ফিচার

বাংলা দিন, মাস-বছর গণনা কে, কবে শুরু করে

বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে চারদিকে এখনই সাজ সাজ রব। লাল-সাদা পোশাক, মঙ্গল শোভাযাত্রা, পান্তা ইলিশ, আর ‘এসো হে বৈশাখ’ গানের সুরে মুখর হয়ে ওঠে পুরো বাংলাদেশ। তবে অনেকেই হয়তো জানেন না বাংলা মাস ও বছরের গণনা শুরু হলো কীভাবে, আর এর পেছনে ইতিহাসটাই বা কী?

বাংলা সনের সূচনা হয় মোগল সম্রাট আকবরের আমলে

বাংলা সনের সূচনা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে কিছু ভিন্ন মত থাকলেও সাধারণভাবে ধরা হয় যে বাংলা সাল প্রবর্তনের কৃতিত্ব মোগল সম্রাট আকবরের। ষোড়শ শতকে তার শাসনামলে কৃষি ও খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্যই বাংলা সনের সূচনা করা হয়।

তখন ভারত উপমহাদেশে প্রশাসনিক কাজকর্মে ব্যবহার হতো ইসলামী হিজরি সাল, যার ভিত্তি ছিল চাঁদের উপর। কিন্তু কৃষিকাজ পুরোপুরি নির্ভর করে ঋতু ও সূর্যের গতিপথের ওপর। ফলে হিজরি সাল অনুযায়ী খাজনা আদায় করতে গিয়ে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তেন কৃষকরা। কারণ বছর ঘুরে খাজনা দেওয়ার সময় কখনো ফসল ওঠার আগেই চলে আসত।

আরও পড়ুন৩২ বছর ধরে ডাকটিকিট সংগ্রহ করছেন চিকিৎসক মশিউরবৈসাবি উৎসব: পাহাড়ে নববর্ষের অনন্য আয়োজন

এই সমস্যার সমাধান করতেই সম্রাট আকবর একটি নতুন বর্ষপঞ্জি চালুর উদ্যোগ নেন। ১৫৮৪ সালে এটি চালু হয়, তবে এর গণনা শুরু হয় সম্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহণের বছর, অর্থাৎ ৫ নভেম্বর ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে। ইতিহাসে জানা যায়, তার দরবারের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও পণ্ডিত ফাতুল্লাহ শিরাজির সহায়তায় বাংলা সনের একটি নতুন পদ্ধতি তৈরি করা হয়। এটি মূলত হিজরি সন ও প্রাচীন সৌর গণনার সমন্বয়ে তৈরি হয়েছিল।

নতুন বর্ষপঞ্জিকে বলা হতো ‘ফসলি সন’ বা ‘তারিখ-ই-ইলাহি’

এই নতুন বর্ষপঞ্জিকে বলা হতো ‘ফসলি সন’ বা ‘তারিখ-ই-ইলাহি’। ধীরে ধীরে তা বাংলার কৃষি ও অর্থনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তীকালে তা-ই বাংলা সন হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বাংলা সনের প্রথম দিন নির্ধারণ করা হয় বৈশাখ মাসের প্রথম দিন যা আজ আমরা পহেলা বৈশাখ নামে উদযাপন করি।

বাংলা ক্যালেন্ডারের মাসগুলোর নামও এসেছে প্রাচীন নক্ষত্রপুঞ্জের নাম থেকে। যেমন-বৈশাখ এসেছে ‘বিশাখা’ নক্ষত্র থেকে, জ্যৈষ্ঠ এসেছে ‘জ্যেষ্ঠা’ থেকে। এভাবে আকাশের নক্ষত্র আর প্রকৃতির ঋতুচক্রের সঙ্গে মিল রেখেই গড়ে উঠেছে বাংলা মাসের নাম ও সময়সূচি।

বাংলাদেশে আধুনিক বাংলা বর্ষপঞ্জি

সময়ের প্রবাহে বাংলা সনের ক্যালেন্ডারেও কিছু পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশে আধুনিক বাংলা বর্ষপঞ্জি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয় ১৯৬৬ সালে। সেই সংস্কার কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ভাষাবিদ মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ। পরে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার সেই সংস্কার করা পঞ্জিকাকেই সরকারি ক্যালেন্ডার হিসেবে গ্রহণ করে।

আজ পহেলা বৈশাখ শুধু একটি নতুন বছরের সূচনা নয়, এটি বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই দিনটি মানুষকে নতুন করে শুরু করার প্রেরণা দেয়।

কেএসকে