দেশজুড়ে

শেরপুর সীমান্তে হাতি-মানুষে ‘যুদ্ধ’ চলছেই

শেরপুরের সীমান্ত জনপদে বন্যহাতি-মানুষে দ্বন্দ্ব কমছেই না। বরং সাম্প্রতিককালে এ দ্বন্দ্ব আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে।  পাহাড় থেকে খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে নেমে আসা বন্যহাতির দল মানুষের বাধা পেয়ে ফসলের মাঠ-বাড়িঘরে তাণ্ডব চালাচ্ছে। এমনকি পায়ে পিষ্ট করে, শুড় পেঁচিয়ে তুলে আছাড় দিয়ে মানুষের জীবনহানি ঘটাচ্ছে। তেমনি সীমান্তের অধিবাসীরাও নিজেদের টিকে থাকার লড়াইয়ে নিজেদের জান-মাল রক্ষায় বন্যহাতির ওপর সহিংস-হিংস্র আচরণ করছে। এতে মারা পড়ছে বন্যহাতি। সীমান্তবর্তী ঝিনাইগাতী-শ্রীবরদী ও নালিতাবাড়ী উপজলোয় পাহাড়ী জনপদে হাতি-মানুষে দ্বন্দ্ব নিরসন ও সহাবস্থান নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হয়। তবু হাতি-মানুষে ‘যুদ্ধ’ থামছেই না, বেড়ে চলেছে বন্যহাতি ও মানুষের প্রাণহানি। বিনষ্ট হচ্ছে ক্ষেতের ফসল, লণ্ডভণ্ড হচ্ছে ঘরবাড়ি আর নষ্ট হচ্ছে গাছপালা। ১৩ অক্টোবর বৃহস্পতিবার রাতে ঝিনাইগাতীর কাংশা ইউনিয়নের পানবর ও দুধনই গ্রামে বন্যহাতির দল তাণ্ডব চালিয়ে ৩ গ্রামবাসীকে শুঁড় দিয়ে পেঁচিয়ে পায়ে পিষ্ট করে নিহত ও চারজনকে আহত করে। ক্ষতিগ্রস্ত করে ৫টি বসত ঘর এবং প্রায় চার একর জমির আবাদ ফসল। এর আগে ১০ অক্টোবর রাতে ঝিনাইগাতীর উত্তর বাকাকুড়া সীমান্ত গ্রামে বন্যহাতির আক্রমণে এক গারো কৃষক নিহত ও দুইজন আহত হয়। প্রায় ৬০/৭০টি বন্যহাতির দল রাতভর ওই এলাকায় তাণ্ডব চালিয়ে প্রায় ৪ একর জমির আবাদ করা আধা পাকা আমন ধান ও এক একর জমির শিমুল আলুর ক্ষেত খেয়ে, পায়ে মাড়িয়ে সাবাড় করে। সেপ্টেম্বর মাসে ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী সীমান্তে কয়েকদিনের ব্যবধানে বন্যহাতির আক্রমণে তিনজন নিহত ও ২ জন আহত হয়। এদিকে, গত ১ অক্টোবর পশ্চিম বাকাকুড়া এলাকায় গ্রামবাসীদের বিদ্যুতের ফাঁদে একটি বন্যহাতিও মারা পড়ে।ময়মনসিংহ বন বিভাগ ও শেরপুর জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কার্যালয়ের হিসাব মতে, ১৯৯৫ সাল থেকে এ বছরের ১৩ অক্টোবর ঝিনাইগাতী-শ্রীবরদী ও নালিতাবাড়ী উপজলোর পাহাড়ী এলাকায় বন্যহাতির আক্রমণে মৃত্যু হয়েছে ৫১ জনের। আহত হয়েছে পাঁচ শতাধিক লোক। অন্যদিকে মানুষের হাতে মারা পড়েছে ১৯টি হাতি। এর মধ্যে গত আড়াই বছরে (২০১৪ থেকে এ পর্যন্ত) প্রাণ গেছে ১৮ জন মানুষের। এছাড়া হাতির আক্রমণে ঘরবাড়ি, গাছপালাসহ কোটি টাকার বেশি মূল্যের সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে। একই সময়ে হাতি মারা গেছে ১২টি। স্থানীয় অধিবাসী ও বন্যপ্রাণি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্রমাগত বনাঞ্চল ধ্বংস হওয়ায় বন্যহাতির খাবারের উৎস কমে গেছে। তাছাড়া বনে মানুষের বসবাস ও আনাগোনা বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্যহাতির ‘হোমরেঞ্জ’ (নিজস্ব বিচরণক্ষেত্র) কমে গেছে। এজন্য বন্যহাতি খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে নেমে আসছে। শেরপুর সীমান্তের ওপারে ভারত থেকেও অনেক বন্যহাতি গুলিবিদ্ধ হয়ে এপারে এসে মারা পড়ছে। ওপারে ভারতীয়রা বনের জমিতে কাজু বাদাম চাষ, রাবার চাষ করার কারণে বন্যহাতিকে তাড়িয়ে দিচ্ছে। আবার চোরা শিকারিরাও হাতির দাঁত অঙ্গ-প্রতঙ্গের লোভে বন্যহাতিকে হত্যা করছে। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন-২০১২ অনুযায়ী, বন্যহাতি হত্যা করলে দুই থেকে সাত বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। আর বন্যহাতির আক্রমণে নিহত হলে সরকারের তরফ থেকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বনবিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে এক লাখ টাকা এবং আহত হলে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রদান করে থাকে। ঝিনাইগাতীর কাংশা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. জহুরুল হক বলেন, বন্যহাতি আমাদের এলাকার জন্য এখন দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। আগে ধান ও কাঠালের মৌসুমে এসব বন্যহাতি পাহাড় থেকে সমতলে নেমে আসতো। এখন সারা বছরই এসব হাতি লোকালয়ে নেমে আসছে। পানবার গ্রামের গৃহবধূ নূর জাহান বেগম (৪২) বলেন, ‘ধান, কাঁডাল পাকলেই আত্তির (হাতির) পাল আমগর গেরামে নাইমা আয়ে। ঘরবাড়ি ভাইঙা ফালায়। পোলাপান নিয়া রাইত জাইগা বইসা থাহি। কী করমু, তহন তো কোনো উফায় থাহে না। এহেবারে যুদ্ধের নাহাল অবস্থা। আত্তির জীবনের দাম আছে, আমগর জীবনের দাম নাই।’ছোট গজনী গ্রামের হাতি সুরক্ষা দলের সদস্য মফিজ উদ্দিন (৪৫) বলেন, আগে মশাল জ্বালাইয়া, টর্চ মাইরা, জেনারেটরের আলো ফালাইলে, চিৎকার-চেঁচামেচি করলে বন্যহাতি চইল্লা যাইতো। কিন্তু এহন তারা কিছুই মানতাছেনা। অহন আলো দেকলে দৌড়াইয়া আলোর দিকেই আইয়ে। মশাল নিয়া দৌড়াইলে উল্টা  শুড় দিয়ে আগুনের মশাল কাইড়া নিয়া তাড়া করছে। শ্রীবরদী উপজেলা ট্রাইবাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রাঞ্জল এম সাংমা বলেন, সীমান্তের ওপারে ভারতে স্থানীয় অধিবাসী ও চোরা শিকারীরা বন্যহাতিকে গুলি করে হত্যা করছে। রাবার বাগান, বাদামের বাগান করার জন্য ওপারের স্থানীয় বাসিন্দারা হাতি তাড়াচ্ছে। আর চোরা শিকারীরা হাতির দাঁত ও বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের লোভে গুলি করেছে। তিনি ভারত-বাংলাদেশ দ্বি-পক্ষীয় সহযোগিতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করে হাতি-মানুষের এ দ্বন্দ্ব নিরসনের দাবি জানান।বনবিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ভারত থেকেই হাতিগুলো বাংলাদেশে আসে। আমাদের বনের যে আকার তাতে এখানে বন্যহাতির খাবার ও বাস করার মতো পরিধি নেই। কিন্তু যখন ওপার থেকে তাড়া খায় তখন হাতিগুলো এপারে চলে আসে। ইদানিং ওপারে ভারতের বনাঞ্চলে কাজু বাদামের চাষ করছে স্থানীয়রা। তারা বাদামের বাগান রক্ষায় বন্যহাতিকে তাড়িয়ে দিচ্ছে। এজন্য বন্যহাতির চলাচলের গতি-প্রকৃতিও পরিবর্তিত হচ্ছে। আইইউসিএন-এর সাম্প্রতক জরিপ অনুযায়ী, শেরপুরের বনাঞ্চলে বিচরণকারী ১২০/১২৫ টি হাতি রয়েছে। এর সবগুলোই পারিযায়ী হাতি। এসব হাতিকে এশিয়ান হাতি বলা হয়। বর্তমানে এসব এশিয়ান হাতি খুবই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আরো জানা যায়, ভারত থেকে আসা এসব বন্যহাতি শেরপুরের সীমান্তবর্তী ৮ হাজার ৩৭৬ একরের বনভূমিতে বিচরন করে। ধান ও কাঁঠালের মৌসুমে খাদ্যের সন্ধানে প্রতি রাতে হাতিগুলো পাল বেঁধে চলে আসে সমতলে। জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ থেকে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলা পর্যন্ত এলাকা চষে বেড়ায়। আইইউসিএন-এর সাইট ম্যানেজার মো. মিজানুর রহমান শেরপুরের সীমান্ত জনপদে হাতি সুরক্ষা দল গঠন নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, নালিতাবাড়ীর মায়াঘাসি এলাকা থেকে ঝিনাইগাতীর রাংটিয়া পর্যন্ত বনের বিস্তার কম থাকায় এ এলাকায় বন্যহাতির ডিস্টার্ব গত এক বছরে তেমন হয়নি। এখানে প্রাকৃতিক বনের চাইতে উডলট বাগান বেশি। আর রাংটিয়া থেকে তাওয়াকুচা পর্যন্ত কিছুটা প্রাকৃতিক বন ও ঘনজঙ্গল থাকায় সেখানে বন্য হাতির খাবারের সংস্থান রয়েছে। যে কারণে ওইসব এলাকায় ক্যাজুয়ালটি (হতাহতের ঘটনা) বেশি হয়েছে। দেখা যাচ্ছে বনের ভেতর যখন খাবার কমে যাচ্ছে তখন হাতি লোকালয়ে হানা দিচ্ছে। তিনি তার পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করে বলেন, এই এলাকায় বর্ডার রোডের (সীমান্ত সড়ক) পূর্ব প্রান্তের বসতি ও লোকজনকে পশ্চিম পাশে আনা কিংবা ডিসপ্লেসড (স্থানান্তর) করে অন্য কোথাও নিতে হবে। তাহলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমতে পারে। তিনি জানান, শেরপুর সীমান্তে সব সময় ৬০/৭০টি বেশি হাতির বিচরণ রয়েছে। এরাই বিভিন্ন সময় ৩/৪টি দলে ভাগ হয়ে সীমান্ত জনপদে বিচরণ করছে। জেলা বন্যপ্রাণি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন, বনবিভাগ ২০১৫ সালে গারো পাহাড়ের ঝিনাইগাতীর তাওয়াকুচা ও শ্রীবরদীর কর্নঝুড়া এলাকায় ১০০ হেক্টর বনভূমিতে হাতির খাদ্য উপযোগী বাগান তৈরি করেছে। এছাড়া হাতি যাতে লোকালয়ে না আসতে পারে এজন্য হাতি প্রতিরোধে তাওয়াকুচা, ছোট গজনী, বড় গজনী, হালচাটি ও মায়াঘাসি এলাকায় ১৩ কিলোমিটারে লেবু ও বেতকাটার বাগান করা হয়েছে। যাকে বলা হচ্ছে ‘বায়ো ফেন্সিং’ বা প্রাকৃতিক সুরক্ষা দেয়াল।সেই বায়ো ফেন্সিংয়ের সঙ্গে স্থাপন করা হচ্ছে ‘সোলার প্যানেল শক’। ভারতের অভিজ্ঞতার আলোকে হাতি তাড়ানোর এ ধরনের সোলার প্যানেল শক বসানোর কাজ চলছে। তাছাড়া এলাকার জনগণের মাঝেও আগের তুলনায় অনেক জনসচেতনতা বেড়েছে। আশা করা যায়, হাতির খাবার বাগানের গাছ বড় হলে এবং বায়ো ফেন্সিং ও সোলার প্যানেল শক স্থাপন শেষ হলে লোকালয়ে বন্যহাতির আগমন অনেক কমে যাবে। এতে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্বও ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক হ্রাস পাবে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বনবিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, আসলে হাতি-মানুষ দ্বন্দ্ব নিরসনে শেরপুর সীমান্তে বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হলেও সাম্প্রতিককালে ঝিনাইগাতীর তাওয়াকুচা ও গজনী বীট এলাকায় বন্যহাতির আনাগোনা বেশ বেড়ে গেছে। এতে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করেছে। তিনি জানান, আগে সাধারণত দেখা যেতো, যে এলাকায় হাতি কোন একজনকে মারতো, ওই এলাকায় অন্তত এক দেড়মাসের মধ্যে হাতি আসতো না। কিন্তু এখন উল্টো ঘটনা ঘটছে। বিষয়টি নতুন করে ভাবনার জন্ম দিয়েছে। এজন্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে নতুন কিছু চিন্তা-ভাবনা করা উচিত বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।   বনবিভাগের শেরপুর বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) গোবিন্দ চন্দ্র রায় বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় হাতি খুবই উপকারী প্রাণী। তাই তাদের সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সেই চেষ্টাই করছে বন বিভাগ। তিনি ভারত সীমান্ত থেকে গুলিবিদ্ধ হয়ে এসে হাতি মারা যাওয়ার বিষয়ে জানান, আমরা গত বছর আগস্টে ভারতের সঙ্গে কলকাতায় আন্তঃদেশীয় বৈঠক করেছি। সেই বৈঠকে এ ব্যাপারে বিস্তারিত কথাবার্তা হয়েছে। ওয়ার্কিং কমিটিও করা হয়েছে। কিন্তু বন্যহাতিকে গুলি করার ঘটনা যেন থামছেই না। এরপরও আমরা বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় কাউন্টারপার্টের সঙ্গে কথা বলবো।  শেরপুরের জেলা প্রশাসক ডা. এ এম পারভেজ রহিম বলেন, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে। উভয় দেশের সহযোগিতায় বন্যহাতির আবাস নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সীমান্তে অভয়াশ্রম তৈরি করা যায় কিনা কথাবার্তা হচ্ছে। এতে হাতি-মানুষে দ্বন্দ্বও কমে আসবে বলে তিনি জানান।এসএস/পিআর