তসলিমা আক্তার শিমু। জন্মগতভাবে তার দুটি পা বাঁকা। ছোট থেকে হামাগুড়ি দিয়ে চলাফেরা করলেও এখন হুইল চেয়ার ব্যবহার করেন। নওগাঁ সরকারি বিএমসি মহিলা কলেজে একাদশ শ্রেণিতে মানবিক বিভাগে পড়াশুনা করছেন। নওগাঁ সদর উপজেলার হাপানিয়া ইউনিয়নের দশপাইকা গ্রামের তসলিম উদ্দিন মন্ডল ও রুবী বেগমের তিন সন্তানের মধ্যে বড় তসলিমা আক্তার শিমু। ছোট ভাই ইউসুফ আলী এবার অর্নাস প্রথম বর্ষ এবং ছোট বোন মুসলিমা আক্তার জেএসসি পরীক্ষার্থী। বাবা ওয়েল্ডিং মিস্ত্রি এবং মা গৃহিণী। পড়াশোনার প্রতি শিমুর আগ্রহ থাকায় বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দূরে দশপাইকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেয়া হয়। কখনো বাবা, কখনো মা কোলে করে স্কুলে আসা-যাওয়া করতো। আবার কখনো নিজে হামাগুড়ি দিয়ে স্কুলে যেত। পড়াশুনার ক্ষেত্রে শিক্ষক ও সহপাঠীরা সহযোগিতা করতো। এভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গণ্ডি শেষ হয়।উল্লাসপুর আলিম কেইউ মাদরাসায় ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হলেও যাতায়াতের সমস্যা ও অর্থের অভাবে পড়াশোনা করা সম্ভব হয়নি শিমুর। দীর্ঘ পাঁচ বছর একটি হুইল চেয়ার কিনে আবারো ২০১১ সালে ওই মাদরাসায় ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়। জেএসসি পরীক্ষার ফলও ভালো করেছে। এবার ২০১৬ সালে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ৪.৩০ পেয়ে নওগাঁ সরকারি বিএমসি মহিলা কলেজে ভর্তি হয়েছে। বাড়ি থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে মেইন রোড হয়ে হুইল চেয়ার নিজে চালিয়ে কয়েক দিন কলেজে নিয়মিত ক্লাস করলেও এখন হুইল চেয়ারের সমস্যার কারণে কলেজে আসা যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। যে কোনো সময় ভেঙে যেতে পারে হুইল চেয়ারটি।বাবা তসলিম উদ্দিন বলেন, জন্মের পর থেকেই শিমুর দুই পা বিকলাঙ্গ। পায়ে শক্তি পেত না। অনেক চিকিৎসা করানোর পরও কোনো কাজ হয়নি। কষ্ট করে অন্যের সাহায্যে চলাফেরা করে। মেয়ে প্রতিবন্ধী হওয়ার পরও লেখাপড়ার প্রতি তার আগ্রহ থাকায় পড়াশুনা করছে।শিমুর মা রুবি বেগম বলেন, মেয়েটিকে কোলে করে স্কুলে প্রতিদিন আনা-নেওয়া করতাম। এভাবে প্রাথমিক ও জেএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। শুধু মাঝের পাঁচটি বছর আর স্কুলে যেতে পারেনি অর্থের অভাবে। তিন সন্তানের লেখাপড়ার খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাই ধারদেনা করে হলেও তাদের পড়াশুনা চালিয়ে যাচ্ছি। সমাজের বিত্তবানদের কাছে সন্তানদের জন্য সহযোগিতা কামনা করছি।তাসলিমা আক্তার শিমু বলে, প্রতিবন্ধী বলে অনেকে অনেক কথা বলে। তখন মুখ বন্ধ করে তাদের কথা শুনতে হয়। মাঝে মাঝে খারাপ লাগে। যত কষ্টই হোক আমি পড়াশোনা করে আর দশটা মানুষের মতো চাকরি করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাই। প্রতিবন্ধী হয়েও সমাজের মুখ উজ্জ্বল করতে চাই। শিমু আরো বলেন, প্রতিবন্ধী দেখলে কেউ অবহেলা করবেন না। প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা না। অনুকরণ নয়, চাই একটুখানি সহযোগিতা। কলেজের অধ্যক্ষ মাহফিজুর রহমান পড়াশুনার জন্য শিমুকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন।এসএস/এমএস