পায়নি, তারাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা কেনার ক্ষেত্রে গাফিলতি হয়েছে। বর্তমান সরকারও এ বিষয়ে আগের সরকারকে দায়ী করছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আগের সরকারের গাফিলতির কারণে হামের টিকার সংকট তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুনজেলায় জেলায় চলছে হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচিহাম রোধে সাড়ে ৫ বছর ক্যাম্পেইন চলেনি, মজুত করা হয়নি টিকাতিন সপ্তাহে হামের উপসর্গ নিয়ে ১১৭ জনের মৃত্যু
মধ্যরাতে আরও যা দেখা গেলো শিশু হাসপাতালেরাত ১২টা ২৪ মিনিটে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে রিকশায় চেপে হাসপাতালে আসে এক মাস বয়সী শিশু রমজানকে নিয়ে তার নানা ও নানী। শিশুটির নানা আব্বাস মিয়া জানান, ‘জ্বর নেই কিন্তু শ্বাসকষ্ট হচ্ছে এজন্য হাসপাতালে নিয়ে এলাম।’
রাত ১২টা ২৫ মিনিটে সিএনজিতে করে যাত্রাবাড়ী থেকে দুই বছর বয়সী রায়হানকে নিয়ে আসেন তার মা-বাবা। বাবা শফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ছেলের জ্বর। ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে সিট খালি না থাকায় তারা তাড়াহুড়ো করে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুটিকে নিয়ে যায়।’
রাত ১২টা ২৭ মিনিটে ঢাকা মেডিকেল থেকে ৮ মাস বয়সী ওমর ফারুককে কোলে নিয়ে অটোরিকশায় শিশু হাসপাতালে আসে মা বাবলী ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বাচ্চার হাম ধরা পড়েছে। ঢাকা মেডিকেল থেকে বলছে শিশু হাসপাতালে আনতে।’
রাত ১২টা ২৮ মিনিটে খুলনা থেকে অ্যাম্বুল্যান্সে অক্সিজেনসহ আনা হয় ছয় মাসের শিশু সালমানকে। শিশুটির নিউমোনিয়া ধরা পড়ায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ছিল। শ্বাসকষ্ট হওয়ায় শিশু হাসপাতালে নিয়ে আসেন মা সানজিদা শারমিন।
রাত ১২টা ৩৯ মিনিটে সাত মাস বয়সী শিশু ইব্রাহিমকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন শিশুটির বাবা ও মা। রাত ১২টা ৪৪ মিনিটে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে অ্যাম্বুলেন্সে হামসহ শ্বাসকষ্ট নিয়ে মাসের শিশু বিল্লালকে আনা হয়। সঙ্গে ছিলনে শিশুর মা, বাবা ও নানি।
রাত ১২টা ৫৮ মিনিটে চার বছর বয়সী জুবায়ের কুমিল্লা থেকে হাসপাতালে আসে মায়ের সঙ্গে। তার মা জুবাইদা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, ‘হাম ও জ্বর আছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে বলেছে ঢাকায় আনতে, এজন্য নিয়ে এসেছি।’
ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক রাত ১টা। একটি ছোট চিরকুট নিয়ে শিশু হাসপাতালে আসেন চার বছর বয়সী শিশু রাফসানকে নিয়ে। তার দাদা শাহজাহান ইসলাম এসে কাগজ দেখান। কাগজে রেফার্ড করা হয়েছে ডিএনসিসি হাসপাতালে। পরে আনসার দেখে জানান এখানে নয় আপনারা মহাখালী ডিএনসিসি হাসপাতালে যান। তারা এসেছেন ঢাকার কামরাঙ্গীরচর থেকে। পরে রিকশা নিয়ে তারা মহাখালীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।
শিশু হাসপাতালে দায়িত্বরত আনসার সদস্য রাশিদুল হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘রাত ১০টা থেকে আমার ডিউটি শুরু হয়েছে। একের পর এক জ্বর ও হাম নিয়ে শিশুরা আসছেন। সিট না থাকায় অনেকেই আবার চলেও যাচ্ছেন।’
শিশু হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসকরা কেউ কথা বলতে চাননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চিকিৎসক জানান, ‘হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় অনেক রোগী আসছে। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। সিট ফাঁকা হলেই শিশু ভর্তি করা হচ্ছে। তবে সিটের চাইতে রোগী অনেক বেশি।’
হাম সন্দেহে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৬ শিশুর মৃত্যুস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে জানানো হয়, হাম সন্দেহে বা হামের উপসর্গ নিয়ে বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে আরও এক শিশু। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ১৪৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর হামে ২৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া শিশুদের ৪ জনই রাজশাহী বিভাগের। বাকি দুজন ঢাকা এবং একজনের মৃত্যু হয়েছে সিলেটে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬৭৪ জন। আর হাম শনাক্ত হয়েছে ৬৪২ জনের। এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত মোট শিশুর সংখ্যা ২ হাজার ২৪১। আর হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৮ হাজার ২৫১। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ছাড়া পাওয়া রোগীর সংখ্যা ৫ হাজার ৮০১।
ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) পাবলিক হেলথ বিভাগের গত বুধবার (৮ এপ্রিল) ‘আউটব্রেক অ্যালার্ট: প্রটেক্টিং আওয়ার কমিউনিটি ফ্রম মিসেলস’ শীর্ষক এক সেমিনারে অধ্যাপক সাইফ উল্লাহ মুন্সী হাম সম্পর্কে বলেন, ১৯৯০ সালের পর জন্ম নেওয়া ব্যক্তিরা টিকাদানের কারণে তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত। যারা আগে হামে আক্রান্ত হয়েছে, তারাও সাধারণত নিরাপদ, তারা প্রাকৃতিকভাবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে। টিকা নেওয়া মায়েরা তাদের সন্তানদের মধ্যে প্রতিরোধ ক্ষমতা স্থানান্তর করেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি জানান, ১২ মাসের কম বয়সী শিশু, অপুষ্টিতে ভোগার চেয়ে বেশি বয়সের শিশু, টিকা না নেওয়া ব্যক্তি এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তারাই সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, এক থেকে পাঁচ বছরের শিশুদের জন্য হাম বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ, এই বয়সের শিশুরা গুরুতর জটিলতার ঝুঁকিতে থাকে, যেখানে বড় শিশুরা তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিতে থাকে।
তিনি বলেন, হামের ভাইরাস কাশি ও হাঁচির মাধ্যমে বাতাসে ছড়ায়, বিশেষ করে গণপরিবহন, শ্রেণিকক্ষ, মিলনায়তন বা বিমানবন্দরের মতো আবদ্ধ স্থানে। তবে অতীতের ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচির কারণে চলতি বছর এই প্রাদুর্ভাব মহামারিতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা কম।
আরও পড়ুন:৫ বছরের কম বয়সী সব শিশু পাবে, আগে নেওয়া থাকুক বা না থাকুকহাম আক্রান্ত শিশুর সুচিকিৎসায় তিন পরামর্শহামের টিকা সংকট ও অপুষ্টিতে বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি
তিনি আরও বলেন, অন্যান্য কিছু ভাইরাসের মতো হাম প্রাণীর দেহে সক্রিয় থাকে না। শিশুদের সর্বোচ্চ সুরক্ষার জন্য দুই ডোজ টিকা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
সেমিনারে অধ্যাপক মুহাম্মদ তাওফিক বলেন, উপসর্গের দিক থেকে হাম অনেকটা সাধারণ ভাইরাসজনিত রোগের মতো জ্বর, সর্দি ও শরীরে র্যাশ দেখা যায়। তবে কেবল র্যাশ থাকলে এবং জ্বর বা সর্দি না থাকলে সেটি হাম নাও হতে পারে। হাম হলে সাধারণত জ্বর কম মাত্রায় শুরু হয়ে ১০১-১০২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়ে এবং তিন থেকে চার দিন স্থায়ী হয়।
অধ্যাপক মুহাম্মদ তাওফিক আরও বলেন, সাধারণত তৃতীয় দিন থেকে শিশুর কপালে চুলের গোড়া, কানের আশপাশে ও মাথার পেছন থেকে র্যাশ শুরু হয়, চোখ ও নাক দিয়ে পানি পড়ে এবং ধীরে ধীরে সেই র্যাশ শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। ত্বকে র্যাশ ওঠার আগেই মুখের ভেতরে বালুকণার মতো ছোট দাগ দেখা যায়, যা সম্ভাব্য হাম সংক্রমণের একটি লক্ষণ হতে পারে। এগুলোতে জ্বালা ও চুলকানি থাকে এবং তিন থেকে চার দিন পর মিলিয়ে যায়।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, হাম সংক্রমণ বা রোগ নির্ণয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত অযথা বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। কোনো সন্দেহজনক উপসর্গ বা উদ্বেগ থাকলে নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য।
টিটি/এসএনআর