ইরান ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরানের পাল্টা আঘাতে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত এক ডজন সামরিক স্থাপনা এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে, এখন সেগুলোর অস্তিত্ব এখন সুবিধার চেয়ে ঝুঁকিই বেশি তৈরি করছে। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক একদল বিশেষজ্ঞ এমনটাই মত দিয়েছেন।
ঘাঁটিগুলোর অবস্থার বিষয়ে প্রথম তথ্য প্রকাশ করে একটি মার্কিন সংবাদমাধ্যম, যেখানে সেগুলোকে ‘প্রায় বসবাসের অযোগ্য’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। তবে এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য রাজনৈতিক বিজ্ঞান প্রকল্পের পরিচালক মার্ক লিঞ্চ বলেন, এগুলোই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের ভৌত কাঠামো। আর ইরান মাত্র এক মাসের মধ্যে কার্যত সেগুলোকে অকার্যকর করে দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোর যে ক্ষতি হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ ও সঠিক তথ্য আমরা দেখতে পাচ্ছি না।
এই ঘাঁটিগুলোতে প্রবেশাধিকার অত্যন্ত সীমিত, যা নিয়ন্ত্রণ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর ও বাহরাইন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও ওমানের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো। গত মাসে এসব দেশ তাদের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রের ছবি বা ভিডিও ধারণ ও প্রচার নিষিদ্ধ করে, যা অনেকের মতে ইরানের ওপর হামলা চালানোর সময় যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোকে আড়াল করার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে।
এর আগে উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাদের ভূখণ্ডে অবস্থিত ঘাঁটি যুদ্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহার করতে দেবেন না।
মার্ক লিঞ্চ বলেন, এই অঞ্চলে থাকা আমার বন্ধুরা আমাকে বাহরাইনের ঘাঁটির ছবি পাঠায়। তিনি দ্বীপটিতে অবস্থিত নৌ সহায়তা কেন্দ্রের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের অবস্থান ও প্রায় ৯ হাজার সেনা সদস্য রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অঞ্চলজুড়ে ঘাঁটিগুলো প্রকৃত ক্ষতির মুখে পড়েছে। আমার মনে হয়, বাহরাইনে আর কখনোই আমরা পঞ্চম নৌবহর পুনর্বহাল করতে পারবো না। এটি এখন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।
তার ভাষায়, এক অর্থে ‘যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য’ ধারণার পুরো ভিত্তিই ভেঙে পড়েছে ও এর বিকল্প কী হতে পারে, তা নিয়েও এখনো কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই।
সুবিধার চেয়ে এখন দায় বেশি
মোট হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের পরিচালিত ১৯টি সামরিক স্থাপনার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এই অঞ্চল মিশর থেকে ইরাক পর্যন্ত ও উত্তর সিরিয়া থেকে দক্ষিণ ওমান পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ঘাঁটিগুলোতে মোট প্রায় ৫০ হাজার সেনা সদস্য মোতায়েন থাকতে পারে।
এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা মোতায়েনের ইতিহাস ১৯৫০-এর দশকের শেষ ভাগ থেকে শুরু হলেও, উপসাগরীয় অঞ্চলে বর্তমান আকার ও পরিসরে ঘাঁটি স্থাপন মূলত ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর গড়ে ওঠে, যখন কুয়েতকে ইরাকি দখল থেকে মুক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করে। এই ব্যবস্থার ভিত্তি ছিল- তেল ও পেট্রোডলারের বিনিময়ে নিরাপত্তা প্রদান।
কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই সমঝোতা উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য আর কার্যকর থাকেনি। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে, বিমানবন্দর ও স্কুল বন্ধ করতে হয়েছে এবং সম্প্রতি তাদের জ্বালানি উৎপাদন স্থাপনাগুলোতেও ইরানের হামলা হয়েছে।
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী পরিচালক শানা আর মার্শাল বলেন, এ ধরনের লেনদেনভিত্তিক সম্পর্কের সুবিধা যখন একপক্ষের জন্য এতটা কমে যায়, তখন সেই সম্পর্ক ভেঙে পড়াই স্বাভাবিক। তিনি বলেন, এটি প্রথমবার নয়। ১৯৯৬ সালে সৌদি আরবের দাহরানে খোবার টাওয়ার হামলায় ১৯ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছিল। পরে জানা গিয়েছিল হামলাটি হিজাজ অঞ্চলের হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা করেছিলেন।
প্রয়াত আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনও উপসাগরে মার্কিন সেনা ঘাঁটির উপস্থিতি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন বলে জানান মার্শাল।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, হোক তা সামরিক ঘাঁটি, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন বা ডলার নির্ভরতা- তা এখন আর সুবিধা নয়, বরং দায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
অপ্রত্যাশিত পরিবর্তনের ইঙ্গিত
গত সাত সপ্তাহের যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোকে বুঝিয়ে দিয়েছে, নিরাপত্তার জন্য তারা আর পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে পারবে না। ফলে তারা বিকল্প হিসেবে ইসরায়েলের দিকে ঝুঁকতে পারে বলে মত দিয়েছেন দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনীতি বিষয়ক একটি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী সহসভাপতি ত্রিতা পারসি।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র-সম্পর্কিত স্থাপনায় ইরানের হামলা বন্ধের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকায় এসব দেশের মধ্যে একধরনের প্রতারিত হওয়ার অনুভূতি তৈরি হয়েছে।
পারসি বলেন, এই ঘাঁটিগুলো ইরানের হামলা প্রতিরোধ করতে পারেনি; বরং সেগুলোই হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এগুলো যেন হামলার চুম্বক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরতা ভেঙে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, ২০২০ সালের স্বাভাবিকীকরণ চুক্তির মতো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাড় ছাড়াই এ ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে। যদি তারা মনে করে যে ইরানের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়া সম্ভব নয় বা তারা তা চায় না, তাহলে এসব উপসাগরীয় দেশের কিছু অংশ ইসরায়েলের দিকে ঝুঁকতে পারে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
এসএএইচ