গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২৭০ জন শিক্ষক তাদের বকেয়া বেতন-ভাতা পচ্ছেন না। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত তারা কোনো বকেয়া পাননি। কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ও দুর্নীতির কারণে এ বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষকরা। গত জুলাই মাস থেকে বেতন-ভাতা কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা প্রায় এক বছরেও কার্যকর হয়নি। ফলে চরম আর্থিক সঙ্কটে মানবেতর জীবনযাপন করছেন ওইসব শিক্ষক ও তাদের পরিবার।এদিকে, জেলার সদর, কোটালীপাড়া, কাশিয়ানী ও মুকসুদপুর উপজেলার অধিকাংশ শিক্ষক ইতোমধ্যে তাদের বকেয়া পেয়ে গেলেও সবচেয়ে ছোট উপজেলা ও প্রধানমন্ত্রীর নিজ উপজেলা টুঙ্গিপাড়ার শিক্ষকরা এখন পর্যন্ত বকেয়া বেতন-ভাতা না পাওয়ায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। ঈদের আগে বকেয়ার টাকা পেলে পরিবার নিয়ে তারা আনন্দে ঈদ করতে পারবেন বলে জানান।নাম না প্রকাশের শর্তে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করে বলেন, ফিক্সেশন করাসহ নানা অজুহাতে ইতোমধ্যে টুঙ্গিপাড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের লোকজন তাদের কাছ থেকে উৎকোচ নিয়েছেন। তারপরও এক বছর ধরে তারা তাদের বকেয়া বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। ফলে তারা অত্যন্ত দুরবস্থার মধ্যে আছেন। অফিসের দুর্নীতি, কর্তৃপক্ষের অদক্ষতা ও ভুল নির্দেশনা এবং জনবল সঙ্কটকে এর জন্য দায়ী করে তারা বলেন, টুঙ্গিপাড়া আয়তনের দিক থেকে ছোট্ট উপজেলা। জেলার অন্য উপজেলাগুলোতে শিক্ষকরা এরই মধ্যে বকেয়া বেতন-ভাতা পেয়ে গেলেও, টুঙ্গিপাড়ায় আমরা এখনও তা পাইনি। এটা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক ও অমানবিক। টুঙ্গিপাড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. মোহসিন রেজা বলেন, জেলার মধ্যে তিনিই সবার আগে শিক্ষকদের ফিক্সেশনের কাজ সম্পন্ন করেছেন। বিলম্বের জন্য অফিসের জনবল সঙ্কটকে দায়ী করেন তিনি। শিক্ষকদের জাতীয় পরিচয়পত্রে ভুল ও টাইম স্কেলের হিসাব-নিকাশ চূড়ান্ত না করে জাতীয় স্কেলের ফিক্সেশন করা সম্ভব হয়নি। ফলে কিছুটা বিলম্ব হলেও হতে পারে। তবে তার অফিসে ৩টি কালো ভাল্লুক আছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এর মধ্যে একটি কালো ভাল্লুক উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা ইউসুফ আলী খান এবং অপরটি হলেন হিসাবরক্ষক কাম কম্পিউটার অপারেটর প্রশান্ত কুমার বালা। এছাড়া আরো একটি কালো ভাল্লুক হলো শিক্ষক সমিতির কতিপয় নেতা। এরা শনিবার ছুটির দিনে তার অফিসে বসে তাকে না জানিয়েই ফিক্সেশন করিয়ে দেয়ার কথা বলে সাধারণ শিক্ষকদের কাছ থেকে টাকা তোলেন বলে জানান তিনি।অপরদিকে জেলা সহকরী শিক্ষক সমিতির নেতাদের সঙ্গে কথা বললে তারা বলেন, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোহসীন রেজা নিজেই হলেন সবচেয়ে বড় কালো ভাল্লুক। তিনি নিজেকে সবসময় ক্লিনম্যান হিসেবে দাবি করলেও তার মদদে অফিসে যাবতীয় দুর্নীতি ও অনিয়ম চলছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, মোহসীন রেজা নিয়মিত অফিস করেন না। বৃহস্পতিবার অফিসে স্বাক্ষর করে বেরিয়ে যান। কখনও রোববার বিকেলে আবার কখনও সোমবারে অফিসে আসেন। জনবল সঙ্কট নয় অফিসের অসহযোগিতার কারণে শিক্ষকরা সময় মত বকেয়া পাননি বলে সমিতি নেতাদের অভিযোগ। তারা বলেন, কেবল টুঙ্গিপাড়া নয় সারা দেশেই জনবল সঙ্কট রয়েছে। উৎকোচের টাকা তুলতে বিলম্ব এর অন্যতম কারণ।সম্প্রতি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো জাতীয়করণের ঘোষণার পর ওইসব স্কুলের শিক্ষকদের প্রত্যেকের কাছ থেকে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা ফিক্সেশন করার জন্য ওই অফিস থেকে আদায় করা হয়। শিক্ষকদের সাবক্লাস্টারের কোনো টাকা দেওয়া হয় না। এছাড়া স্কুলের সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত স্লিপ ফান্ডের টাকা থেকে একটি মোটা অঙ্কের টাকা কেটে রাখা হয়। আর এসব অপকর্ম ও দুর্নীতিতে উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে সহযোগিতা করছেন তারাই অফিসের হিসাবরক্ষক কাম কম্পিউটার অপারেটর প্রশন্ত কুমার বালা। টুঙ্গিপাড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, টুঙ্গিপাড়া উপজেলা শিক্ষা অফিসে বর্তমানে উচ্চমান সহকারীর ১টি, নিম্নমান সহকারীর ১টি ও এমএলএসএস-র ১টি পদ শূন্য। ২০১৪ সাল থেকে হিসাবরক্ষক ও কম্পিউটার অপারেটর পদে প্রশান্ত বালা কাজ করছেন। তবে তিনি কোটালীপাড়া উপজেলা থেকে প্রেষণে টুঙ্গিপাড়ায় আছেন।এসব দুর্নীতি ও অপকর্মের সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষকরা।এফএ/পিআর