ঠাকুরগাঁওয়ে একটা ‘ড্রয়িং স্টুডিও’ গড়ার স্বপ্ন রয়েছে। যেখানে ছবি আঁকার সরঞ্জাম থাকবে। সবাই আসবে, নিজের খুশিমত ছবি আঁকবে। সেখানে গ্যালারি থাকবে, ছবির প্রদর্শনীও হবে। কিছুদিন আগে আমার বাড়িতে একটি ‘ড্রয়িং স্টুডিও’ করেছি। ছবি আঁকার সকল সরঞ্জাম রয়েছে সেখানে। ভবিষ্যতে শহরে বড় একটি ‘ড্রয়িং স্টুডিও’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছি। প্রতিদিনই স্বপ্নটা ধীরে ধীরে বুনছি। বুনন শেষ হলে সত্যিই গড়ে ফেলব আমার কল্পনার স্টুডিওটা।রোববার দুপুরে জাগো নিউজকে এভাবেই তার স্বপ্নের বর্ণনা দিচ্ছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ে রং তুলির জাদুকর চিত্রশিল্পী কাদিমুল ইসলাম জাদু।পরিচিত কেউ ঢাকায় যাবে শুনলে বায়না ধরতেন তিনি। অনুরোধ করতেন যেন ফেরার সময় কিছু পেন্সিল, রং, কাগজ ইত্যাদি নিয়ে আসেন তার জন্য। তার কথা কেউ ফেলতো না কখনো। কারণ তারা এরই মধ্যে জাদুর অসাধারণ শিল্পী প্রতিভা দেখেছেন। তার আঁকা ছবি দেখে মুগ্ধ হয়েছেন সবাই। ঠাকুরগাঁও শহরে যারা আঁকতেন তাদের সঙ্গে নিজ তাগিদেই সখ্য গড়ে তুলতেন তিনি। তার আঁকা ছবি, চিন্তার ভিন্নমাত্রা রীতিমত মুগ্ধ করে দিত সবাইকে।ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল চারুকলায় পড়ার। ছবি এঁকে নাম করবে সারাদেশে। তার সে স্বপ্ন বৃথা যায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে মেধা তালিকায় থাকতে পারেননি তিনি। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলায় পরীক্ষা দেন। বাবার দেওয়া দেশের বরণ্য চিত্রশিল্পী শিশির ভট্টাচার্যের একটি চিঠি নিয়ে অবশেষে ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায়। নিরন্তর অধ্যবসায়, চর্চা, এক মনে, এক ধ্যানে ছবি আঁকা, রঙে-তুলিতে-পেন্সিলে-কলমে বুঁদ হয়ে থাকা সেই জাদু সত্যিই একদিন সুযোগ পেয়ে গেলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় পড়ার। সেটা অবশ্য ১৯৮৫ সালের কথা। শুধু কি পড়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি? এখন তিনি পড়াচ্ছেনও। ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক তিনি। স্কুল জীবনের স্মৃতিচারণ করে চিত্রশিল্পী কাদিমুল ইসলাম জাদু বলেন, ইউনিসেফের বিনামূল্যে দেওয়া রঙগুলো দিয়ে ছবি আঁকতাম। সে সময় ‘পূর্বাণী’ ও ইত্তেফাক পত্রিকা জনপ্রিয় ছিল। নামকরা শিল্পীরা সেখানে আঁকতেন। আমি ঠাকুরগাঁওয়ে পত্রিকাগুলো সংগ্রহ করতাম। এক ধরনের ঘোর তৈরি হত আঁকা আঁকিগুলো দেখে। নিয়ম করে সেগুলো কেটে রাখতাম। রাত জেগে পত্রিকার শিল্পীদের ছবিগুলো আঁকার চেষ্টা করতাম। কিন্তু ওদের মতো করে হত না।আমার স্কুলের এক বন্ধু খুবই ভালো ছবি আঁকতো। প্রায়ই তার কাছে গিয়ে ছবি আঁকার নিয়ম জানতে চাইতাম। এসএসসি পাস করার পর চারুকলায় ভর্তি হওয়ার পর ক্লাসে দেখি আমি এ যাবত যত ছবি এঁকেছি সবই ভুল। এখানে ছবি আঁকার ভিন্নতা অন্য। অনেক সহপাঠী ছবি আঁকার ভয়ে চারুকলা ছেড়ে চলেও যায়। মাঝে মধ্যে হতাশ হয়ে যেতাম ছবি আঁকা নিয়ে। সব সময় মনে করতাম আমাকে পারতেই হবে। আস্তে আস্তে ছবি আঁকার দিনগুলো সহজ হয়ে আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন এরশাদবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। কয়েক বছর সেশনজটে পড়তে হয়। হঠাৎ করে ঠাকুরগাঁওয়ে চলে আসতাম রাত জেগে ছবি আঁকতাম। ১৯৮৬ সালের দিকে ঠাকুরগাঁও স্টার ক্লাবের একটা নাটক প্রদর্শন হবে। মনে হলো নাটকের জন্য একটা পোস্টার তৈরি করবো। এক রাতে পোস্টারও ডিজাইন করেছি। আমার সেদিনের পোস্টার দেখে নাটকের অনেক দর্শনার্থী হতবাক হয়ে আমাকে বাহবা দিয়েছিল। সেটাই ছিল আমার কাজের গতি আরো বাড়িয়ে দেওয়ার একটা অনুপ্রেরণা। এছাড়াও ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের শত বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে আমার আল্পনার কাজ দেখে সবাই মুগ্ধ হয়ে আমাকে বাহবা দিয়েছে। এতে আমি আমার কাজ চালিয়ে যাওয়ার আরো বেশি অনুপ্রেরণা পেয়েছি। চিত্রশিল্পী কাদিমুল ইসলাম জাদু আরো বলেন, সাংবাদিকতা, ফটোগ্রাফার, রংতুলির শিল্পী সবাই একই পরিবারের। সকলকে মনের মাধুরী মিশিয়ে কাজ করতে হয়। আমি আমার জীবনে অনেক সময় নষ্ট করেছি। কিন্তু আমার স্বপ্ন আমি নিশ্চয় সত্যি করতে পারবো। সকলের সহযোগিতা পেলে ঠাকুরগাঁওয়ে আমি একটি ড্রয়িং স্টুডিও অবশ্যই করবো।এমএএস/এবিএস/এমএফ