কৃষি ও প্রকৃতি

মুরগি ও মাছের সমন্বিত খামারে জীবন বদলে গেছে সজীবের

শিক্ষাজীবন শেষে সংসারের টানাপোড়েনের চাপে স্থানীয় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি নেন সজীব। কিছুদিন যেতেই কয়েক ধাপে সাধারণ পোশাককর্মী থেকে পদোন্নতি পেয়ে হয়ে যান প্রোডাকশন অফিসার। মাসিক বেতনও ছিল প্রায় ৩০ হাজার টাকার ওপরে। কিন্তু এভাবে অর্থ উপার্জন তার কিছুতেই ভালো লাগছিল না। সুপ্ত ইচ্ছা ছিল নিজে কিছু করার। একদিন উর্ধ্বতনের সঙ্গে ঝামেলা দেখা দেয়। জেদ করে চাকরি ছেড়ে নিজেদের পুকুরে মাছ চাষ শুরু করেন সজীব।

কিন্তু বাজারে মাছের খাবারের উচ্চমূল্য তাকে ভাবিয়ে তোলে। প্রাকৃতিক খাবারে মাছ চাষের চিন্তা আসে মাথায়। এনজিও থেকে কিছু টাকা ঋণ নিয়ে পুকুরে একটি শেড তৈরি করে মুরগি পালন শুরু করেন। অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে গড়ে তোলেন ছোট্ট একটি মুরগির খামার। তার সাফল্যের গল্প শুরু হয় মাত্র দেড় বছর আগে। বাড়িতে ছোট্ট পরিসরে একটি মুরগির খামার দিয়ে যাত্রা শুরু তার।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কর্ণগোপ এলাকার তরুণ সজীব প্রথমে ৭০০ মুরগি পালন করে দেড় মাসে লাভ করেন ৪৮ হাজার টাকা। মুরগি পালন ও বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থ তাকে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখায়। এরপর অল্প পুঁজি আর দৃঢ় মনোবল নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকেন। এভাবে আরও কিছু টাকা পুঁজি করে ১ হাজার মুরগি ধারণের জন্য তৈরি করেন আরও একটি শেড। এখন মুরগির খামারের উচ্ছিষ্ট দিয়ে চলছে মাছের খাবার। সমন্বিত চাষে এখন তার মাসিক আয় প্রায় লাখ টাকা।

বাবা-মা ও দুই ভাই-বোনের সংসার তাদের। বাবা দীর্ঘদিন অসুস্থতায় বেকার জীবনযাপন করছেন। পরিশ্রমী যুবক সজীব সংসারের হাল ধরেছেন। আর্থিকভাবে হয়েছেন বেশ সাবলম্বী। সমাজেও আছে তার সম্মানিত অবস্থান। খামারের মুরগি আর পুকুরের মাছ; এই সমন্বিত চাষপদ্ধতি তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। স্থানীয় বাজারে চাহিদার জোগান দিচ্ছেন। শুধু পৈতৃক ২০ শতাংশ জমিকে কাজে লাগিয়ে সজীব গড়ে তুলেছেন সমন্বিত খামার। পুকুরের ওপর বাঁশ-কাঠ দিয়ে তৈরি করা মাচায় পালন করা হয় বিভিন্ন জাতের মুরগি। মাচার নিচের পুকুরে চাষ হয় রুই, কাতল, মৃগেলসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। মাছ ও মুরগির এ সমন্বিত চাষই তার আয়ের মূল উৎস।

আরও পড়ুনকিশোরগঞ্জের হাওরে হাঁস পালনে সম্ভাবনার আশা 

সজীবের এ সাফল্য এলাকার তরুণ ও বেকার তরুণদের জন্য হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার উৎস। তার কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে অনেকেই এখন মাছ ও মুরগি চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। সজীব তার সাফল্য সম্পর্কে বলেন, ‘শুরু থেকেই পরের কাজ ভালো লাগেনি। সংসারের টানাপোড়েনে বাধ্য হয়ে কিছুদিন চাকরি করেছি। সারাদিন পরিশ্রমের পরে বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা ভালো লাগতো না। কর্মক্ষেত্রে ঝামেলা হওয়ায় জেদ করে চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাড়ির পুকুরে মাছ চাষ শুরু করি। দেখলাম মাছের খাবারের খুব দাম। হঠাৎ মাথায় আসে প্রাকৃতিকভাবে মাছের খাবারের ব্যবস্থা হলে খরচ কমে যায়। সে লক্ষ্যেই পুকুরে একটি ১ হাজার মুরগির শেড তৈরি করে ৭০০ ব্রয়লার মুরগি পালন করি।’

তিনি বলেন, ‘প্রথমবারই ৪৮ হাজার টাকার মতো প্রফিট হয়। এদিকে ব্যবসাটা আরেকটু বাড়ানোর চিন্তা মাথায় আসে। বেশ কিছুদিন এভাবে মুরগি পালন করে কিছু পুঁজি জোগাড় করি। পরে পুকুরে আরও একটি মুরগির শেড তৈরি করি। এখন দুটি শেডেই মুরগি পালন করি। অন্যদিকে পুকুরে মাছ চাষের জন্য কোনো খাবার কিনতে হয় না। মুরগি ও মাছের সমন্বিত খামার করে এখন আমি চাকরি থেকে অনেক ভালো আছি। প্রতি মাসে আমার প্রায় লাখ টাকা আয় হয়।’

খামারি সজীবের চাচা বাবুল মিয়া বলেন, ‘সংসারের চাপে চাকরি করলেও সেখানে তার মন বসতো না। পরের অধীনে কাজ ছেড়ে এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। তার উদ্যোগে স্থানীয় বাজারে মাছ-মুরগির চাহিদা পূরণ হচ্ছে। অন্যদিকে তাকে দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেকেই নিজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন।’

আরও পড়ুনইসমাইলের মুরগির খামারে শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থান 

রূপগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘সজীবের সাথে যোগাযোগ করে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মাছ চাষের সঠিক নিয়মাবলিসহ আমাদের দপ্তরের সব সেবা দেওয়া হবে। বেকার যুবকেরা এভাবে এগিয়ে এলে কর্মসংস্থান তৈরি হবে।’

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সজল কুমার দাস জাগো নিউজকে বলেন, ‘এ ধরনের ফার্ম বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান তৈরিতে ব্যাপক সাড়া জাগাবে। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও দপ্তরের সব সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনা হবে তার খামারকে। সজীবের প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও কঠোর পরিশ্রম সফলতা বয়ে এনেছে। বেকারদের চাকরির পেছনে না ছুটে সজীবের মতো কর্মসংস্থান নিজে তৈরিতে এগিয়ে আসা উচিত।’

এনএইচএ/এসইউ