মতামত

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী আপনাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা

আজ আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন। ১৯৪৭ সালের আজকের দিনে টুঙ্গিপাড়ায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গমাতার প্রথম সন্তান। পিতা মুজিব সবেমাত্র কলকাতা থেকে এসেছেন। রাজনীতিই তার ধ্যানজ্ঞান। পাকিস্তান আন্দোলন করেছিলেন বড় আশা নিয়ে। কলকাতা থেকে আশা নিয়ে ফিরে এসেছিলেন পূর্ববাংলার মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্যে। কিন্তু পাকিস্তানে পা রাখতে না রাখতেই পিতা বুঝে ফেললেন এই পাকিস্তানে জায়গা হবে না বাঙালির, পূর্ববাংলার সাধারণ মানুষের। ফলে তিনি ফরিদপুর থেকে ঢাকায় এসে সক্রিয় হলেন রাজনীতিতে। সংগঠিত করলেন ছাত্রলীগ, শুরু করলেন ভাষা আন্দোলন, যেতে হলো জেলে। মা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছোট্ট হাসিনাকে নিয়ে তখনও টুঙ্গিপাড়ায়, দাদা-দাদি নিকট আত্মীয়জন আদর করছেন। শুধুমাত্র বাবা মুজিব কাছে নেই, কোলে নিয়ে আদর করতে পারছেন না। যে ক’বার আসলেন স্বল্প সময়ের জন্যেই আসতেন আদর করে কোলে তুলে নিতেন, মধুমতী নদীর তীর পর্যন্ত ঘুরে আসতেন। বার বার চুমু খেতেন, আদর করে বুকে নিতেন। আবার চলে যেতেন। কখনও জেল, কখনও আন্দোলন। কামালেরও জন্ম হলো। কামালকে কোলে নিচ্ছে বোন হাসু। বাবা এই নামেই আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ডাকতেন, আদর করতেন। ১৯৫৪ সালে ঢাকায় এলেন, পুরান ঢাকায় ভাড়া বাসায় উঠলেন, স্কুলে ভর্তি হলেন। বাবা অল্প ক’দিনের জন্যে মন্ত্রী হলেও কোনো চাকচিক্য নেই জীবনে। খুবই সাদামাঠা জীবন, কোনো বাড়তি সুযোগ নেই। বাঙালি আর দশটা ছোট শিশুর মতোই শেখ হাসিনার শিশুকাল, কিশোরকালও কেটে গেল। কখনো কখনো বাড়ি ভাড়া পেতেও সমস্যা হয়েছিল। মা বুঝিয়ে দিতেন এভাবেই চলতে হবে, বাবাকে তার আদর্শ বাস্তবায়নে সাহায্য করতে হবে। তাদের ঢাকায় থাকার জন্যে দাদা যথাসময়ে অর্থের জোগান দিতেন। জামাল ও রেহেনা তখনও ছোট। কামাল খেলাধুলায় চোস্ত, বড় বোন মাকে সাহায্য করছে, কাছে কাছে থেকে মার সংগ্রাম দেখছে, বাবা তো কখন জেলে যাচ্ছে, কখন মুক্তি পাচ্ছে-তার কোনো পূর্বধারণা নেই। মা সংসার সামলাচ্ছেন, বাবার মামলার উকিলের ব্যবস্থা করছেন, দাদা অর্থের ব্যবস্থা করছেন। এসব দেখেই হাসিনা স্কুল পার করে দিয়ে কলেজে ঢুকলেন। কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ততদিনে বাবা তার লক্ষ্যে পৌঁছানোর চূড়ান্ত সংগ্রামে। ৬ দফা দেওয়া হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের তখন তিনি প্রধান। তাঁর চার পাশে বড় বড় নেতারা সভা করছেন, পূর্ববাংলার স্বায়ত্ত্বশাসনের আলোচনা হচ্ছে। ক’বছর আর ধানমন্ডির বাড়িটিতে উঠলেও বাবা আবারও জেলে, ৬-দফার ভয়ে পাকিস্তান সরকার তাঁকে একে একে নানা মামলায় জড়াচ্ছে। এ সময়ই বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছেতেই ১৭ নভেম্বর, ১৯৬৭ সালে ড. ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে অনাড়ম্বরভাবে তার বিয়ে হয়। বাবা তখন জেলে। পরদিন জেলে গিয়ে ১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধুর দোয়া নিলেন, বঙ্গবন্ধু ৩২ নম্বর ধানমন্ডিতেই তাদের থাকার কথা মাকে বলে দিলেন। বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা মামলায় প্রধান আসামী করা হলো। এরপর ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান। মুক্তি মিললো নেতার, পিতার, ভূষিত হলেন বঙ্গবন্ধুতে। পিতার আশপাশেই কাটতো। তখন ৩২ নম্বর হয়ে ওঠে রাজনীতির তীর্থস্থান। সেই বাড়ির প্রতিটি মানুষই রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের স্নেহধন্য, শেখ হাসিনা ড. ওয়াজেদ মিয়ার স্ত্রী হলেও বঙ্গবন্ধুর কন্যা। বড় কন্যা হিসেবে সব পিতার মতো বঙ্গবন্ধুরও বিশেষ দৃষ্টি হাচুর প্রতি। ঘটনা প্রবাহ গিয়ে গড়ালো মুক্তিযুদ্ধে, গৃহবন্দী শেখ হাসিনা বুঝতেন। অবশেষে স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসা। শেখ হাসিনা স্বামী, সংসার, সন্তান, পিতার রাজনীতি, মায়ের আশ্রয় সবই সম্বল করে এগুচ্ছেন। তাদের পিতা জাতির পিতা-এর চাইতে বড় পরিচয় দুর্লভ, তিনি বা অন্য ভাইবোনরাও তাতেই তুষ্ট ছিলেন, কারো বিশেষ কোনো উচ্চাকাক্সক্ষার প্রকাশ ঘটেনি। শেখ কামাল যেহেতু ছেলে। তাকে প্রতিহিংসার চোখে দেখেছে একটি মহল। তাই তার বিরুদ্ধে বানোয়াট সব অপপ্রচার। কিন্তু শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কোনো শব্দ নেই, বরং সাদাসিধে পোশাকে জীবনযাপনকারী শেখ হাসিনাকে যারা দেখেছেন তারা প্রশংসাই করতেন। আসলে বঙ্গবন্ধুর পরিবার বেড়ে উঠেছিল সংগ্রামের ভেতর দিয়ে। খুব বেশি কিছু তাদের চাওয়া বা পাওয়ার ছিল না। তবে পিতা-মাতার স্নেহে ভালোবাসায় তাদের শিশু কিশোরও তরুণ কাল কেটেছে প্রেরণাশক্তি সঞ্চয়ের মধ্য দিয়ে। এই পরিবারের ওপর ১৫ আগস্ট যে বর্বরতার ঘটনা ঘটে গেল-তার কোনো নজির মানব সভ্যতার ইতিহাসে মেলার কথা নয়। সন্তান ও ছোট বোন রেহেনাকে নিয়ে জার্মানিতে স্বামীর কাছে বেড়াতে যাওয়ার কারণে বেঁচে গেলেন দুই বোন। এমন নিষ্ঠুরতার জীবন শুরু হলো দুই বোনের। যে সংগ্রাম এক সময় মা ও বাবা করেছিলেন তা তাকে, রেহেনাকে তার সন্তানদেও শুরু হলো প্রবাসে। প্রবাসে প্রথমে তিনি ঘুরে দাড়ালেন, তারপর দেশে ফেরা। অবশেষে ১৭ মে ১৯৮১ সালে তিনি স্পর্শ করলেন সেই মাটি- যে মাটি ছিল বঙ্গবন্ধুর গোটা পরিবারের রক্তে ভেজা, দুর্গন্ধময়। যে দেশ তিনি ১৯৭৫ সালে দেখে গেছেন বঙ্গবন্ধুর হাতে, সেই দেশের শাসন তখন সাময়িক শাসকের হাতে, উল্টোপাল্টে চলা এক উদ্ভট উটের পিঠে দেশটি তখন পেছনে হাঁটছিল। তিনি কিছু দিন কাঁদলেন, বুকের ভেতরে তার জমে থাকা পাথরসম অশ্রুকে ঝরিয়ে দিতে তাকে কাঁদতে হলো, কাঁদলেনও। কিন্তু কান্না শেষে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন নি। শুরু করলেন নতুনভাবে রাজনীতির পথ চলা। এই পথেতো তাঁর আসার কথা ছিলনা, চিন্তাও ছিলনা। কিন্তু ইতিহাস তাকে টেনে নিয়ে এসেছিল। শূন্যস্থান পূরণ করতে যে তাকে হবেই। ব্রেঝনেভ এবং আন্দ্রোপভের মৃত্যু উপলক্ষে মস্কোতে তাকে খুব কাছে থেকে দেখছি, কথা বলার সুযোগ হয়েছে। তার চোখে তখনও একটু আধটু অশ্রু। শুরু করলেন স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন। সব কিছু সহজভাবে তার এগোয়নি, আকাবাঁকাও, অপ্রত্যাশিত ছিল। তখনও দেশে, ৩২ নম্বরে চট্টগ্রামে তাকে কাছ থেকে দেখেছি। তবে তিনি যে বঙ্গবন্ধুর আসন পূরণ করবেন সেই আস্থা দিন দিনই প্রবল হচ্ছিল। ১৯৯৬ এর নির্বাচনে তিনি ঐতিহাসিক রায় পেলেন। এটি ছিল অনেক কষ্টের রায়। দেশটিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিলেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার শুরু করলেন, কৃষি ও সামাজিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে দেশ যেন ঘুরে দাঁড়ালো, ভারতের সঙ্গে গঙ্গার ন্যায্য হিস্যা আদায় করলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফিরিয়ে আনলেন। ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যার বিপর্যয় কাটিয়ে উঠলেন, দেশটা বঝতেই পারেনি বন্যার ধ্বংসলীলা। আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস আদায় করলেন। সবই ইতিবাচক, আস্থা সৃষ্টির। কিন্তু এমন করে ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়টি ১৯৭৫ এর অপশক্তিরা ঠিকই বুঝে ফেলেছিল। তাই তারা জঙ্গিদেও মাঠে নামিয়ে হত্যা করতে চাইলো শেখ হাসিনাকে, কিন্তু সফল হতে পারলো না। তবে নির্বাচনে কিছুতেই জয়লাভ করতে দেওয়া যাবে না- ষড়যন্ত্রের সেই গোপন ছক নিয়ে মাঠে নেমেছিল দেশি ও বিদেশি শক্তিসমূহ। ২০০১ সালের নির্বাচনে তা-ই করা হলো। এরপরের ৫ বছরের ইতিহাস ছিল তাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রেও নানা ফাঁদ পাতা, আওয়ামী লীগ ও অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করার ছক, বোমা, জঙ্গি-২১ আগস্ট ট্র্যাজেডি-সবই হলো। কিন্তু সফল হয় নি। তবে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য ছিল যেকানো মূল্যে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা। সেই সাধও পূরণ হয় নি। ১/১১ তাতে বাঁধ সাধলো। তবে দুই বছরের সেনা শাসনও ছিল ভিন্ন লক্ষ্যাভিমুখি, তাই তাকে জেলে বন্দী ও বিচারের সম্মুখীন করা হলো। শেষ পর্যন্ত সফল হলো না পেছনের শক্তি। অবশেষে ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তবে এই নির্বাচনে শেখ হাসিনা তার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনা তুলে ধরলেন জাতির সামনে, বদলে দেওয়ার স্লোগান দিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিলেন। জনগণ তাকে ভোট দিল। তিনিও দিলেন প্রতিশ্রুতি পরিবর্তন, উন্নয়ন, ডিজিটালাইজেনের। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে তিনি এতোটুকু নুয়ে পড়েন নি, বরং মাথা তুলে চললেন, পদ্মা সেতু নির্মাণে সকল বাধাবিপত্তি কাটিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ালেন, গোটা জাতিকে তিনি পিতার মতো আত্মমর্যদায় দাঁড়ানোর আহ্বান জানালেন, দেশ বিদেশি নানা ষড়যন্ত্র, চাপ- সবই মোকাবেলা করলেন, সমুদ্র সীমা নিয়ে বিরোধ মেটালেন আর্ন্তজাতিক আইনে, ভারতের সঙ্গে ৭০ বছরের ছিটমহল ও সীমানা সমস্যা সমাধান করলেন, জঙ্গিবাদকে জিরোটল্যারেন্সে ২০০৯ সাল থেকে মোকাবিলা করেই যাচ্ছেন, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়, রেমিটেন্স, বিদ্যুৎ উৎপাদন, খাদ্য উৎপাদন, দারিদ্র্য দূরীকরণ, শিক্ষার হার বাড়ানো, যোগাযোগ ব্যবস্থা, ফ্লাইওভার ইত্যাদিতে বাংলাদেশকে একটি তাক লাগানো জায়গায় নিয়ে গেলেন। বিশ্বসেরা নেতৃত্বের তালিকায় তিনি আপন মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতায় উঠে আসলেন। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জায়গায় শেখ হাসিনার স্থান অনেক উচ্চতায়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যথার্থই শেখ হাসিনার উচ্চতা পরিমাপ করে বলেছেন, শেখ হাসিনা এখন আর আওয়ামী লীগের নেতা নন, তিনি এখন জাতীয় নেতা। এটি বেশিরভাগ বোদ্ধাই বেশ আগ থেকে বলছেন। শেখ হাসিনা ধীরে ধীরে রাষ্ট্র নেতৃত্বের চূড়ায় উঠে গেছেন-যেখান থেকে তিনি বাংলাদেশের অনেক কিছুই বেশ গভীরভাবে দেখতে পারছেন, উপলব্ধি করতে পারছেন। একজন নেতা যখন বিবর্তনের ধারায় নিজেকে এতোখানি পরিবর্তিত ও উন্নত চিন্তা-ধারা, দেশ, জাতি এবং বিশ্ব ব্যবস্থায় অধিষ্ঠিত করতে পারেন-তখন সেই নেতার প্রয়োজনীয়তা সকলেরই জন্যেই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে অনেকেই নিজেকে রাজনীতিবিদ, নেতা নেত্রী বলে ভাবেন, প্রচারও করে থাকেন। কিন্তু শেখ হাসিনার মতো নিজেকে দেশ, জাতি এবং আর্ন্তজাতিক পরিমণ্ডলের জন্য অপরিহার্য করে তুলতে পেরেছেন ক’জন। বঙ্গবন্ধু যদি এখন স্বর্গ থেকে দেখতে পান, তাহলে তিনি তাঁর হাসুকে দেখে হয়তো সুখের নিদ্রাই যাওয়ার কথা ভাববেন। শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস প্রদর্শিত পথে যথার্থই এগিয়ে চলেছেন, বাংলাদেশকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। এই টানা আরও অব্যাহত থাকতে হবে। প্রিয় প্রধানমন্ত্রী আপনার শারীরিক সুস্থতা কামনা করি, আপনার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু এবং তার আরাধ্য বাংলাদেশ টিকে থাকবে, আমরাও। আপনার জন্য বিনম্র শ্রদ্ধা। শুভ হোক আপনার জন্মদিন, আগামী বছরগুলো, বাংলাদেশও ভালো থাকুক।লেখক : অধ্যাপক, কলাম লেখক। এইচআর/পিআর