কৃষিকাজ বদলে দিয়েছে আকলিমার জীবন। মাস্টার্স পর্যন্ত লখাপড়া করেও চাকরি পাননি তিনি। শেষমেশ শুরু করেন কৃষিকাজ। সম্প্রতি পেয়েছেন বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরষ্কার ১৪২০। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন ইউনিয়ন পরিষদের মহিলা সংরক্ষিত আসনের পদেও। সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল দেয়াড়া ইউনিয়নের পাকুড়িয়া গ্রামের আকলিমা এখন পরিচিত মুখ। কৃষিকাজে একজন মডেল নারী হিসেবে পরিচিত সাবার কাছে।বাড়ির আঙ্গিনায় বিষমুক্ত সবজি চাষ, হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগল পালন, রোগ বালাই দমন, জৈব সার প্রস্তুত এসব বিষয়ে এলাকার নারীদের প্রশিক্ষণ দেন এ নারী। তার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এলাকার অনেক নারী এখন স্বাবলম্বী। বর্তমানে উপজেলার একজন কৃষক প্রশিক্ষক হিসেব কাজ করছেন। আকলিমার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট কুড়েঘরে বসতি আকলিমা খাতুন ও তার ৮০ বছর বয়সী মা সুফিয়া বেগমের। বাকি তিন বোন স্বামীর সংসারে। ২০০০ সালে ভয়াবহ বন্যায় ভেসে যায় বসতঘর। বাবা শামসুদ্দীন সরদার অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করতেন। বৃদ্ধ বাবার আর আয়ের উৎস ছিল না। বাবার কষ্ট দেখে তৎকালীন সময়ে খুলনা বিএল কলেজে অধ্যায়রত আকলিমা বাড়িতে ফিরে আসেন। একটি চাকরি খুঁজেও পাননি তখন। অবশেষে সিদ্ধান্ত নিয়ে বন্যার দুর্যোগ শেষে কৃষি দফতরের পরামর্শ নিয়ে বাবার ৫ বিঘা জমিতে কৃষিকাজের পাশাপাশি অন্যের জমিতে কৃষিকাজ শুরু করেন। পাশাপাশি লেখাপড়া চালিয়ে যান। বাড়ির আঙ্গিনায় শুরু করেন সবজি চাষ। গড়ে তোলেন কৃষক সংগঠন। এলাকার নারীদের প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন। নারীরাও তার পরামর্শে কৃষিকাজে উদ্বুদ্ধ হন। পরে ২০০৭ সালে তার বাবার মৃত্যু হয়। আকলিমার কাছে কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ নিতে আসা আসমা খাতুন বলেন, আকলিমার কাছ থেকে পরামর্শ দিয়ে পুইশাক, কুমড়া, সিম, ঝাল, সবজি লাগায়ছি। আমরা বিষমুক্ত সবজির চাষ করছি। তাতে আমার ভালো চলে, আবার বিক্রয়ও করি। অভাব অভিযোগ না থাকায় সংসারটাও ভালোভাবে চলছে। অপর একজন কলেজ শিক্ষার্থী বলেন, এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেক স্টুডেন্ট স্বাবলম্বী হয়েছে। একই সঙ্গে আমাদের বসত বাড়ির আঙ্গিনায় যেখানে খালি জায়গা আছে সেখানে শাক-সবজির চাষ করছি এবং ভালো ফলন পাচ্ছি। এলাকার সিরাজুল ইসলাম জানান, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইউনিয়ন পরিষদের মহিলা মেম্বার নির্বাচিত হয়েছেন আকলিমা। এলাকার অভাবী মানুষের পাশে এসে দাঁড়ান তিনি। এলাকার লোকজন তাকে খুব ভালোবাসে। আমরা চাই তিনি আরও এগিয়ে যাক।আকলিমার মা সুফিয়া বেগম বলেন, বাড়ি বসে পড়াশুনা করতো আর জমির ক্ষেত দেখাশুনা করতো। বাপ মারা গেছে ১০ বছর আগে। সেই ধরে সংসার চালায় বিয়েটাও করলো না। উপজেলা কৃষি অফিসার মো. মহসিন আলী বলেন, আকলিমা কলারোয়া উপজেলার দেয়াড়া ইউনিয়নের একজন অগ্রগামী কৃষক। কৃষি দফতর বিভিন্ন সময় তাকে পরামর্শ দিয়ে একজন আদর্শ কৃষক হিসেবে গড়ে তুলেছে। ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরষ্কার প্রদানের মাধ্যমে সেটির স্বকৃতি পেয়েছেন তিনি। কৃষিকাজের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কাজেও সম্পৃক্ত তিনি। তিনি কলারোয়া উপজেলার একজন গর্বিত কৃষক। এসব বিষয়ে আকলিমা বলেন, কাজে কোনো লজ্জা নেই, নারীরাও কৃষিকাজে এগিয়ে যাক, স্বাবলম্বী হোক। তাহলেই দেশ এগিয়ে যাবে। এই আশায় আমি সংগ্রাম করে চলেছি। এফএ/পিআর