তৈয়বা খানম
বই কেবল কিছু শব্দের সমষ্টি নয়; এতে মিশে আছে একজন লেখকের স্বপ্ন, প্রত্যাশা এবং আগামীর সম্ভাবনা। একুশে বইমেলা নিয়ে প্রকাশক এবং পাঠকমহলে হতাশা থাকলেও এবারের স্বাধীনতা বইমেলার ক্ষেত্রে চিত্রটা ভিন্ন বলা যায়। এটা সত্য যে, আমরা বইপড়ার চেয়ে বই নিয়ে ফটোগ্রাফিতে বেশি ব্যস্ত থাকি। এটি লেখক ও প্রকাশক সবার জন্যই এক প্রকার হতাশা বলা যায়। তবে আশার বাণী হিসেবে এটাও বলা যাচ্ছে যে, প্রকৃত অর্থে বহু পড়ুয়া বইপড়ার জন্য বইমেলায় যান। এখনো বহু পাঠক বইয়ের গন্ধ নেওয়া ও বই স্পর্শ করার মাঝে আত্মতৃপ্তি খুঁজে পান।
তার একটি বাস্তব উদাহরণ যদি বলি, চট্টগ্রামের স্বাধীনতা বইমেলায় একজন মা নিজের জন্য যেমন বই কিনছেন; একই সাথে তার শিশুটিকেও সুন্দর সুন্দর ছবিযুক্ত বইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন। তার সন্তানের জন্য বাছাই করা বই দেখে এতটুকু বুঝতে পারি যে, তিনি ছোট থেকেই শিশুর মনে ঈমানের বীজ বপন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এভাবে বহু বইপ্রেমীর দেখা মেলে বইমেলায়। তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থীদের এই জায়গায় অভিযোগ থাকে যে, বইমেলার সময়সূচি বিকেল তিনটা থেকে হওয়ায় দেখা যায়, অনেকের ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও যাওয়া সম্ভব হয় না। যদিও ছুটির দিনগুলোতে বইমেলা দশটা থেকে রাখা হয়েছে। কিন্তু সময়টা যদি সকাল দশটা থেকে শুরু হতো অন্যান্য দিনগুলোতেও। তবে আরও বহু পাঠক বইমেলা পরিদর্শনের সুযোগ তৈরি হতো বলে শিক্ষার্থীদের অভিমত থেকে জানতে পারি।
সব সময় বই না কেনার পেছনে আগ্রহ না থাকাটাই মূল কারণ হিসেবে কাজ করে বলে আমার মনে হয় না। একই সঙ্গে এর সাথে বাবা- মায়ের সন্তানকে বইয়ের ব্যাপারে উৎসাহিত না করাও সমান দায়ী। এমনও বাবা-মা দেখেছি, যারা বই কেনাকে নিছক টাকা অপচয় হিসেবে দেখছেন। সন্তান বইমেলা দেখা ও বই কিনতে আগ্রহী হলেও দেখা যায়, বাবা-মায়েরা এ ব্যাপারে খুব একটা উৎসাহী নন। ব্যাপারটা কিন্তু পরবর্তীতে পড়ুয়া তৈরিতে অশনিসংকেত বলা যায়।
আমাদের তরুণ প্রজন্মকে পড়ুয়া হিসেবে গড়তে তাদের অনেক বেশি বইয়ের সাথে সম্পৃক্ত করতে বইমেলার সাথে সম্পৃক্ততা বাড়ানো প্রয়োজন। এটাও লক্ষ্যণীয় যে, সব সময় অভিভাবকের পছন্দে সন্তানেরা বই পড়বেন ব্যাপারটা তেমন নয়; বরং সন্তানদের নিজেদের পছন্দ ও রুচি অনুযায়ী মানসম্মত বই তাদের পড়ার সুযোগ দেওয়া উচিত।
আরও পড়ুনএখানে কয়েকটি জীবন: যে গল্প হৃদয়ে গাঁথাএকটি পড়ুয়া সমাজ তৈরিতে কার্যকরী পদক্ষেপ এই বইমেলা পরিদর্শন। তাই নিজের জন্য খুব একটা বই কেনা না হলেও চেষ্টা করেছি অন্তত নিজের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি হলেও বই নেওয়ার। যাতে তারা বইয়ের সাথে পরিচিত হতে পারে। লেখালেখির জায়গা থেকে খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করেছি একজন লেখকের বই নিয়ে স্বপ্ন। তাই চেষ্টা করেছি খুব একটা বই কেনা সম্ভব না হলেও অন্তত এমনভাবে বইমেলা পরিদর্শনের, যাতে লেখকদের মাঝে আশাটুকু জিইয়ে থাকে যে, এখনো বহু পাঠক বইয়ের মাঝেই নজরবন্দি হয়।
তবে এবারের বইমেলায় বড়দের পাশাপাশি ছোটদের জন্যও দারুণ সব ছবিযুক্ত সহজ, সাবলীল ও মানসম্মত বইয়ের দেখা মিলেছে। বর্ণমালা পরিচয়, নৈতিক শিক্ষা, ছবির মাধ্যমে বিশ্ব চেনাসহ নানা বই ছোটদের ক্যাটাগরিতে সংযুক্ত ছিল। এটা আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য বেশ ইতিবাচক দিক বলা যায়। বইমেলা পরিদর্শনের সম্পূর্ণ সময়জুড়ে আমার মনে হয়েছে এই বইমেলায় সব পাঠক তার পছন্দের ক্যাটাগরি অনুযায়ী বই বাছাই করতে পারবেন। ইসলামি, কল্পকাহিনি, আত্ম-উন্নয়নমূলক, বৈশ্বিক আলোচনা সমৃদ্ধ বহু খ্যাতনামা বইয়ে সমৃদ্ধ ছিল স্বাধীনতা বইমেলা।
সবশেষে বলতে চাই, বইমেলা নিয়ে হতাশার মাঝেও আমাদের বহু সম্ভাবনা দৃশ্যমান। এই সম্ভাবনাগুলোর নজরদারির মাধ্যমে যদি সঠিক পরিচর্যা করা হয়, তবে আগামীতে বইমেলা আরও ব্যাপক পরিসরে বৃহৎভাবে ছড়িয়ে যাবে প্রতিটি প্রান্তে। প্রকৃত অর্থে এখনো বহু পাঠক শেখার জন্য, জানার জন্য ও জানানোর জন্য বইমেলা পরিদর্শন করেন। সংখ্যাটা কম হলেও নগণ্য নয়। তাই আমাদের হতাশ না হয়ে এ সম্ভাবনাটুকু সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে সমৃদ্ধ করতে হবে।
এ জায়গায় অভিভাবকদের নিজে বই পড়ে সন্তানদের বই পড়তে উৎসাহিত করতে হবে। তার চারপাশের পরিবেশকেই বইয়ের রাজ্য করে গড়ে তুলতে হবে। তবে এই বই সন্তানের চিন্তার জঞ্জাল পরিবর্তনে দারুণ প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করবে। এভাবেই একটি বইমেলা পরিদর্শন আমার মানসপটে জাগিয়ে দিয়েছিল হাজারো ভাবনা। আনমনে বলে উঠলাম, বইয়ের কদর হওয়ার মাধ্যমেই সর্বত্র গড়ে উঠুক বইয়ের রাজ্য।
লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ।
এসইউ