মাগুরা জেলার শতখালী ইউনিয়নের বয়রা গ্রামের মাছ চাষি ইন্দ্রজিৎ কুমার বিশ্বাস ৭ একর পুকুর লিজ নিয়ে দেশীয় ও উচ্চমূল্যের মাছ চাষে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছেন। প্রতি একরে ১ লাখ টাকা হিসেবে মোট ৭ লাখ টাকায় পুকুর লিজ নিয়ে এবারই প্রথম বড় পরিসরে চাষ শুরু করেন তিনি। ছোট ছোট পুকুরে মাছ চাষ করলেও এবার নতুন উদ্যোগে ট্যাংরা, পাবদা, দেশি জাতের রুই, কাতল ও সিলভার কার্প চাষ করে চমক দেখিয়েছেন।
ইন্দ্রজিৎ কুমার বিশ্বাস জানান, মোট বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ৫২ লাখ টাকা। এরই মধ্যে প্রায় ১৪০ মণ মাছ বিক্রি করে ১৪ লাখ টাকা আয় করেছেন। ১০ এপ্রিল প্রায় ৩০ মণ সাদা মাছ বিক্রি হয়েছে। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী রুই ৩০০ টাকা, সিলভার কার্প ২২০ টাকা এবং পাবদা ৩৩০ টাকা কেজিদরে বিক্রি হচ্ছে। সব মিলিয়ে তার মোট বিক্রির পরিমাণ প্রায় ৮০ লাখ টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে আশা করছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘সিলভার কার্প মাছ ৫-৬ কেজি, কাতল ৪ কেজি, রুই ২ কেজি পর্যন্ত হয়েছে। পাবদা কেজিতে ৮-১০টি উঠছে। ট্যাংরা এখনো পুরোপুরি ধরা না পড়লেও আনুমানিক ৫০ কেজির মতো হয়েছে। ট্যাংরা এক মাস পর বিক্রির কথা ছিল কিন্তু মাছ দ্রুত বড় হয়ে গেছে। নতুন পাবদা চাষে ভালো সাড়া পেয়ে এবার বাজারজাত করছি।’
মাছ চাষে তাকে জেলা মৎস্য অফিসের পাশাপাশি সহযোগিতা করছে অল্টারনেটিভ ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এডিআই)। এডিআইয়ের কৃষি ইউনিটের ফোকাল পারসন ও মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ নূর আমিন মুকুল বলেন, ‘পিকেএসএফ ও এডিআইয়ের সহযোগিতায় ২০১৪ সাল থেকে মাগুরা ও যশোরে বিভিন্ন প্রযুক্তি বাস্তবায়ন করলেও পাবদা চাষে তেমন সফলতা আসছিল না। অবশেষে ইন্দ্রজিৎ দাদার পুকুরে আমরা পাবদা চাষে সফল হয়েছি। এখন কেজিতে ৮-১০টি সাইজের পাবদা উঠছে, যা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য সাফল্য।’
তার মতে, ‘এ অঞ্চলের মানুষের ধারণা ছিল পাবদা চাষ সম্ভব নয়। কিন্তু প্রযুক্তিগত সহায়তা ও সঠিক ব্যবস্থাপনায় সেই ধারণা বদলে গেছে।’
মাছ চাষ দেখতে আসা সুজন কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘শুনেছিলাম এখানে উন্নতমানের মাছ চাষ হচ্ছে। জাল টানতে এসে দেখলাম সত্যিই বড় বড় রুই, কাতল, সিলভার কার্প হয়েছে। পাবদাও ৮-১০টি কেজি সাইজের। আমিও সামনে এমন চাষ করার চেষ্টা করবো। সেজন্যই মূলত দেখতে আসা।’
স্থানীয় জেলে সুনীল কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘এ বছর এমন বড় পাবদা আর কোথাও পাইনি। কাতল, সিলভার, রুই—সব মাছই খুব ভালো সাইজের হয়েছে। এই পুকুরের মাছের মান ভালো।’
মাগুরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাধন চন্দ্র সরকার বলেন, ‘জেলায় বছরে মোট ১৯,৬৯২ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়। যেখানে চাহিদা ২৩,০০২ মেট্রিক টন। অর্থাৎ ঘাটতি রয়েছে ৩,৩১০ মেট্রিক টন। এই ঘাটতি পূরণে আমরা সচেতনতা বৃদ্ধি, দেশীয় প্রজাতি সংরক্ষণে অভয়াশ্রম স্থাপন এবং মৎস্য আইন বাস্তবায়নে জোর দিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘প্রতি উপজেলায় বছরে অন্তত একটি করে অভয়াশ্রম স্থাপন করা হচ্ছে। ক্ষতিকর জাল ব্যবহার বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বেসরকারি সংস্থা সিএনআরএস ও এডিআইয়ের সহায়তায় জেলায় এ বছর ২০টি অভয়াশ্রম নির্মাণ হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় মাছের প্রজাতি আবারও ফিরে আসছে।’
মো. মিনারুল ইসলাম জুয়েল/এসইউ