দেশজুড়ে

চুলের জট ছাড়িয়ে স্বাবলম্বী

সেলিনা বেগম। স্বামী পরিত্যক্তা। গত আট বছর আগে স্বামী ছেড়ে দেয়ার পর দুই সন্তান নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন গরিব বাবার বাড়িতে। গ্রামের বিভিন্ন জনের বাড়ি কাজ করে কষ্টে কোনো রকম দিন কাটাতেন তিনি। গত তিন বছর আগে সেকেন্দার আলীর চুলের কারখানায় মাসে ১৫০০ টাকা বেতনে কাজ শুরু করেন। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে বেলা দেড়টা পর্যন্ত এ কারখানায় কাজ করতে হয়। কারখানায় কাজ করে এখন টিনের দুটি ঘর দিয়েছেন সেলিনা বেগম। হাঁস-মুরগির পাশাপাশি পালন করছেন ছাগল। আগের চেয়ে অনেক ভালো আছেন।নওগাঁর মান্দা উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামে নিজ বাড়িসহ তিনটি গ্রামে পাঁচটি চুল প্রক্রিয়াকরণ কারখানা করে প্রায় তিন শতাধিক হতদরিদ্র নারীর কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করেছেন সেকেন্দার আলী। শুধু হতদরিদ্র নারী নয়, কাজ করছেন শিক্ষার্থীরাও। এ কারখানায় কাজ করে স্বাবলম্বী অনেক দরিদ্র নারী।এ কারখানার শুরু থেকে কাজ করছেন মাহফুজা বেগম। তিনি বলেন, অভাবের সংসার। চারজন সদস্য। স্বামী অসুস্থ, শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। ছেলে রাজশাহীতে অনার্সে দ্বিতীয় বর্ষে লেখাপড়া করে। এখানে কাজ করে যে টাকা পান তা ছেলের কাছে পাঠান। ছেলেকে উচ্চশিক্ষিত করার লক্ষ্যে কষ্ট করে চুলের কারখানায় কাজ করছেন। এখানে কাজ না করলে হয়তো ছেলেকে রাজশাহীতে পড়ানো সম্ভব হতো না।প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের হতদরিদ্র নারীরা অপরিষ্কার ও জটলা বাধা চুল এ কারখানায় পরিষ্কার করেন। সাংসারিক কাজ শেষ করে আসেন কারখানায়। অনেকে মাসভিত্তিক আবার অনেকে দিন হিসেবে কাজ করেন। আর এ থেকে প্রাপ্ত আয় তাদের সংসারে কাজে লাগান। আবার অনেকে নিজেদের শৌখিন কাজে ব্যবহার করেন।সংসারে অভাব থাকায় দুই বছর আগে মঞ্জুআরা বেগম কারখানায় কাজ শুরু করেন। স্বামী ভ্যানচালক। এখানে কাজ করে গত বছর ২৩ হাজার টাকায় ১০ কাঠা জমি বন্ধক নিয়েছেন। এছাড়া হাতের স্বর্ণের বালা ও কানের দুল নিয়েছেন, যা ভ্যান চালিয়ে স্বামীর পক্ষে হয়তো সম্ভব হতো না বলে জানান।দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুন ও ৮ম শ্রেণির রিপা বলে, শুক্রবার ও ছুটির দিনগুলোতে কারখানায় কাজ করে তারা। এ কাজের টাকা তাদের কসমেটিক সামগ্রী, লেখাপড়ার খরচ ও ছোটখাটো কাজে ব্যয় করা হয়। এ কারখানায় কাজ করছেন সামিরন, রওশন আরা, মরিয়মসহ ৪৫ জন নারী শ্রমিক। সবারই সংসারে এসেছে সচ্ছলতা।কারখানার মালিক সেকেন্দার আলী জানান, ২০১৩ সালে প্রথমে একটি কারখানা দিয়ে শুরু করলেও এখন পাঁচটি কারখানা দিয়েছেন। পাঁচটি কারখানায় তিন শতাধিক হতদরিদ্র নারী শ্রমিক রয়েছে। প্রতিজন শ্রমিকের বেতন মাসে ১৫০০ টাকা। অনেক নারী স্বামীর কাছ থেকে টাকা চেয়ে পায় না। এ নিয়ে ঝগড়া হয়। গ্রামের যারা হতদরিদ্র নারী আছে তাদের কর্মসংস্থানের সৃষ্টির জন্য এ পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন। তিনি আরও জানান, প্রতি সপ্তাহে ঢাকা থেকে ৫০-৬০ কেজি চুল নিয়ে আসতে হয়। প্রতিদিন প্রতিটি কারখানায় ১০ কেজি করে চুলের প্রয়োজন হয়। প্রতি কেজি ৪ হাজার টাকা দরে কিনে কারখানায় চুলের জট ছাড়িয়ে পরিষ্কার, শ্যাম্পু ও শোধনের পর ৭-৮ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়।সেকেন্দার আলী বলেন, জমিজমা নেই। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্যই এ পেশা। ব্যাংক থেকে কোনো ঋণ না পাওয়ায় বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) থেকে টাকা তুলে এ ব্যবসা শুরু করেছি। এখনও লক্ষাধিক টাকা দেনা আছি।আরএআর/পিআর