হামের সংক্রমণ ঠেকাতে যে পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

হামকে অনেকেই সাধারণ জ্বর-সর্দি ভাবলেও এটি আসলে একটি মারাত্মক ভাইরাসজনিত সংক্রমণ। ছবি/জাগো নিউজ

স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ইতোমধ্যে কয়েক ডজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছেই। রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়েছে, একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন জেলায়ও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের সংক্রমণ সাধারণত শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা গেলেও এবার তুলনামূলক কম বয়সী শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে, যা উদ্বেগের কারণ। টিকা না নেওয়া শিশুদের মধ্যেই সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে।

হাম নিয়ে ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, হাম বর্তমানে শিশুদের মধ্যেই বেশি দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে যারা ছোটবেলায় টিকা নেয়নি তাদের ঝুঁকি অনেক বেশি। তবে কিছু ক্ষেত্রে বড়দের মধ্যেও এ রোগ শনাক্ত হচ্ছে। রোগের শুরুতে সাধারণত জ্বর থাকে ৩-৪ দিন। এরপর শরীরে লালচে ফুসকুড়ি (র‍্যাশ) দেখা দেয়। এর সঙ্গে তীব্র শরীর ব্যথা, বমি ভাব, খেতে না পারা-এসব উপসর্গ থাকতে পারে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে জটিলতাও দেখা দিচ্ছে, বিশেষ করে সর্দি-কাশি বা শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার সঙ্গে।

তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলেন, সময়মতো টিকা নেওয়াই হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। পাশাপাশি আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানান।

শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হুট করে হাম সংক্রমণ বাড়ার কয়েকটি কারণ; ৯ মাস পরে ও ১৬ মাসে হামের টিকা দেয়ার কথা। কিন্তু আমাদের মা বাবাদের টিকা দেওয়ার প্রতি অনীহা। এছাড়া টিকাদান কেন্দ্রে সমস্যা আছে। সব জায়গায় টিকা থাকে না৷ আবার শিশুদের সর্দি কাশি থাকলেও টিকা দেয় না। পরে আর বাচ্চাদের নিয়ে অনেকে যান, গেলে পান না এমন জটিলতা তৈরি হয়।

তিনি বলেন, ৫/৬ বছর পর পর এরকম প্রকোপ বাড়ে। যার কারণে সরকার থেকে ৫ বছর পরপর বুস্টার দেওয়া হয়। ২০২০ এ দেওয়া হয়েছে। গত বছর দেওয়ার কথা৷ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হয়ত বুঝেনি৷ তারা সে আয়োজন করেনি। 

ডা. এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হামের লক্ষণ মূলত জ্বর ও রেশ। কিন্তু অনেক বাচ্চা রেশ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু তাদের হাম না। ছোট বাচ্চাদেরও হচ্ছে। সাধারণত ৬ মাসের উপরে বাচ্চাদের হয়। কিন্তু এবার ছোটদেরও হচ্ছে। এটার চরম সংক্রামক। হাঁচি কাশিতে ছড়ায়। এবারের সংক্রমণ আশঙ্কাজনক। কারো ২৫ শতাংশের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া হতে পারে। পেটে বা লিভারে ইনফেকশন হতে পারে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যায়। টিবি পর্যন্ত দেখা দেয়। 

তিনি বলেন, মা-বাবা প্রতিবেশীদের প্রতি পরামর্শ হলো- জ্বর বা রেশ হলে নিকটস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পাঠাবেন। অন্য বাচ্চা থেকে আলাদা রাখা। খারাপ হলে উচ্চতর কেন্দ্রে চিকিৎসার জন্য পাঠানো উচিত। 

রোববার সরেজমিনে রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে দেখা যায়, হাসপাতালটিতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ১০০ বেডের হাসপাতালে উপচে পড়া রোগী।

জানা গেছে, চলতি বছরের শুধু ফেব্রুয়ারি-মার্চে ৫৬০ জন রোগী হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিয়েছেন। চলতি মাসে ১৯জনসহ এখন পর্যন্ত ২২ জনের প্রাণহানি হয়েছে। অথচ গত বছর পুরো বছরজুড়ে হাম আক্রান্ত সন্দেহে ৬৯ রোগী ভর্তি ছিল। পরে তাদের মধ্যে ১৩ জন হাম ছিল বলে টেস্টে পাওয়া গেছে।

শুধু হাম নয়, ধনুষ্টংকার, ডিপথেরিয়া, ভাইরাল হেপাটাইটিস, জলবসন্ত, মামস, পলিওসহ নানাবিধ সংক্রামক ব্যাধি নিয়ে সারাদেশ থেকে আক্রান্তরা চিকিৎসা নেন এই হাসপাতালে।

১০০ বেডের হাসপাতালটিতে শুধু ১১২ জনই হামের। অথচ, প্রতিটি রোগ-ই উচ্চ সংক্রামক ঝুঁকির। চলতি মাসের মাঝামাঝি রোগীর এই চাপ ছিল দুই শতাধিকের মতো। বারান্দায়ও চিকিৎসা নিতে হয়েছে।

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. তানজিনা জাহান জাগোনিউজকে বলেন, হুট করেই হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় একটু হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে, কেউ চিকিৎসা বঞ্চিত হবে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের সংক্রমণ ঠেকাতে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। শিশুর জ্বর বা শরীরে রেশ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পাশাপাশি সংক্রমণ ঠেকাতে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানানো হয়েছে।

এসইউজে/এসএএইচ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।