দেশজুড়ে

শেষ রক্ষা হলো না দুবলহাটি রাজবাড়ির

রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নওগাঁর প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দুবলহাটি রাজবাড়িটির শেষ রক্ষা আর হলো না। কয়েক দিনের টানা বর্ষণে বাড়ির এক অংশের অনেকটা ভেঙে গেছে। প্রাসাদের ওই অংশে বসবাসকারী আলম জানান, যথাযথ নজরদারি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্রাচীন এই রাজবাড়িটি শেষ পরিণতির দিকে। বিশাল এই প্রাসাদের বিভিন্ন স্থাপনা অমানবিকভাবে একটি একটি করে খুলে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। যেন দেখার কেউই ছিল না। এখন পর্যটকরা দেখছেন আর দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন।সূত্রে জানা গেছে, রাজা হরনাথ রায় চৌধুরী ও তার ছেলে রাজা কৃঙ্করীনাথ রায় চৌধুরীর সময় ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয় রাজ স্টেটের। তখন তাদের বার্ষিক আয় ছিল সাড়ে ৪ লাখ টাকা। ৫ একর এলাকা জুড়ে বিশাল প্রাসাদ। আর প্রসাদের বাইরে ছিল দীঘি, মন্দির, স্কুল, দাতব্য চিকিৎসালয়, ১৬ চাকার রথসহ বিভিন্ন স্থাপনা। রাজ প্রাসাদের সামনে রোমান স্টাইলের বড় বড় পিলারগুলো রাজাদের রুচির পরিচয় বহন করে। ১৮৬৪ সালে রাজ পরিবারের উদ্যোগে একটি স্কুল স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে স্কুলটি নামকরণ হয় রাজা হরনাথ উচ্চ বিদ্যালয়। স্কুলটিতে ইংরেজি পড়ানো হতো। প্রধান শিক্ষক ছিলেন একজন ইংরেজ। রাজা হরনাথ রায় চৌধুরীর জনহিতকর ও সামাজিক কাজের অবদান আছে অনেক। প্রতি বছর স্টেটের খরচে ৫ জন করে গরীব ও মেধাবী ছাত্রদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা ছিল। সংক্ষিপ্ত ইতিহাস থেকে আরো জানা যায়, রঘুনাথ নামে এক ব্যক্তি লবণ ও গুড়ের ব্যবসা করতেন। তিনি দীঘলি বিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত খয়রা নদী দিয়ে নৌকা যোগে দুবলহাটিতে ব্যবসার জন্য আসেন (বর্তমানে নদীর অস্তিত্ব আর নেই)। তিনি প্রায় প্রতি রাতে স্বপ্ন দেখতেন তাকে কে যেন বলছে `তুই যেখানে নৌকা বেঁধেছিস সেখানে জলের নিচে রাজ রাজেশ্বরী দেবির প্রতিমা আছে। সেখান থেকে তুলে স্থাপন কর।` রঘুনাথ একদিন ভোরে জলে নেমে দেখলেন সত্যিই সেখানে রাজ রাজেশ্বরীর প্রতিমা আছে। তিনি প্রতিমাটি পানি থেকে তুলে একটি মাটির বেদি তৈরি করে প্রতিষ্ঠা করলেন। এরপর তার ব্যবসায় ব্যাপক উন্নতি হতে থাকে। রঘুনাথের বিত্ত-বৈভবের খবর পৌঁছে যায় মোগল দরবারে। মোগল দরবারের নির্দেশে তাকে ডেকে পাঠানো হয় মুর্শিদাবাদ নবাবের দরবারে। নবাব তাকে রাজস্ব প্রদানের নির্দেশ জারি করেন। তিনি নবাবকে জানান, তিনি যে এলাকায় থাকেন সেখানে শুধু জল আর জল। কোন ফসল হয় না। তবে বড় বড় কৈ মাছ পাওয়া যায়। বিষয়টি বুঝতে পেরে নবাব তাকে প্রতি বছর রাজস্ব হিসেবে ২২ কাহন কৈ মাছ দেয়ার নির্দেশ দেন। রাজা কৃঙ্করীনাথ রায় চৌধুরীর নাতি ও কুমার অমরেন্দ্র নাথ রায় চৌধুরীর ছেলে রবীন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী (৭২) জানান, দুবলহাটির জমিদারি ছিল সিলেট, দিনাজপুর, পাবনা, বগুড়া, রংপুর ও ভারতের কিছু অংশে। একটি গোল্ডেন সিলভার ও একটি আইভরি কোস্টের তৈরি সিংহাসন ছিল। বৃটিশরা সিংহাসন দুটি নিয়ে যায়। হরনাথ রায় চৌধুরী প্রথম রাজা খেতাব পেয়েছিলেন। তিনি আরো বলেন, ইতোমধ্যে দুর্বৃত্তরা প্রাসাদের লোহার বিম, ইট, দরজা জানালা, কড়ি-বর্গা খুলে নিয়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময় পত্র পত্রিকায় বহু সংবাদ প্রকাশও হয়েছে। তবু প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় অবশেষে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেল ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি।বিষয়টি নিয়ে একুশে পরিষদ নওগাঁর সাধারণ সম্পদক এমএম রাসেলের সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, দুবলহাটি রাজবাড়িটি ছিল আমাদের অহংকার। সে কারণে এটি ভেঙে পড়ার সংবাদে আমরা চরমভাবে ব্যথিত হয়েছি। ঐতিহ্যে নওগাঁর সম্পাদক কাজী রাহাত জানান, দুবলহাটি রাজবাড়িটি ছিল নওগাঁবাসীর ঐতিহ্যের মধ্যে অন্যতম। এটি ভেঙে পড়ায় আমরা একটি সম্পদ হারালাম যা আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস বহন করে।আব্বাস আলী/এসএস/এমএস