জাতীয় সংসদ অধিবেশনে বিরোধী দল ‘অপ্রাসঙ্গিক’ কিছু বক্তব্য তুলে যে কয়েকবার ওয়াকআউট করেছে, সে বিষয়গুলো ‘যৌক্তিক হয়নি’ বলে মনে করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
রোববার (১২ এপ্রিল) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ১৩৩টি অধ্যাদেশ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী এ কথা জানান। এসময় আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ও চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি উপস্থিত ছিলেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধ্যাদেশগুলো নিষ্পত্তির জন্য সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার পর ৩০ দিন সময় সরকারের হাতে ছিল। তবে ছুটির জন্য কাজের সময় খুবই কম পাওয়া গেছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বেশ কয়েকবার জাতীয় সংসদের অধিবেশন থেকে বিরোধীদলীয় নেতা এবং অন্য সদস্যরা বিভিন্ন ইস্যুতে ওয়াকআউট করেছেন। এটা পার্লামেন্টারি কালচার অনুসারে বিধি মোতাবেক তারা করতেই পারেন।
‘কিন্তু যেসব ইস্যুতে তারা ওয়াকআউট করেছেন সেখানে কিছু কিছু তথ্য সঠিক ছিল না। উনারা সঠিকভাবে উপস্থাপন করেননি। হয়তো তারা সরকারি দলের ওপরে বিভিন্ন বিষয়ে দোষ চাপিয়েছেন বলা যায়।’
মন্ত্রী বলেন, সে বিষয়গুলো তাৎক্ষণিকভাবে যতটুকু অ্যাড্রেস করা দরকার পার্লামেন্টে সেটুকু আমরা করেছি। কিন্তু ওনারা যখন বাইরে এসে প্রেসের সঙ্গে কথা বলেছেন, তার মধ্যে অনেকগুলো বিষয়ে কথা বলেছেন, যেগুলোর বিষয়ে আমাদের এখন বাইরে জবাব দেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে আমরা অনেকটা আপনাদের কাছে, মিডিয়ার কাছে, জাতির কাছে হয়তো আমাদের বিষয়টা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে পারবো না। সেজন্যই আজকের এই প্রেস ব্রিফিং।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটি না থাকায় অধ্যাদেশগুলো পর্যালোচনার জন্য বিশেষ কমিটি করা হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, গত ২ এপ্রিল সেই কমিটির আহ্বায়ক আমাদের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জিল্লুল হাকিম সাহেব প্লেস করেছেন। তার মধ্যে কয়েকটা ভাগে এটা প্লেস করা হয়েছে। এরমধ্যে ৯৮টি অর্ডিন্যান্সের ব্যাপারে প্রথম ভাগে বলা হয়েছে, এটা অ্যাজ ইট ইজ আমরা সংসদে যেভাবে আছে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হবে। এরপর ১৬টি অধ্যাদেশের বিষয়ে বলা হয়েছে, এটা যাচাই-বাছাই করে পরে বিল আকারে সংসদে উপস্থাপন করা হবে। তারপরের একটা তালিকা আছে, সেই তালিকার মধ্যে যেগুলো আমরা হেফাজত এবং রহিতকরণ করবো সেই তালিকাটা আছে। একটা আছে সংশোধিত আকারে।
‘বিরোধীদলীয় নেতা পরে যখন ওয়াকআউট করেন তখন তিনি বললেন যে, ‘৯১টি বিল এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে, ১৬টা যাচাই-বাছাই করে পরে উপস্থাপন করার কথা বলা হয়েছে, বাকিগুলো গেল কোথায়?’ আইনমন্ত্রী সাহেব ফ্লোরে জবাব দিয়েছেন যে, এই ৯১টির মধ্যেই কিন্তু বাকি ১৭টা অন্তর্ভুক্ত। কারণ, কোনো কোনো অধ্যাদেশ জারি হওয়ার ১৫-২০ দিন এক মাস দুই মাস পরে দ্বিতীয় সংশোধনী আনা হয়েছে কোথাও কোথাও তৃতীয় সংশোধনীও আনা হয়েছে, মূলত অধ্যাদেশ একটা।’
‘তো যখন বিল আকারে উপস্থাপন করা হয় জাতীয় সংসদে সব অধ্যাদেশগুলোকে এক করে একটা বিল আকারেই উপস্থাপন করা হয়েছে। এটা আমার মনে হয় বিরোধীদলীয় নেতা হয়তো খেয়াল করেননি। সে কারণে তিনি মনে করেছেন ৯১টি না হয় প্লেস হলো, ১৬টি প্লেস হবে না বাকিগুলো গেল কোথায়? বাকিগুলো এই ৯১টার মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, যে বিলগুলো নিয়ে পার্লামেন্টে এই বিশেষ রিপোর্টের মধ্যে বিরোধীদলীয় সদস্যরা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিলেন, এই বিশেষ কমিটির রিপোর্টেও হুবহু সেসব নোট অব ডিসেন্টগুলো উল্লেখ করা হয়েছে যেভাবে তারা দিয়েছেন। নোট অব ডিসেন্ট দেওয়া অধ্যাদেশগুলো যেগুলো সংসদে উপস্থাপিত হয়নি বা সংশোধিত আকারে হয়েছে অথবা রহিত এবং হেফাজতকরণের জন্য উপস্থাপিত হয়েছে- এসব বিষয়ে নজিরবিহীনভাবে স্পিকার ২ মিনিটের জায়গায় কোথাও ১০ মিনিট, ১৫ মিনিট করে বিরোধীদলীয় সদস্যদের কথা বলার সুযোগ দিয়েছেন। তারা দীর্ঘ লিখিত বক্তব্য পাঠ করেছেন আপনারা দেখেছেন। এবং এটাও কিন্তু নজিরবিহীন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সব বক্তব্য দেখা গেছে তারা বাইরে থেকে রেডি করে নিয়ে গেছেন, হুইচ ইজ গুড। আই অ্যাপ্রিশিয়েট ইট... রেডি হয়ে যাওয়া ভালো। রচনা আকারে তারা পাঠ করেছেন বিবৃতিগুলো। এরপরও আমরা কোনো কারণ দেখিনি শেষ দিনে ওয়াকআউট করার।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ সবাই মিলে আলোচনা করে পরবর্তীতে বিল আকারে আনতে পারি। সেটা তো একটা উত্তম প্রস্তাব। তো এখন সেই বিষয়গুলো রিজনেবলি তারা বিবেচনা না করে এবং ওখানে আবার নির্বাচনের কিছু ইস্যু তুলে এবং অন্যান্য অপ্রাসঙ্গিক কিছু বক্তব্য তুলে তারা যে কয়েকবার ওয়াকআউট করেছেন, সেই বিষয়গুলো আমার মনে হয় যে যৌক্তিক হয়নি।
‘আর কিছু কিছু বিষয়ে কোনো কোনো অধ্যাদেশের বিষয়ে তাদের বক্তব্য ছিল। তো আমরা বলেছি এগুলো আমরা যাচাই-বাছাই করে যেমন—গুম অধ্যাদেশ, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ আর আর একটা কী বিষয় ছিল? আইসিটি। আইসিটি-টা আসে নাই, আমরা বলেছি এটা প্রসঙ্গক্রমে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ আইন এগুলো স্টেকহোল্ডারদের সাথে আমরা ব্যাপক আলাপ-আলোচনা করবো। করে এটাকে আরও এনরিচ করে আমরা পরবর্তী সেশনে নিয়ে আসতে চাই। এবং সবাইকে ইনক্লুড করে স্টেকহোল্ডারদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে তারপরে এই আইনগুলো যদি আরও সমৃদ্ধ করা হয় সেটা তো জাতির জন্যই ভালো হবে।’
অধ্যাদেশগুলো হুবহু পাস করে দিলে এগুলো শুদ্ধ আইন হবে তা নয়- মন্তব্য করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কারণ আমরা যদি ভুলগুলো রেখে এই আইনগুলো রেখে দিই তাহলে গুম কমিশনের যে এখতিয়ার দেয়া হয়েছে তাতে করে যারা গুমের শিকার তারাই অবিচারের শিকার হবেন। আমরা আমি নিজে গুমের শিকার। আমরা চাচ্ছি এই গুম কমিশনটা এমনভাবে আমরা করি যাতে তার ফাংশনটাও ঠিক থাকবে এবং গুমের শিকার যারা হবেন তারাও যেন ন্যায়বিচারটা পান।
মন্ত্রী বলেন, কিন্তু ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের কেউ কেউ নিজেদের প্রোভাইড করার জন্য তাড়াহুড়ো করে এই মানবাধিকার কমিশন এবং গুম অধ্যাদেশ—এগুলো করে ফেলেছে। আমরা দোষ দিতে চাই না, দেড় বছর একটা গভর্নমেন্টের বয়স, হয়তো তাড়াহুড়োর মধ্যে উনারা করতে চেয়েছেন, সেজন্য কিছু কিছু ভুলভ্রান্তি থাকতেই পারে। তো এখন তো একটা রেগুলার গভর্নমেন্ট, পলিটিক্যাল গভর্নমেন্ট। এখন অনেক সময় আছে, আমরা আলাপ-আলোচনা করে এটা করতে পারি। যেন গুমের শিকার যদি কেউ হন বা অতীতে যারা হয়েছেন তাদের জন্য যদি ন্যায়বিচার এবং সর্বোচ্চ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারি তাহলে সেটাই কি ভালো না?
তিনি বলেন, সেজন্য আমাদের একটু সময় দরকার। এখন এই বিষয়গুলো মাথায় রেখেই আমরা কথা বলেছি। কিন্তু বিরোধী দলের সদস্যরা এই জিনিসগুলোকে রাজনীতিকীকরণ করেছেন। আমরা যেটা করতে চাই না।
আরএমএম/এমকেআর