দেশজুড়ে

পালপাড়াগুলোতে দম ফেলার ফুরসত নেই

ঘনিয়ে এসেছে বাঙালি হিন্দু সমাজের প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। এ উৎসব উপলক্ষে ইতোমধ্যেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন সিরাজগঞ্জে প্রতিমা শিল্পী, পূজা উদযাপন কমিটি ও প্যান্ডেল-মঞ্চের কারিগররা। মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে পূজোর আগের আনুষ্ঠানিক সভা। পূজা ঘনিয়ে আসায় সিরাজগঞ্জের পালপাড়াগুলোতে যেন দম ফেলার ফুরসত নেই কারিগরদের। কাজের চাপ বেশি থাকায় পুরুষদের পাশাপাশি কাজ করছেন বাড়ির নারীরাও। এখন চলছে বাঁশ, খড় আর কাঁদা মাটি দিয়ে প্রতিমার অবকাঠামো তৈরি ও প্রলেপ দেয়ার প্রাথমিক কাজ। কাঁদামাটি দিয়ে পরম যত্নে দেবীর মুকুট, হাতের বাজু, গলার মালা, শাড়ির পাড়, প্রিন্ট ও ঠাকুরের চুল তৈরি করছে। এরপর প্রতিমাতে দেওয়া হবে রং তুলির আঁচড়। দৃষ্টিনন্দন আর নানা বৈচিত্রময় ভঙ্গির এসব দেবি মূর্তিগুলো শৈল্পিক প্রশংসা কুড়ালেও এসব মৃৎ শিল্পীদের জীবনে আসেনি কোনো সৌন্দর্য্যময় আলোর ছটা। সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার ভদ্রঘাট ইউনিয়নের বাজার ভদ্রঘাট পালপাড়া একটি গ্রাম। এ গ্রামে প্রায় ৩০-৪০টি হিন্দু পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশই প্রতিমা তৈরির কারিগর। নারী-পুরুষ সকলেই প্রতিমা তৈরির কাজ করে। সারা বছর এদের কদর না থাকলেও পূজার আগে এদের কদর বেড়ে যায়। এখানে প্রায় দেড় শতাধিক দূর্গা প্রতিমা তৈরি হচ্ছে। তবে প্রতিমা তৈরির জন্য বাঁশ, খড়, মাটিসহ অন্যান্য উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি পেলেও বাড়েনি প্রতিমার মূল্য। তবে আর্থিকভাবে লাভবান না হলেও পৈত্রিক এ পেশা ধরে রাখতেই কাজ করছেন প্রতিমা তৈরির কারিগররা। মূলত প্রতিমা তৈরি করেই চলে এদের সংসার। পূজার একমাস আগ থেকে শুরু হয় প্রতীমা তৈরির কাজ। এবারও শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে এখানে প্রতিমা তৈরির ধুম পড়েছে। সকাল থেকে রাত অবধি চলছে প্রতীমা তৈরি। প্রতি বছর দুর্গাপূজায় এ গ্রামের তৈরি প্রতিমা সিরাজগঞ্জসহ আশপাশের বগুড়া, নাটোর ও জামালপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি হয়।  এদিকে, সিরাজগঞ্জ শহরের মহাপ্রভূর আখড়া, কালীবাড়ী গোবিন্দ মন্দির, স্টেশনরোড কালিমাতা মন্দির, মাড়োয়ারীপট্টি মন্দির, বানিয়াপট্টি কালিমাতা মন্দির, ফড়িয়াপট্টি কালিমাতা মন্দির, গোশালা কালিমাতা মন্দির, বাহিরগোলা কালিমাতা মন্দির প্রাঙ্গনসহ সদর উপজেলার প্রায় শতাধিক পূজা মণ্ডপে এখন সারি সারি সাজানো হচ্ছে নানা আকার আর ঢংয়ের দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ আর মহিষাসুর-সঙ্গে দেবীর বাহন। এ বছর জেলার সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা, উল­াপাড়া, শাহজাদপুর, কাজিপুর, চৌহালী-এনায়েতপুর, কামারখন্দ, বেলকুচি, রায়গঞ্জ, তাড়াশ উপজেলায় প্রায় পাঁচ শতাধিক পুজা মণ্ডপ তৈরি করা হচ্ছে বলে পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ জানান।সিরাজগঞ্জের মৃৎ শিল্পী প্রদীপ পাল জানান, রাত দিন জেগে কঠোর পরিশ্রম করে তিনি ও তার সহযোগীরা এ প্রতিমাগুলো নির্মাণ করছেন। প্রতিমা তৈরিতে যে পরিশ্রম আর খরচ হয় সে তুলনায় বিক্রি করে লাভ হয়না। এ শিল্প থেকে যা আয় হয় তা দিয়ে সংসার চালাতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। প্রতি বছর সরস্বতী এবং দুর্গাপূজায় তারা ব্যস্ত সময় পার করে থাকেন। এই দু’টি মৌসুমের উপার্জিত অর্থ দিয়েই তাদের পুরো বছর পার করতে হয়। ভিন্ন পেশার অভিজ্ঞতা না থাকায় অভাব অনটন তাদের ঘিরে থাকে সার্বক্ষণিক। আর এই অভাব অনটন থেকে বাঁচতেই তাদের পরবর্তী প্রজন্ম এ পেশার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। নারী কারিগর দিপ্তী রানী পাল জানান, পুরুষদের সহযোগিতা করতেই প্রতিমা তৈরির কাজ করছি। তবে যে টাকা আয় হয় তা দিয়ে সংসার চলে না। একদিকে সুতা, বাঁশ-কাঠের দাম বৃদ্ধি অন্যদিকে পরিবারের সকলকে নিয়েই কাজ করি। এতে যে পরিশ্রম হয় সে পরিমাণ মূল্য আমরা পাই না। সরকার যদি সহায়তা করতো তবে সংসার স্বচ্ছলভাবে চলতো ও এ শিল্পটি আরো উন্নত করা যেতো। সিরাজগঞ্জ জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ কুমার কানু জানান, দুর্গা প্র্রতিমা যারা তৈরি করেন তাদের কারখানার অবস্থা করুণ, এসব কারিগররা দারিদ্রসীমার নিচে বাস করেন উল্লে­খ করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি স্বল্পসুদে ঋণ দেয়ারও দাবি জানালেন তিনি।  সিরাজগঞ্জ জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অ্যাড. সুকুমার চন্দ্র দাস জানান, আসন্ন দুর্গাপূজার সব ধরনের প্রস্তুতির কাজ চলছে। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও বিপুল উৎসাহ-উদ্দিপনা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্যদিয়ে পূজা উদযাপনের জন্য ৯টি উপজেলার মন্দির কমিটির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। এবার সিরাজগঞ্জের ৯টি উপজেলায় প্রায় ৫ শতাধিক পূজা মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হবে।প্রতিমা তৈরির কারিগরদের পাশাপাশি দুর্গাপূজায় সার্বিক নিরাপত্তা প্রদানের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে উল্লে­খ করে সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মিরাজ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, আশা করছি প্রতি বছরের মতো এবারও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধ্যদিয়ে সিরাজগঞ্জে শান্তিপূর্ণ ও উৎসব মুখর পরিবেশে দুর্গোৎসব উদযাপিত হবে।এফএ/এবিএস