বাংলাদেশে অনেক বড় ও ভালো কোম্পানি রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। তবে দেশের বড় ও ভালো কোম্পানির ১০ শতাংশও এখনো পুঁজিবাজারে আসেনি বরে জানান তিনি।
তিনি বলেন, গত দেড় বছরে পুঁজিবাজারের আইনি সংস্কার, নজরদারি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে, যার ইতিবাচক প্রভাব ধীরে ধীরে বাজারে দেখা যাবে। একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে হলে বড় ও মানসম্পন্ন কোম্পানিকে বাজারে আনার বিকল্প নেই।
রোববার (৮ মার্চ) পুঁজিবাজার বিটের সাংবাদিকদের সংগঠন ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরাম (সিএমজেএফ) আয়োজিত ‘নতুন সরকারের জন্য শেয়ারবাজারে চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিএসইসির মূলত নীতি প্রণয়ন, আইন প্রণয়ন, মনিটরিং, সারভেইলেন্স, এনফোর্সমেন্ট ও আর্থিক সচেতনতা বাড়ানোর কাজ করে। অতীতে অনেক সময় সূচককেন্দ্রিক আলোচনায় বাজারকে বিচার করা হলেও প্রকৃতপক্ষে বাজারের অবকাঠামো উন্নয়ন ও মৌলভিত্তিক শক্তিশালী করাই নিয়ন্ত্রকের মূল দায়িত্ব।
খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বলেন, গত ১৮ মাসে পুঁজিবাজারে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আইনি সংস্কার করা হয়েছে। এই সময়ে তিনটি নতুন বিধিমালা ও তিনটি প্রবিধানমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। একটি বিধিমালা ও একটি প্রবিধান সংশোধন করা হয়েছে। পাশাপাশি দুটি আইন ও অধ্যাদেশের খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে এবং আরও তিনটি বিধিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে।
তিনি বলেন, ১৯৯৩ সালের পর থেকে এত অল্প সময়ে এতগুলো আইনি সংস্কার আর কখনো হয়নি।
তিনি উল্লেখ করেন, ২৬ বছর পর ১৯৯৯ সালের মার্জিন বিধিমালা নতুন করে প্রণয়ন করা হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজারে নেতিবাচক ইকুইটির যে সমস্যা ছিল তা নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মিউচুয়াল ফান্ড ও আইপিও ব্যবস্থায় পরিবর্তনবিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, ২০১৩ সালের মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালাও নতুনভাবে সাজানো হয়েছে। আগে মিউচুয়াল ফান্ড ব্যবস্থাপনায় সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানিগুলোর প্রভাব বেশি ছিল। এখন ট্রাস্টি, ব্যবস্থাপনা কোম্পানি ও অন্যান্য অংশীজনের মধ্যে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
আইপিও ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আগে দর নির্ধারণ অনেকটা আলোচনা বা সমঝোতার ভিত্তিতে হতো। নতুন ব্যবস্থায় বাজারভিত্তিক পদ্ধতিতে দাম নির্ধারণ হবে এবং স্টক এক্সচেঞ্জগুলো এতে বড় ভূমিকা রাখবে।
তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থাতিনি জানান, গত ১৮ মাসে বিএসইসি ১১৪টি অনুসন্ধান ও তদন্ত এবং ৬৪টি পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এছাড়া বিভিন্ন অনিয়মের কারণে ১ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা এরই মধ্যে আদায় হয়েছে।
তিনি বলেন, অনেকেই আদালতে এসব জরিমানার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তবে আইনি প্রক্রিয়া শেষে এসব অর্থ রাষ্ট্রের কোষাগারে ফেরত আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
পাশাপাশি ৩০০টির বেশি এনফোর্সমেন্ট কেস নিষ্পত্তি করা হয়েছে এবং অর্থপাচার সংশ্লিষ্ট ১৬টি মামলা দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
৮৪ মিটিংয়ে ১৬০০ এজেন্ডা নিষ্পত্তিখন্দকার রাশেদ মাকসুদ বলেন, কমিশনের নিয়মিত সভা প্রতি মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হয়। হিসাব অনুযায়ী দেড় বছরে ৬০টির মতো সভা হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে ৮৪টি সভা হয়েছে। এসব সভায় মোট ১ হাজার ৫৯৭টি এজেন্ডা উত্থাপিত হয় এবং এর প্রায় সবগুলোই নিষ্পত্তি করা হয়েছে। মাত্র তিনটি এজেন্ডা স্থগিত রয়েছে।
তিনি বলেন, অনেকে মনে করেন পুঁজিবাজারে কাজের গতি কম। কিন্তু বাস্তবে গত ১৮ মাসে ৮৪টি সভায় প্রায় ১ হাজার ৬০০ এজেন্ডা নিষ্পত্তি হয়েছে, যা কমিশনের কর্মতৎপরতারই প্রমাণ।
বিএসইসির চেয়ারম্যান জানান, আগের ১৮ মাসে কমিশনের সভা হয়েছিল ৬৪টি এবং এজেন্ডা ছিল প্রায় ৯০০টি। সে তুলনায় বর্তমান কমিশনের সময়ে সভা ও এজেন্ডা উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ব্রোকারেজে স্বচ্ছতা আনতে নতুন সফটওয়্যারচেয়ারম্যান বলেন, আগে অনেক ক্ষেত্রে ব্রোকারেজ হাউস থেকে বিনিয়োগকারীদের কাছে যে হিসাব বিবরণী পাঠানো হতো তা সম্পাদনা করা সম্ভব ছিল। এখন সম্পাদনাযোগ্য নয় এমন ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার চালু করা হয়েছে।
এর ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের প্রায় ৩৫০টির বেশি ব্রোকারেজ হাউস এখন এই সফটওয়্যার ব্যবহার করছে এবং বিনিয়োগকারীরা সরাসরি সঠিক তথ্য পাচ্ছেন।
বন্ড বাজার উন্নয়নে উদ্যোগবন্ড বাজার শক্তিশালী করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ চলছে বলে জানান তিনি। বড় ঋণগ্রহীতাদের ব্যাংক ঋণের পরিবর্তে বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
গত ১৮ মাসে ১৮টি কোম্পানিকে ৯ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা পুঁজি উত্তোলনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বড় কোম্পানিকে বাজারে আনতে নতুন আইনবিএসইসির চেয়ারম্যান বলেন, দেশের অনেক বড় কোম্পানি এখনো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয়। এসব কোম্পানিকে বাজারে আনতে একটি নতুন আইনের খসড়া প্রস্তুত করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, আইন, নীতি ও এনফোর্সমেন্টের মাধ্যমে আমরা আস্থার জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করছি। সামনে ভালো কোম্পানি বাজারে আনতে পারলে পুঁজিবাজার আরও শক্তিশালী হবে।
সিএফএনএম সভাপতি মনির হোসেনের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবীব রাসেলের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. মনিরুজ্জামান। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন- বিএসইসি কমিশনার মো. সাইফুদ্দিন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) চেয়ারম্যান একেএম হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের (বিএপিএলসি) সভাপতি রিয়াদ মাহমুদ, বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সাধারণ সম্পাদক সুমিত পোদ্দার প্রমুখ।
এমএএস/ইএ