বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ—যা শুধু একটি খাদ্য উপাদান নয়, বরং আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অর্থনীতির এক অনন্য প্রতীক। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে ইলিশ। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বে মোট ইলিশ উৎপাদনের প্রায় ৮০–৮৫ শতাংশ সরবরাহ করে থাকে। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা ও বাজারে উচ্চমূল্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
গত আট বছরের মধ্যে ইলিশের সর্বনিম্ন উৎপাদন হয়েছে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে। গত বছর জাতীয় মাছ ইলিশ উৎপাদন হয়েছে ৫ লাখ টন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের পর এটিই সর্বনিম্ন উৎপাদন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোকে বিরাট চ্যালেঞ্জ বলেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
‘জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ -২০২৬’ উপলক্ষে সোমবার (৬ এপ্রিল) সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ গত অর্থবছরের ইলিশ উৎপাদনের এই তথ্য তুলে ধরেন।
মন্ত্রী আশার কথা বলেছেন—এটি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু শুধু আশ্বাস নয়, বাস্তবায়নই হবে মূল চ্যালেঞ্জ। ইলিশ রক্ষায় অতীতে বাংলাদেশ সফলতার নজির তৈরি করেছে, কিন্তু সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হলে আরও কঠোর, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। ইলিশ আমাদের গর্ব, আমাদের পরিচয়। তাই এটি রক্ষা করা শুধু অর্থনৈতিক নয়, একটি জাতীয় দায়িত্বও বটে। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে ইলিশ হয়তো শুধু গল্পে থাকবে—বাস্তবে নয়।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রীর বক্তব্য বিষয়টিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। তিনি জানিয়েছেন, সরকার ইতোমধ্যে ইলিশ উৎপাদন বাড়াতে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে এবং সরবরাহ বাড়লে দামও সাধারণ মানুষের নাগালে আসবে। এই আশ্বাস অবশ্যই ইতিবাচক; তবে বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, সংকটটি বহুমাত্রিক এবং গভীর।
উৎপাদনের চিত্র: উন্নতির পর আবার শঙ্কাগত এক দশকে বাংলাদেশে ইলিশ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। ২০০৮–০৯ অর্থবছরে যেখানে উৎপাদন ছিল প্রায় ২.৯ লাখ মেট্রিক টন, সেখানে ২০২১–২২ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫.৬ লাখ মেট্রিক টনে। এই সাফল্যের পেছনে ছিল অভয়াশ্রম ঘোষণা, জাটকা সংরক্ষণ এবং নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার মতো উদ্যোগ।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই বৃদ্ধির ধারা স্থবির হয়ে পড়েছে, এমনকি কিছু এলাকায় উৎপাদন কমার অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে মেঘনা অববাহিকা ও উপকূলীয় অঞ্চলে জেলেরা আগের তুলনায় কম ইলিশ পাচ্ছেন বলে জানাচ্ছেন।
মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ইলিশের উৎপাদন ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ৫ লাখ ২৯ হাজার টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ লাখ ৭১ হাজার টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৫ লাখ ৬৬ হাজার টন, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫ লাখ ৬৫ হাজার টন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫ লাখ ৫০ হাজার টন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৫ লাখ ৩২ হাজার টন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৫ লাখ ১৭ হাজার টন।
অর্থাৎ, গত আট বছরের মধ্যে গত বছরই সর্বনিম্ন ইলিশের উৎপাদন হয়েছে।
সংকটের কারণ: বহুমাত্রিক বাস্তবতা১. জাটকা নিধন: ভবিষ্যৎ ধ্বংসের বর্তমান চর্চাজাটকা (২৫ সেন্টিমিটারের কম আকারের ইলিশ) ধরা আইনত নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে তা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। গবেষণা বলছে, যদি জাটকা ধরা সম্পূর্ণ বন্ধ করা যায়, তাহলে মোট উৎপাদন ২৫–৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। কিন্তু দারিদ্র্যপীড়িত জেলেদের জন্য তা মেনে চলা কঠিন হয়ে পড়ে।
২. নদীর নাব্যতা ও প্রবাহ সংকটপদ্মা-মেঘনা অববাহিকার অনেক নদী এখন আগের মতো প্রবাহমান নেই। নদী দখল, পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়া এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ ইলিশের চলাচল ও প্রজননে বাধা সৃষ্টি করছে। ইলিশ একটি অভিবাসী মাছ, যা সমুদ্র থেকে মিঠা পানিতে ডিম ছাড়তে আসে—এই যাত্রাপথে বাধা মানেই উৎপাদনে সরাসরি প্রভাব।
৩. দূষণ: অদৃশ্য ঘাতকবিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার আশপাশের নদীগুলোতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা অনেক ক্ষেত্রে মাছের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সীমার নিচে নেমে গেছে। শিল্পকারখানার বর্জ্য, ট্যানারি ও প্লাস্টিক দূষণ ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করছে।
৪. জলবায়ু পরিবর্তনসমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ও লবণাক্ততার পরিবর্তন ইলিশের স্বাভাবিক জীবনচক্রে প্রভাব ফেলছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পানির তাপমাত্রা ১–২ ডিগ্রি বাড়লেও মাছের প্রজনন আচরণ পরিবর্তিত হতে পারে।
কেস স্টাডিভোলা জেলার চরফ্যাশনের জেলে আবদুর রহিম গত ২০ বছর ধরে ইলিশ শিকার করেন। তিনি গণমাধ্যমে জানান, “আগে একদিনে ২০–২৫ কেজি ইলিশ পাওয়া যেত, এখন ৫–৭ কেজি পেলেই ভাগ্য ভালো বলতে হয়।” নিষেধাজ্ঞার সময় তিনি বিকল্প কাজ না পেয়ে ঋণ নিতে বাধ্য হন। ফলে অনেক সময় ঝুঁকি নিয়ে জাটকা ধরতে নামেন।
রহিমের এই অভিজ্ঞতা হাজারো জেলের বাস্তবতা তুলে ধরে—যেখানে আইন ও জীবিকার দ্বন্দ্ব স্পষ্ট।
সরকারের উদ্যোগ: কতটা কার্যকর?সরকার ইতোমধ্যে ৬টি ইলিশ অভয়াশ্রম ঘোষণা করেছে এবং বছরে প্রায় ২২ দিন মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রাখছে (প্রজনন মৌসুমে)। এছাড়া জেলেদের জন্য ভিজিএফ (খাদ্য সহায়তা) কর্মসূচি চালু রয়েছে, যার আওতায় প্রতি জেলে পরিবারকে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাল দেওয়া হয়।মন্ত্রী ৬ এপ্রিলের বক্তব্যে বলেছেন, এসব উদ্যোগ আরও জোরদার করা হবে এবং উৎপাদন বাড়াতে নতুন পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে এই সহায়তা পর্যাপ্ত নয় বা সময়মতো পৌঁছায় না। ফলে জেলেরা বাধ্য হয়ে আইন অমান্য করেন।
উত্তরণের পথ: কী করা জরুরি?১. জেলেদের বিকল্প জীবিকা নিশ্চিত করাশুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। জেলেদের জন্য ক্ষুদ্র ঋণ, প্রশিক্ষণ ও বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
২. নদী পুনরুদ্ধার ও খনননদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত খনন এবং দখলমুক্ত করার উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।
৩. কঠোর দূষণ নিয়ন্ত্রণশিল্পকারখানায় বাধ্যতামূলক বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন এবং কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
৪. প্রযুক্তি ও গবেষণাস্যাটেলাইট ট্যাগিংসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইলিশের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে, যা নীতি নির্ধারণে সহায়ক হবে।
৫. আঞ্চলিক সহযোগিতাবাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ইলিশ সংরক্ষণ পুরোপুরি সম্ভব নয়।
মন্ত্রী আশার কথা বলেছেন—এটি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু শুধু আশ্বাস নয়, বাস্তবায়নই হবে মূল চ্যালেঞ্জ। ইলিশ রক্ষায় অতীতে বাংলাদেশ সফলতার নজির তৈরি করেছে, কিন্তু সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হলে আরও কঠোর, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।ইলিশ আমাদের গর্ব, আমাদের পরিচয়। তাই এটি রক্ষা করা শুধু অর্থনৈতিক নয়, একটি জাতীয় দায়িত্বও বটে। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে ইলিশ হয়তো শুধু গল্পে থাকবে—বাস্তবে নয়।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।drharun.press@gmail.com
এইচআর/এএসএম