দেশজুড়ে

ফেনীতে ‘বারোমাসি’ খালে বদলেছে কৃষকের ভাগ্য

ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার মুন্সীরহাট ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী কামাল্লা গ্রামের ‘বারোমাসি’ খাল বদলে দিয়েছে স্থানীয় কৃষির চিত্র। বছর জুড়ে খালটিতে পানি প্রবাহ থাকায় গ্রামটি এখন পরিণত হয়েছে বিষমুক্ত শাক-সবজি উৎপাদন কেন্দ্রে।

চাষাবাদে সেচ সংকট না থাকায় জমিতে সারাবছর নানা ধরনের সবজি চাষ করে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি কৃষিতে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা।

স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, একসময় বছরে মাত্র একবার আমন ধানের আবাদ ছিল কৃষকদের প্রধান ভরসা। বছরের বাকি সময়টায় অনেকেই মাছ ধরা কিংবা দিনমজুরির ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তবে সময়ের ব্যবধানে বদলে গেছে সেই চিত্র।

কৃষকরা জানান, এই সাফল্যের পেছনে মূল চাবিকাঠি হচ্ছে ‘বারোমাসি খাল’। ভারতের উঁচু পাহাড় থেকে সারা বছর পানি প্রবাহিত হওয়ায় স্থানীয়ভাবে খালটি এই নামে পরিচিত। তবে দীর্ঘদিন দলে খালের ওপর স্থায়ী স্লুইচ গেট নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসলেও এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি। তাই কৃষকরা নিজেদের উদ্যোগে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে খালে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে সেচের পানি সংরক্ষণ করছেন। এর ফলে আমন ধানের পাশাপাশি সবজি চাষেও ব্যাপক সাফল্য এসেছে। ধীরে ধীরে এই উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো গ্রামে।

সরেজমিনে দেখা যায়, গ্রামের ২০-২৫ জন কৃষক প্রায় ১০-১২ কানি জমিতে টমেটো, শসা, করলা, মরিচ, বরবটি, চিচিঙ্গাসহ নানা ধরনের দেশীয় সবজি চাষ করছেন। এসব সবজি উৎপাদনে কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিক বা কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে না, জৈবসারের মাধ্যমে উৎপাদিত হচ্ছে নিরাপদ খাদ্য।

স্থানীয়রা জানান, একসময় যেখানে অনিশ্চয়তা ছিল কৃষকদের নিত্যসঙ্গী, সেখানে এখন বিষমুক্ত সবজি চাষই হয়ে উঠেছে তাদের স্বাবলম্বিতার মূল চাবিকাঠি। বারোমাসি খালকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই উদ্যোগ শুধু কামাল্লা নয়, দেশের অন্যান্য এলাকার কৃষকদের জন্যও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে।

স্থানীয় কৃষক নুরুল আমিন বলেন, আগে শুধু আমন ধান করতাম। এখন সারা বছর সবজি চাষ করছি। এসব বিষমুক্ত সবজি ফেনী শহরে বিক্রি করি। চাহিদা অনেক বেশি, তাই ভালো দামও পাই।

একইভাবে কৃষক আবুল কালাম আজাদ ও ওয়াজি উল্লাহ জানান, দেশীয় উন্নত জাতের সবজি চাষে তারা ভালো ফলন পাচ্ছেন। আবুল কালাম আজাদ বলেন, হাইব্রিডের ভিড়ে দেশীয় জাত হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা দেখেছি দেশীয় জাতেও ভালো ফলন পাওয়া যায়। সবজি চাষ করে এখন আমরা আর্থিকভাবে সচ্ছল।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সবজি উৎপাদনে তারা আধুনিক কৃষি কৌশলও ব্যবহার করছেন। মাঠে সেক্স ফেরোমেন ফাঁদ, হলুদ কার্ড দিয়ে পোকামাকড় দমন, মালচিং পদ্ধতির মাধ্যমে জমির আর্দ্রতা সংরক্ষণ এবং স্বচ্ছ আবরণ ব্যবহার করায় ফসল উৎপাদন খরচ কমছে এবং ফলনও বাড়ছে।

কৃষক নুরুল আমিন জানান, বছরে প্রায় এক লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করছি। জৈবসার ব্যবহার করায় আমাদের সবজি সুস্বাদু হয়, তাই বাজারে এর চাহিদাও বেশি।

মুন্সীরহাট ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রুবি আফরোজ বলেন, মালচিং পদ্ধতি ব্যবহার করলে আগাছা কম হয়, জমিতে রস ধরে রাখা যায় এবং খরচও কমে। নুরুল আমিনের সফলতা দেখে এখন অনেক কৃষক সবজি চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, বারোমাসি খালের ওপর একটি ফ্লুইস গেট নির্মাণ করা গেলে এ অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষকরা অধিক লাভবান হবেন।

ফুলগাজী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. খোরশেদ আলম বলেন, সীমান্তবর্তী কামাল্লা গ্রাম এখন দেশীয় সবজির এক সমৃদ্ধ উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।

আবদুল্লাহ আল-মামুন/এফএ/জেআইএম