এবারে ঈদে সারাদেশের রমনীদের নজর কেড়েছে টাঙ্গাইলের জামদানি। আধুনিকতার ছোঁয়া আর রং ও রূপের বৈচিত্র্যের জন্যই এ শাড়ি রমনীদের নজর কেড়ে চাহিদার শীর্ষে স্থান পেয়েছে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা। ঈদকে ঘিরে দেশের প্রায় প্রতিটি শপিং মল, মার্কেট ও বিপনী বিতানে লেগেছে শাড়ি কেনাবেচার ধুম। ফলে মহাজনদের চাহিদা পূরণে তাঁতের জামদানি তৈরিতে তাঁত শিল্পীদের চলছে বিরামহীন প্রতিযোগিতা। দিন রাত শোনা যাচ্ছে এ সকল গ্রামে মাকুরের মনোমুগ্ধকর খট খট শব্দ।জানা যায়, প্রাচীন কাল থেকে টাঙ্গাইলের দক্ষ কারিগররা তাদের বংশ পরম্পরায় তৈরি করছেন বিশেষ এ শাড়ি। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা ও হিউয়েন সাংয়ের ভ্রমণ কাহিনীতে টাঙ্গাইলের বস্ত্র শিল্প অর্থাৎ তাঁতশিল্পের উল্লেখ রয়েছে। বর্তমানে এ তাঁতের শাড়ির জন্যই টাঙ্গাইলের সুনাম ও পরিচিতি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। টাঙ্গাইলের তাঁত পল্লীর উৎপত্তি স্থল সদর উপজেলার ধুলটিয়া, বাজিতপুর, সুরুজ, বার্থা, বামনকুশিয়া, ঘারিন্দা, গোসাইজোয়াইর, তারুটিয়া, এনায়েতপুর, বেলতা, গড়াসিন, সন্তোষ, কাগমারী; কালিহাতী উপজেলার বল্লা, রামপুর, ছাতিহাটি, আইসড়া, রতনগঞ্জ, কোকডোহরা; দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল, চন্ডি, নলুয়া, দেওজান, নলশোঁধা, বিষ্ণুপুর এবং গোপালপুর ও ভূঞাপুর উপজেলার কিছু কিছু গ্রামে রয়েছে। তাঁতের জামদানি শাড়ি তৈরি করতে হাতের কাজ করা হয় খুব দরদ দিয়ে। পুরুষেরা তাঁত বোনে আর চরকাকাটা, তানা পারির কাজে সহযোগিতা করে তাদের পরিবারের নারীরা। তাঁতিরা মনের রঙ মিশিয়ে শাড়ির জমিনে শিল্প সম্মতভাবে তাঁত মেশিনের মাধ্যমে নানা ডিজাইন ও নকশা তৈরি করে। এ নকশা, বুনন, ও রঙয়ের ক্ষেত্রে রয়েছে অতুলনীয় বৈচিত্র্য। আরমান, আশরাফ, বছু, জহির নামে কয়েকজন শ্রমিক জানান, অনেক কষ্ট সহ্য করতে পারলে একদিনে একটি জামদানি শাড়ি তৈরি করা যায়। অন্যথায় দুই দিন সময় লাগে। আবার প্রকারভেদে কোনো জামদানি শাড়ি তৈরি করতে তিন থেকে চারদিনও সময় লেগে যায়। ডিজাইন অনুপাতে আমরা কোনো শাড়িতে ৫ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত শ্রমিক মজুরি পেয়ে থাকি।মমিনুর রহমান নামে এক তাঁত মালিক জানান, রঙ বেরংয়ের রেয়ন, জরি ও উন্নতমানের মোলায়েম চিকন সুতার মাধ্যমে আমরা এ টাঙ্গাইলের জামদানি শাড়ি তৈরি করে থাকি। এবার ঈদে রমনীদের নজর কেড়েছে আমাদের তৈরি টাঙ্গাইলের জামদানি শাড়ি। বিশেষত সদর উপজেলার বাজিতপুর ও করটিয়ার হাট থেকে এ জামদানি শাড়ি পাইকারি ক্রেতাদের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশে।জেলা শহরের সমবায়, খান প্লাজা, টাঙ্গাইল প্লাজা, মেজর জেনারেল (অব.)মাহমুদুল হাসান কলেজ মাকেট, হিরা সুপার মার্কেটসহ বেশ কয়েকটি মার্কেট ঘুরে কয়েকজন নারী ক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দাম একটু বেশি হলেও অত্যাধুনিক বাহারি ডিজাইনের তাদের পছন্দের জামদানি শাড়ি ক্রয় করতে পেরে তারা আনন্দিত।মেজর জেনারেল (অব.) মাহমুদুল হাসান কলেজ মার্কেট বিক্রেতা পারভেজ, রিপন বসাক জানান, ডিজাইন, রঙ, হাতের কাজ ও সুতার গুণাগুণ ভেদে সর্বনিম্ন হাজার টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে টাঙ্গাইলের জামদানি শাড়ি। পাঁচ প্রকার জামদানি রয়েছে আমাদের দোকানে। এর মধ্যে রয়েছে ঢেউ, আম, রহিতন, তারা, ডাবল আম, ডেমরা। এ শাড়ির দৈর্ঘ্য ১২ হাত, ব্রাউজ ২ হাত ও প্রস্থ ৪৬ ইঞ্চি।আমির আলী নামের আরেক ব্যবসায়ী জানান, টাঙ্গাইলের শাড়ির বৈশিষ্ট্যে রয়েছে কাপড়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সুচারু কারুকাজ। এ শাড়ি তৈরি করার জন্য আমরা ৮০, ৮২, ৮৪ ও ১’শ কাউন্টের সুতা ব্যবহার করে থাকি। তবে এর মধ্যে ৮২ কাউন্টের সুতা বেশি ব্যবহার করা হয়। আর এবার ঈদে আমরা জামদানি শাড়ি বিক্রি করে বেশ লাভবান হচ্ছি।পাথরাইলের বিশিষ্ট শাড়ি ব্যবসায়ী ও যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোং এর সত্ত্বাধিকারী রঘুনাথ বসাক জানান, ২০০১ সালে এ অঞ্চলে ৭৫ হাজার ৪৬০টি তাঁত ছিল। এর মধ্যে পিটলুম ছিল ২৭ হাজার ৬৮২, চিত্তরঞ্জন ৪৭ হাজার ৩৫৩ ও পাওয়ার লুম ছিল ৪২৫টি। এর সংখ্যা ২০১৪ সালে পিটলুম ৮ হাজার, চিত্তরঞ্জন ৫১ হাজার ও পাওয়ার লুম দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১০০। গত ১০ বছরে প্রায় ৬০% তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। শ্রমিক মজুরি ও মালামালের দাম বৃদ্ধির পরও ভারতসহ বিভিন্ন দেশের কাপড়ে বাজার সয়লাব হয়ে উঠেছে। এ সত্ত্বেও বাজার দখলমুক্ত রাখতে ক্রেতার চাহিদা ও মূল্যের প্রতি সুদৃষ্টি রাখা হয়েছে। আসন্ন ঈদ উপলক্ষে তার উৎপাদিত ও চাহিদাপূর্ণ বিশেষ জামদানি শাড়ির মধ্যে রয়েছে ফুল সিল্ক। যার পাইকারি মূল্যই প্রায় ৩০ হাজার টাকা। এছাড়াও ১৬০০ থেকে ২৫০০ টাকার মার্সচাইট কটন শাড়ির রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। ভারতীয় শাড়ির প্রবেশ বন্ধসহ এতিহ্যবাহী টাঙ্গাইলের এ তাঁত শিল্পকে বাঁচাতে সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।এসএস/এবিএস