কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে চলছে অভিনব কায়দায় চিকিৎসা। বিষহরা গান, মনসার জারি ও পদ্মপুরাণ পালার মাধ্যমে প্যারালাইসিস রোগীকে ঝাড়ফুঁক দিয়ে চলছে সুস্থ করার প্রাণান্তকর চেষ্টা। চরের লোকজনের অজ্ঞতা ও সরলতার সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির মানুষ গ্রাম্য কবিরাজের পরিচয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে কষ্টার্জিত অর্থ।সরেজমিনে কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের চর দাগারকুটি এলাকায় গিয়ে দেখা যায় অভিনব দৃশ্য। মাঝ বয়সী এক রোগীকে চৌকির ওপর রেখে বিষহরার দলটি গোল হয়ে ঘুরছে। পুরোভাগে রয়েছেন প্রধান কবিরাজ। তার পেছনে ছয় সাগরেদ। সাগরেদদের পেছনে শেষ সারিতে রয়েছে গ্রামের কয়েকজন কিশোরী। তারা নৃত্য-গীতের মাধ্যমে পালা গাইতে গাইতে চারপাশ ঘুরছে আর রোগীর শরীরে গাছের পাতা ছুঁইছেন। এ এক আজব কিসিমের চিকিৎসা পদ্ধতি। কমপক্ষে সাতদিন থেকে সর্বোচ্চ ২১ দিন পর্যন্ত এই চিকিৎসার পর কলাগাছের ভেলায় ভাসিয়ে দিয়ে আজীবন বিদায় দেয়া হয় রোগটিকে। গ্রামের কিশোরীদের মধ্যে স্বপ্না (১১) জানায়, নানির সুস্থতার জন্য ছোট বোন রত্নাসহ (৮) দুই বান্ধবীকে নিয়ে বিষহরা নৃত্যে অংশ নিয়েছি। আমি চাই নানি ভালো হয়ে যাক।স্বপ্নার বাবা মোহাব্বত আলী (৩৮) জানান, আমার শাশুড়ি মজিতা (৫৬) গত ৯ মাস ধরে বাসলি (প্যারালাইসিস) রোগে আক্রান্ত। তার একটি হাত ও পা অবশ হয়ে গেছে। চলাফেরা করতে পারে না। তাকে সুস্থ করার জন্য কুড়িগ্রাম ও রংপুর হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়। এজন্য ব্যয় হয় লক্ষাধিক টাকা। কিন্তু অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়ি। পরে গ্রামবাসীর পরামর্শে উলিপুরের ধড়ণীবাড়ী গ্রামের কবিরাজ শাহ আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তার দলের সঙ্গে ৮ হাজার টাকার চুক্তি হয়েছে। এছাড়া তিনবেলা তাদের খাওয়াতে হবে। তারা সাতদিন ধরে পদ্মপুরাণ পালার মাধ্যমে ঝাড়বেন। এতে সুস্থ হলে ভালো। না হলে দ্বিতীয় দফা বিষহরা জারির জন্য তাকে আরো ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা দিতে হবে। এই টাকা দিতেও রাচি মোহাব্বত আলী। কিন্তু শর্ত একটাই শাশুড়িকে সুস্থ করতে হবে।মজিতা বেওয়া ভাঙা ভাঙা স্বরে বলেন, ‘নদী ভাঙনের চিন্তায় চিন্তায় শরীরটা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গেল। আমরা জামাই শাশুড়ি পার্শ্ববর্তী চরে ছিলাম। বসতভিটা ভাঙনের ফলে একত্রে দাগারকুটি চলে আসি। এখানে ১৫ হাজার টাকায় এক বিঘা জমি বন্ধক নিয়ে মেয়ে-জামাইসহ এক সঙ্গে আছি। অসুস্থ হওয়ার পর বাইরে চিকিৎসা নেই। ভালো না হওয়াতে কবিরাজি চিকিৎসা নিচ্ছি।’সাংবাদিক আসার খবর পেয়ে কবিরাজ শাহ আলম চা খাওয়ার কথা বলে সটকে পড়েন। মুঠোফোনে এই প্রতিনিধিকে জানান, এলোপ্যাথিক চিকিৎসায় ব্যর্থ হয়ে লোকজন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে। এ পর্যন্ত আমি ৪০ থেকে ৪২ জন রোগীকে সুস্থ করেছি। এ মাসেই তিনজন রোগীকে ভালো করেছেন বলেও দাবি করেন।উলিপুর উপজেলার ধরণীবাড়ী ইউনিয়নের লাঠির কামার গ্রামের খলিলুর রহমান ব্যাপারীর ছেলে শাহ আলম (৩৩) যুবক বয়স থেকেই এই কবিরাজি চিকিৎসা দিচ্ছেন। তার এই চিকিৎসা পদ্ধতির নাম বেহুলা ঝাড়নি। এই প্রক্রিয়া চলে সর্বনিম্ন সাতদিন থেকে সর্বোচ্চ ২১ দিন পর্যন্ত। বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা এবং রাত ৯টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলে এই অভিনব চিকিৎসা। এর সঙ্গে চলে লতাপাতা, গাছ-গাছড়া দিয়ে বানানো ওষুধ দিয়ে মালিশ। এজন্য ছয়জনের একটি দল থাকে, যাদের দিনমজুরি হিসেবে আড়াইশ টাকা প্রদান করতে হয়।বিষহরা দলের সদস্য উপজেলার পান্ডুল এলাকার মাঈদুল বলেন, ‘হামরা কামলা চুক্তিতে কাম করি। দিন গেইলে কবিরাজ হামাকগুলাক ২০০ টেহা করি দেয়। মুই ৫ বছর যাবত এই দলোত কাম করং।’ এই দলের পুরনো সদস্য কার্তিক, আব্দুল আজিজ নেন আড়াইশ টাকা করে।হাতিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল হোসেন জানান, এই অপচিকিৎসার জন্য দায়ী আমাদের অজ্ঞতা, আর্থিক দৈন্যতা ও যোগাযোগ সমস্যা। কুড়িগ্রামের ওপর দিয়ে প্রায় ছোট-বড় ১৬টি নদ-নদী প্রবাহিত। এসব নদীতে চর রয়েছে প্রায় সাড়ে ৪ শতাধিক। এসব চরে প্রায় ৩ লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। এই বিশাল সংখ্যক মানুষের জন্য নেই চিকিৎসার সুব্যবস্থা। ফলে চরের মানুষের সরলতাকে পুঁজি করে একশ্রেণির কবিরাজ চিকিৎসার নামে প্রতারণা করে হাতিয়ে নিচ্ছে গরিব মানুষের সামান্য সঞ্চয়।এ ব্যাপারে কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. আমিনুল ইসলাম জানান, এই চিকিৎসার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এটি আসলে সম্পূর্ণ একটি কুসংস্কার। এজাতীয় ঝাড়ফুঁক কিংবা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে যেসব প্যারালাইসিস বা জন্ডিস রোগীর চিকিৎসা করানো হয়, তা সঠিক নয়। এগুলোর মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের মানুষ প্রতারিত হচ্ছে। এজন্য আমরা স্বাস্থ্য শিক্ষা কার্যক্রম জোরদারের মাধমে আমাদের স্বাস্থ্যকর্মী ও স্থানীয় এনজিওদের সমন্বয়ে এই অঞ্চলের মানুষের কুসংস্কার দূর করার জন্য সচেতনতামূলক কাজ করে যাচ্ছি।এসএস/আরআইপি