বিজয়ের ৫৪ বছর হলো। এতদিন পরও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ ও ইতিহাস সংরক্ষণে মনোযোগ নেই সরকারের। নেই মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা ও স্বীকৃতি দেওয়ায় স্বচ্ছতা। বরং বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া বা কোনোমতে সময় কাটানোর কৌশল নিয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা। মুক্তিযুদ্ধ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি স্মরণে অবহেলা-অনাদরের গল্প নিয়ে সালাহউদ্দিন জসিমের দুই পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ থাকছে দ্বিতীয়টি।সিরাজুল ইসলাম (ছেরু) ছিলেন তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের দলনেতা। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন সম্মুখসমরে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আটক এই যোদ্ধাকে আরও ১৮-২০ জনের সামনেই গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা।
সতীর্থ তিন চাক্ষুষ সাক্ষী মুক্তিযোদ্ধা এখনো জীবিত। আঞ্চলিক কমান্ডারও বেঁচে আছেন। তারা জানেন তিনি যুদ্ধে শহীদ। কবরও সংরক্ষিত। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে সমাধিস্থলে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছে সরকার। বিজয় দিবসে (১৬ ডিসেম্বর) পুরো বরুড়া উপজেলার সর্বস্তরের মানুষ তার সমাধিসৌধে গিয়ে শ্রদ্ধাও জানান। অথচ জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) গেজেটে তার নাম নেই। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার স্বীকৃতিও নেই। পরিবার পায় না সম্মানি বা কোনো সুযোগ-সুবিধা।
মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সবাই সম্মান করেন তাকে। কিন্তু স্বীকৃতির বিষয়ে ‘কেউ কিছু জানেন না’। অনেক ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ ভাতা পেলেও কুমিল্লা জেলার বরুড়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের সিঙ্গুরিয়া গ্রামের এই শহীদ মুক্তিযোদ্ধাকে গত ৫৪ বছরেও স্বীকৃতি দেয়নি কোনো সরকার।
গত ১৩ ডিসেম্বর তার যুদ্ধস্থল বরুড়া উপজেলার পয়ালগাছা ইউনিয়নের বটতলী গিয়ে দেখা যায়, সেখানে একসঙ্গে পাঁচজনের সমাধি রয়েছে। তালিকার এক নম্বরেই শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলামের (ছেরু) নাম। পাশেই বিশাল আকৃতির স্মৃতিস্তম্ভ। ১৬ ডিসেম্বর উপলক্ষে ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের নির্দেশে পাঁচজন গ্রাম পুলিশ মিলে স্মৃতিস্তম্ভ পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করছেন।
মোহাম্মদ আলী নামে এক গ্রাম পুলিশের কাছে জানতে চাইলে এ স্মৃতিস্তম্ভের ইতিহাস সম্পর্কে জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশের মুক্তিযুদ্ধে সিরাজুল ইসলাম (ছেরু), কাজী আরেফসহ এখানে পাঁচজন শহীদ হন। তারা এখানে শায়িত। তাদের স্মরণে এই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ।’
বটতলীর স্থানীয় অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার বয়স তখন ১০ বছর। সেদিন যুদ্ধ থেমে যাওয়ার পর এখানে আসি। প্রথমে দেখছি, বটতলী বাজার হুমায়ুন পাটোয়ারীর যে দোকান এখন, তখন ক্ষেত ছিল। এটার মধ্যে একটা লাশ পড়ে আছে। সবাই মনে করছে পাঞ্জাবি হবে, কারণ অনেক লম্বা ছিল। মূলত ছিলেন সিরাজ ভাই (শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম ছেরু)।’
তিনি বলেন, ‘এই সিরাজ ভাই অনেক সম্পদশালী ছিলেন। অথচ তিনি শহীদ হলে তার সম্পদ লুট করেছে দুর্বৃত্তরা। তার মা মানবেতর জীবনযাপন করেছেন। উনি দেশের জন্য নিজের ছেলেকে দিয়েছেন, দেশ ওনাকে কী দিয়েছে?’
স্মৃতিস্তম্ভ, সমাধির নামফলক, স্থানীয়দের বক্তব্যের পাশাপাশি গুগলে অনুসন্ধান করেও পাওয়া যায়, ‘কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার পয়ালগাছা ইউনিয়নের বটতলী গ্রাম ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ রণাঙ্গন ছিল, যেখানে ১৮ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে এক ভয়াবহ সম্মুখযুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে পাঁচজন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। এরা হলেন- সিরাজুল ইসলাম (ছেরু), কাজী আরিফ হোসেন, মমতাজ উদ্দিন, সিরাজুল ইসলাম, জয়নাল আবেদীন। তাদের স্মরণে সেখানে ‘বটতলী শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’ নির্মিত হয়েছে।’
সেই যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তিনজনকে গ্রেফতার করে। তাদের গুলি করে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। সুবেদার মেজর সুফির বদান্যতায় তারা বেঁচে ফেরেন। তাদের একজন পয়ালগাছার সামছুল আরেফিন চৌধুরী। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘সিরাজ ভাইকে তো আমিসহ আটক আরও ১৮-২০ জনের সামনেই ব্রাশফায়ার করে ঝাঁঝরা করে দেয়। আমি নিজেও স্বীকৃতি পাইনি। কিন্তু সিরাজ ভাই যদি না পেয়ে থাকে, তাহলে এর চেয়ে বড় কষ্টের আর কী হতে পারে?’
আরও পড়ুনমুক্তিযুদ্ধের অগ্নিঝরা ৬ স্লোগানবেশিরভাগ মুক্তিযোদ্ধাই সশস্ত্র যোদ্ধা ননশুধু রণাঙ্গনের যোদ্ধারাই মুক্তিযোদ্ধা, বাকিরা সহযোগী‘মুক্তিযুদ্ধে নিজেকে যেভাবে উৎসর্গ করেছিলাম, সেভাবে সম্মান পাইনি’
এ বিষয়ে তৎকালীন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার (পরবর্তীসময়ে উপজেলা চেয়ারম্যান এবং এমপি হয়েছিলেন) অধ্যাপক নুরুল ইসলাম মিলন জাগো নিউজকে বলেন, ‘বটতলীর যুদ্ধ আমিও করেছি। স্বাধীন বাংলাদেশে তো আমারও স্বীকৃতি ছিল না। একজন সচিব আমাকে ডেকে বললেন, ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার লিস্টে আপনার নাম আছে। আপনি যুদ্ধ করছেন। সনদ নিচ্ছেন না কেন? তখন আমিসহ ৩৩ জনকে সনদ নিয়েছি। ওদের দেয় নাই কেন, জানি না। তবে শহীদ সিরাজুল ইসলামের মা আমার কাছে এসেছিলেন, আমি তাকে সহযোগিতা করেছি। তখন তো তার যে স্বীকৃতি নাই বা সুযোগ-সুবিধা পান না সেটি আমাকে বলেনি।’
শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার ভাগনে মিজানুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার নানা শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলামের স্বীকৃতির জন্য তার সহযোদ্ধা বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তারকে নিয়ে দফায় দফায় জামুকা, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এমনকি মন্ত্রীর কাছে গিয়েও সমাধান পাইনি। যেখানে যাই টাকা চায়। টাকা ছাড়া কেউ কাজ করে না। ’
বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা অনেক দৌড়াদৌড়ি করেছি। এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে যাইনি। কেউ আমাদের দাবিতে সাড়া দেয়নি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং তাদের চাহিদা পূরণ করতে না পারায় এই স্বীকৃতি হয়নি।’
বর্তমানে বরুড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের আহ্বায়ক সামছুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের উপজেলা শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ একটাই- বটতলীর শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ। সম্মুখযুদ্ধে ওখানে তারা শহীদ হয়েছেন, তাদের স্মরণে সেখানেই স্তম্ভ করা হয়েছে। তবে তাদের স্বীকৃতি হয়েছে কি হয়নি, জানি না।’
জাগো নিউজ অনুসন্ধানে পেয়েছে, শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলামের নাম শহীদ গেজেটে না উঠলেও উঠেছে মুক্তিযোদ্ধা গেজেটে। আছে লাল মুক্তিবার্তা ও বেসামরিক গেজেটেও। এমনকি উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সম্মানি বাস্তবায়ন কমিটি ৫ নভেম্বর ২০২২ তারিখে তার পরিবারের অনুকূলে ভাতা দিতে সুপারিশও করেছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে তার ‘বেসামরিক গেজেট নম্বর- ১২৪৯ জামুকার সুপারিশকৃত নয় জানিয়ে তার অনুকূলে এ মুহূর্তে সম্মানি ভাতা বরাদ্দ দেওয়ার সুযোগ নেই’ বলে ১২ জানুয়ারি ২০২৩ তারিখে উপজেলাকে জানায়।
এ বিষয়ে জানতে গত বছর মার্চে জামুকায় গেলে তৎকালীন মহাপরিচালক জহুরুল ইসলাম রাহেল জাগো নিউজকে বলেন, ‘এটি আবার উপজেলা থেকে সুপারিশ করে পাঠাতে বলেন। হয়ে যাবে।’ কিন্তু পরে উপজেলা থেকে সুপারিশ করে পাঠালেও হয়নি।
স্বীকৃতির বিষয়ে বরুড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান রনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি এখানে নতুন। আমার কাছে তথ্য নেই। জেনে জানাবো।’ এরপর আর তিনি জানাননি। ফোনও রিসিভ করেনি।
এ বিষয়ে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) বর্তমান মহাপরিচালক শাহিনা খাতুন জাগো নিউজকে বলেন, স্বীকৃতি পায়নি, পাবে। এর বাইরে এখন কিছু বলতে পারছি না।'
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সচিব ইসরাত চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘এসব বিষয়ে নানা অসঙ্গতি-অভিযোগ আছে। আমরা সব অভিযোগই খতিয়ে দেখছি। এটিও দেখবো।’
আরও পড়ুনযুদ্ধের সময় কিশোর থাকায় স্বীকৃতি মেলেনি আরেফিনের
এসইউজে/এএসএ/জেআইএম