আজ ২৯ সেপ্টেম্বর (বৃহস্পতিবার), রামু সহিংসতার চার বছর পূর্ণ হলো। সম্প্রীতির ঐতিহ্য বিনষ্টের ভয়াল এ রাতের বিভীষিকা মুছে দিয়েছিল শত বছরের ঐতিহ্যের স্মৃতিচিহ্ন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেহে সৃষ্টি হয়েছিল অবিশ্বাসের বিশাল ক্ষত। এ ঘটনা দিয়ে শত বছরের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ফাটল ধরে। তবে সরকারের নানা উদ্যোগের কারণে ইতোমধ্যে সেই চিড় ধরা ধর্মীয় সম্প্রীতিতে আবারো জোড়া লেগেছে। হারানো ঐতিহ্যের স্থানে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে সুরম্য অট্রালিকা। বদলে গেছে রামুর চারপাশের চেহারা।পুড়ে যাওয়া ঐতিহ্যের স্থানে ঠাঁই হওয়া দৃষ্টিনন্দন ইমারতগুলো এখন পর্যটনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কক্সবাজার বেড়াতে আসা দেশি-বিদেশি ভ্রমণ পিপাসুরা একবারের জন্য হলেও রামুতে ঢু মারছেন। পর্যটকদের এসব আগ্রহের কথা চিন্তা করে বিহার কর্তৃপক্ষও প্রশাসনের সমন্বয়ে বৌদ্ধ বিহার এলাকার চারপাশ পরিচ্ছন্ন ও দৃষ্টিনন্দন করে সাজিয়ে রাখছেন। লাগানো হয়েছে নয়ন জুড়ানো ফুলের বাগানসহ নানা কারুকার্য। ঐতিহ্য হারানো রামুর নিরাপত্তায় সেনাবাহিনী একটি ক্যান্টনমেন্ট ও বিজিবি স্বতন্ত্র একটি ব্যাটালিয়ন স্থাপন করা হয়েছে। সরকারি এসব বাহিনীর সদস্যদের টহলের পাশাপাশি পুলিশ সদস্যরা সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন। অন্যদিকে, চার বছরের মাথায় এসেও মামলার চার্জশিট দাখিল নিয়ে রয়েছে চরম অসন্তোষ। বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সাধারণ জনগণ বলছেন, দেশে-বিদেশে তোলপাড় হওয়া এ ঘটনায় শীর্ষ অভিযুক্তরা বাদ পড়েছেন। যুক্ত হয়েছেন অসংখ্য নিরীহ লোকজন। যারা প্রতিমাসে আদালতে হাজিরা দিয়ে যাচ্ছেন । এক্ষেত্রে পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে।কক্সবাজার কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক রঞ্জিত পালিত জানান, ১৯টি মামলায় ৯৪৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে রামুর আটটি মামলায় ৪৫৮জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।তিনি জানান, রামু থানার জনৈক সুধাংশু বড়ুয়ার করা মামলাটি দু’পক্ষের আপোষ মীমাংসার ভিত্তিতে খারিজ করে দিয়েছে আদালত। বাকি ১৮টি মামলার মধ্যে ৩টি পুনঃতদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে দেয়া হয়েছে। ১৫টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল হলেও সাক্ষীদের অসহযোগিতায় মামলার বিচার কার্য এগিয়ে নেয়া যাচ্ছে না। এসব মামলার ৮ সাক্ষীকে বৈরী আদালত ঘোষণা করেছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মমতাজ আহমদ। রামু সহিংসতার চার বছর উপলক্ষে উপজেলার প্রত্যেক মন্দিরের পাশাপাশি রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ যুব পরিষদ দিনব্যাপী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বলে জানান পরিষদের মহাসচিব ঝন্টু বড়ুয়া।রামু উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রিয়াজ উল আলম বলেন, রামু সহিংসতার মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির অপচেষ্টা চালিয়ে ছিল। শেখ হাসিনার সরকার তা শক্ত হাতে মোকাবিলা করেছেন। কক্সবাজার-রামুর সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমল বলেন, ২০১২ সালে যারা রামুর ইতিহাস, ঐতিহ্য ধ্বংস করতে চেয়েছিল তারা আজ ঘিণিত, আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত। শেখ হাসিনার সরকার নতুনভাবে রামুর পুড়ে যাওয়া বৌদ্ধ মন্দিরগুলো সাজিয়েছেন। এখন দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান রামু। বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতির রামু উপজেলা সভাপতি স্বপন বড়ুয়া, রামু উপজেলা যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক নীতিশ বড়ুয়া ও বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতি (যুব) এর সভাপতি সুরেশ বড়ুয়া জানান, ঘটনার ৪ বছরের মধ্যে বৌদ্ধরা কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনি পেয়েছে। ঘটনার অনেক ছবি ও ভিডিও রয়েছে। এ ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির তদন্তও হয়েছে।রামু ঘুরে দেখা যায়, ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে দুর্বৃত্তদের দেয়া আগুনে রামুর ১২টি বৌদ্ধ বিহার ধ্বংস হলেও সেই ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন এখন আর নেই। সেই ধ্বংসস্তূপের উপর ১০ মাসের মধ্যে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়েছে দৃষ্টিনন্দন বিহার। বিহারগুলোর পুনঃনির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে গেছে রামুর দৃশ্যপট। রামু মৈত্রী বিহার পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক পলাশ বড়ুয়া ও নিলুৎপল বড়ুয়া বলেন, সহিংসতার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেনাবাহিনী দিয়ে যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পল্লী ও বিহার পুনঃর্নিমাণ করেছে আমরা চাই সেভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আগের মতোই নির্মিত হোক। আমরা প্রত্যাশা করছি, আগের মতো মিলেমিশে থাকবো। কোন রকম ভেদাভেদ থাকবে না। কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের অধ্যক্ষ একুশে পদকপ্রাপ্ত পণ্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের বলেন, আমরা ঐতিহ্য হারিয়েছি। তবে বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা আমাদের ৫০ বছর এগিয়ে দিয়েছেন। আমরা আশা করছি সম্প্রীতির ভাব আগের অবস্থায় ফিরবে।কক্সবাজারের পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার নাথ জানিয়েছেন, পুলিশ তদন্ত করে চার্জশিট দাখিল করেছেন। আদালত বিচার করে জড়িত এবং জড়িত নয় প্রমাণ করবেন। বিচার চলছে।উল্লেখ্য, রামুর উত্তম বড়ুয়া নামে এক যুবকের বিরুদ্ধে ফেসবুকে পবিত্র কোরান শরিফ অবমাননার অভিযোগ এনে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে উগ্র ধর্মান্ধগোষ্ঠী রামুর বারটি প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারও ২৬টি বসতঘরে অগ্নিসংযোগ করে। এ সময় আরো ছয়টি বৌদ্ধ বিহার ও শতাধিক বসতঘরে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। পরদিন উখিয়া-টেকনাফে আরো কয়েকটি বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে একই ঘটনা ঘটে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সেনাবাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত বিহার পুনঃনির্মাণের কাজ করে। কিন্তু ঘটনার সূত্র যাকে নিয়ে সেই উত্তম বড়ুয়ার খোঁজ বিগত ৪ বছরেও পায়নি পরিবার ও প্রশাসন। সন্তান ও বৃদ্ধা শাশুড়িকে নিয়ে মানবেতর দিনযাপন করছেন উত্তমের স্ত্রী রিতা বড়ুয়া। এসএস/আরআইপি