প্রবাস

লন্ডনে অবৈধ ডেলিভারিকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযান: বাস্তবতা, আইন এবং প্রভাব

ক্যানিং টাউনে একটি ব্যক্তিগত কাজ শেষ করে বার্কিং রোড ধরে হাঁটছিলাম। রাস্তার পরিবেশ ছিল স্বাভাবিক, তবে কিছু দূর এগিয়ে হঠাৎ লক্ষ্য করলাম অস্বাভাবিক ভিড়। সামনে গিয়ে দেখি, রাস্তার পাশে কয়েক ডজন পুলিশ দাঁড়িয়ে এবং ইলেকট্রিক বাইকে আসা ডেলিভারিম্যানদের থামিয়ে তাদের একটি অস্থায়ী ক্যাম্পের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ঘটনাটি দেখে আপাশের লোকজনও কৌতূহলবশত ভিড় জমিয়েছে। আমিও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করতে থাকি। আমার চোখের সামনেই কয়েকজন ডেলিভারিম্যানকে ইশারা করে আলাদা জায়গায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, যেখানে তাদের কাগজপত্র যাচাই করা হচ্ছিল বলে মনে হচ্ছিল।

লন্ডনের রাস্তায় ডেলিভারিম্যানদের উপস্থিতি এখন খুবই সাধারণ একটি দৃশ্য, বিশেষ করে ইলেকট্রিক বাইক ব্যবহারকারীদের। এদের একটি বড় অংশ দক্ষিণ এশীয় দেশ—বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারত থেকে আগত বলে সহজেই বোঝা যায়। কিছু ক্ষেত্রে জানা যায়, তাদের মধ্যে অনেকে বৈধ ভিসা ছাড়া অবস্থান করছেন বা ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। ফলে তারা সরাসরি কোনো বৈধ কাজ করতে না পেরে বিকল্প উপায়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। অনেক সময় বৈধ কারও নাম বা ডেলিভারি অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে তারা কাজ চালিয়ে যান, যার বিনিময়ে আয়ের একটি অংশ দিতে হয়। এসব কারণে তারা সবসময় ঝুঁকির মধ্যে থাকেন এবং এ ধরনের রেইড তাদের জন্য বড় ধরনের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ঘটনাস্থল থেকে কিছুক্ষণ পর আমি আবার হাঁটতে শুরু করি। বার্কিং রোডে তখনও লোকজনের ভিড় এবং ডেলিভারিম্যানদের যাতায়াত অব্যাহত ছিল। ঠিক তখনই দেখি, আমার সামনে দিয়ে এক ডেলিভারিম্যান তার বাইক চালিয়ে রেইডের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। তার চেহারা দেখে বাংলাদেশি মনে হওয়ায় আমি তাকে সতর্ক করার জন্য বললাম সামনে পুলিশ চেকিং চলছে। তিনি থেমে আমার কাছে জানতে চাইলেন পুলিশ ‘কিয়া চেক কররাহে‘ করছে। আমি তাকে বললাম, সম্ভবত কাগজপত্র যাচাই করা হচ্ছে, তাই ওইদিকে না যাওয়াই ভালো।

তিনি কিছুটা এগিয়ে গিয়ে দ্বিধায় পড়ে রাস্তার মাঝখানে থেমে যান এবং পেছনে ফিরে আমার দিকে তাকান। আমি তাকে ইশারায় আবার কাছে ডেকে নিই এবং পুনরায় সতর্ক করি। আমার কথা শুনে তিনি তার সাইকেল ঘুরিয়ে বিপরীত দিকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় লক্ষ্য করলাম, খুব দ্রুত খবরটি ছড়িয়ে পড়ে এবং একে একে অনেক ডেলিভারিম্যান বার্কিং রোড দিয়ে উল্টো দিকে ফিরে আসতে শুরু করে। পুরো পরিস্থিতিটি মুহূর্তেই বদলে যায়—যেখানে কিছুক্ষণ আগে স্বাভাবিক চলাচল ছিল, সেখানে হঠাৎ করেই এক ধরনের অস্থিরতা এবং সতর্কতা দেখা দেয়।

বলাবাহুল্য যে, এই ধরনের অভিযান মূলত যুক্তরাজ্যের অভিবাসন আইন কার্যকর করার অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়। এগুলো পরিচালনা করে যুক্তরাজ্য হোম অফিস-এর অধীন ইমিগ্রেশন এনফোর্সমেন্ট টিম এবং অনেক সময় স্থানীয় পুলিশের সহযোগিতায়। সাধারণত যেসব এলাকায় ডেলিভারি কর্মীদের আনাগোনা বেশি বা যেখানে অনিয়মের অভিযোগ থাকে, সেসব জায়গায় পরিকল্পিতভাবে এ ধরনের রেইড পরিচালনা করা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো অবৈধভাবে কাজ করা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং শ্রমবাজারে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা।

রেইড চলাকালে কর্মকর্তারা ডেলিভারিম্যানদের থামিয়ে তাদের পরিচয়পত্র, ভিসার অবস্থা এবং কাজ করার বৈধতা যাচাই করেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একজনের নামে খোলা ডেলিভারি অ্যাকাউন্ট অন্য কেউ ব্যবহার করছে, যা আইনত অপরাধ। কিছু ক্ষেত্রে নজরদারি প্রযুক্তি বা পূর্ব তথ্য ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদেরও টার্গেট করা হয়, যদিও এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টি সবসময় একরকম নয় এবং এটি নিয়ে বিতর্কও রয়েছে।

যদি কোনো ব্যক্তি অবৈধভাবে অবস্থান বা কাজ করতে গিয়ে ধরা পড়েন, তাহলে প্রথমে তাকে আটক করা হতে পারে এবং ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার দেশে আসার পদ্ধতি, ভিসার অবস্থা এবং বর্তমান কাজের তথ্য যাচাই করা হয়। এরপর পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়—কেউ কেউ ইমিগ্রেশন বেইলে মুক্তি পেতে পারেন, যেখানে নির্দিষ্ট সময় পরপর রিপোর্ট করতে হয়; আবার অনেককে ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হতে পারে পরবর্তী প্রক্রিয়ার জন্য।

গুরুতর ক্ষেত্রে অবৈধ অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো বা ডিপোর্ট করা হতে পারে। এক্ষেত্রে ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য যুক্তরাজ্যে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয়, যা এক থেকে দশ বছর পর্যন্ত হতে পারে। তবে কেউ যদি আশ্রয় প্রার্থনা করেন, তাহলে তার আবেদন আলাদাভাবে বিবেচনা করা হয় এবং তা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাকে তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো হয় না।

এই পুরো প্রক্রিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যারা অবৈধভাবে কাজের সুযোগ করে দেয়। কোনো বৈধ ব্যক্তি যদি তার ডেলিভারি অ্যাকাউন্ট অন্যকে ব্যবহার করতে দেন, বা কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যদি জেনে-শুনে অবৈধ কর্মী নিয়োগ করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। জরিমানা, লাইসেন্স বাতিলসহ বিভিন্ন শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়।

সব মিলিয়ে, এ ধরনের রেইড শুধু আইন প্রয়োগের একটি অংশ নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অভিবাসন নীতি, শ্রমবাজারের ভারসাম্য এবং সামাজিক বাস্তবতার একটি জটিল চিত্র। অনেক অভিবাসী জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নিলেও, আইনের দৃষ্টিতে এসব কার্যক্রম অবৈধ—এবং সেই কারণেই নিয়মিতভাবে এ ধরনের অভিযান পরিচালিত হয়ে থাকে।

এমআরএম