ব্যস্ত নগরজীবন, সংবাদপত্রের হেডলাইন আর প্রতিদিনের ছুটে চলা-সবকিছু ছেড়ে একসময় ভিন্ন এক জীবনের পথ বেছে নিলেন এক ফটো-সাংবাদিক। নাম তার আরিফুর রহমান। দীর্ঘদিন দেশের শীর্ষ গণমাধ্যমে কাজ করা এই মানুষটি একসময় প্রেমে পড়লেন প্রকৃতির।
গাছ-বাতাস-সমুদ্রের টানই তাকে ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে দেয় পেশাগত ব্যস্ততা থেকে। শেষে নতুন পথচলা শুরু হয় প্রকৃতির সান্নিধ্যে। পেশা ছেড়ে সৈকত ও প্রকৃতি রক্ষার ঝাড়ুদার হয়ে গেলেন তিনি। ফটো-সাংবাদিকতা থেকে প্রকৃতি রক্ষক- সমুদ্রসৈকতে ময়লা কুড়িয়ে, সচেতনতা ছড়িয়ে ভিন্নভাবে নিজের জীবনের গল্প লিখলেন। নতুনভাবে নিজেকে সাজানোর সেই গল্পকে সঙ্গে নিয়েই আজো পথ চলছেন।
বরগুনা সদর উপজেলার বাসিন্দা আরিফুর রহমান। বয়স চল্লিশ পেরিয়ে। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি দেশের প্রখ্যাত দৈনিক প্রথম আলো এবং দ্য ডেইলি স্টারসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ফটো-সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন। ক্যামেরা হাতে দেশের নানা প্রান্ত ঘুরে বেড়ানোই ছিল তার পেশা। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই পেশাগত ভ্রমণ তাকে অন্য এক উপলব্ধির সামনে দাঁড় করায় প্রকৃতির সৌন্দর্য যেমন অপার, তেমনি মানুষের অবহেলায় তা দ্রুত নষ্টও হয়ে যাচ্ছে। এই উপলব্ধিই একসময় তাকে বদলে দেয়।
ব্যস্ত জীবন থেকে প্রকৃতির কাছেদীর্ঘদিনের সাংবাদিকতার পেশা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না। তবু নিজের মনের টানকে গুরুত্ব দিয়েই নতুন এক পথ বেছে নেন তিনি। আরিফুর রহমান বলেন, ‘সাংবাদিকতা আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে-দেশের নানা প্রান্ত দেখার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু একটা সময় মনে হলো, আমি শুধু দেখছি আর ছবি তুলছি, অথচ প্রকৃতির জন্য কিছুই করছি না। তখন মনে হলো, প্রকৃতির কাছেই থাকা দরকার।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রকৃতিকে শুধু উপভোগ করলেই হবে না, তাকে রক্ষা করার দায়িত্বও আমাদের নিতে হবে। সেই চিন্তা থেকেই আমি নিজের জীবনযাত্রা বদলে ফেলেছি।’
এরপর থেকেই তিনি নিজেকে পরিচয় দেন একজন ‘পর্যটক’ হিসেবে। তার ভ্রমণের উদ্দেশ্য কেবল প্রকৃতিকে দেখা নয়, বরং তাকে রক্ষা করার ছোট ছোট উদ্যোগ নেওয়া।
গ্রাম থেকে প্রান্তিক জনপদে পদচারণাআরিফুর রহমানের ভ্রমণপথ নির্দিষ্ট নয়। কখনো তিনি হেঁটে যান কোনো প্রত্যন্ত গ্রামে, কখনো আবার সমুদ্রসৈকতের নির্জন অংশে। প্রকৃতির সৌন্দর্য খুঁজে বের করাই তার আনন্দ। সেই সঙ্গে তিনি খেয়াল রাখেন প্রকৃতি কোথায় কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভ্রমণের সময় তিনি শুধু ছবিই তোলেন না, মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। স্থানীয় মানুষকে বোঝান কীভাবে প্রকৃতি রক্ষা করা যায়। অনেক সময় শিশু-কিশোরদের সঙ্গেও কথা বলেন পরিবেশ সচেতনতা নিয়ে। তিনি বলেন, ‘প্রকৃতি আমাকে তৃপ্তি দেয়। সেই তৃপ্তির বদলে আমি যদি সামান্য কিছু করতে পারি- এটাই আমার আনন্দ।’
সৈকতে ময়লা কুড়িয়ে এক অনন্য উদ্যোগসমুদ্রসৈকত আরিফুর রহমানের বিশেষ প্রিয় জায়গা। সৈকতের বিস্তৃত বালুচর, ঢেউয়ের শব্দ আর প্রকৃতির মুক্ত পরিবেশ তাকে টানে বারবার। তবে সৈকতে এসে তিনি প্রায়ই একটি বিষয় দেখে কষ্ট পান-প্লাস্টিক ও বিভিন্ন ধরনের আবর্জনার স্তূপ। তাই সৈকতে হাঁটার সময় তিনি হাতে তুলে নেন একটি ব্যাগ। বালুচরে পড়ে থাকা প্লাস্টিক, খাবারের প্যাকেট কিংবা অন্যান্য আবর্জনা তিনি কুড়িয়ে নেন। বিশেষ করে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত এলাকায় তাকে প্রায়ই এই কাজে ব্যস্ত দেখা যায়। অনেক পর্যটক যখন সৈকতের সৌন্দর্য উপভোগে ব্যস্ত, তখন তিনি নীরবে সৈকত পরিষ্কার করার কাজে লেগে যান।
আরিফুর রহমান বলেন, ‘আমি কাউকে দোষ দিতে চাই না। কিন্তু আমরা যদি নিজেরাই যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলি, তাহলে প্রকৃতি কীভাবে সুন্দর থাকবে? তাই আমি মনে করি, অন্তত নিজের অংশটুকু দায়িত্ব নিয়ে কাজ করা দরকার।’
সৈকতে ময়লা কুড়িয়ে নেওয়ার পাশাপাশি আরিফুর রহমান মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করেন। তিনি পর্যটকদের সঙ্গে কথা বলেন, স্থানীয়দের বোঝান-প্রকৃতিকে পরিষ্কার রাখা কেন জরুরি। তার ভাষায়, ‘প্রকৃতিকে বাঁচাতে বড় কোনো আন্দোলনই সবসময় দরকার হয় না। ছোট ছোট কাজও অনেক বড় পরিবর্তন আনতে পারে। যদি প্রত্যেকে নিজের ময়লাটা নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলে, তাহলেই অনেক সমস্যা কমে যাবে।’ তিনি প্রায়ই স্থানীয় দোকানদার, জেলেদের সঙ্গে কথা বলেন। অনেককে অনুরোধ করেন সৈকতের পাশে ময়লার জন্য নির্দিষ্ট ডাস্টবিন রাখতে।
ভিন্ন জীবন, ভিন্ন তৃপ্তিফটো-সাংবাদিকতার ব্যস্ত জীবনের তুলনায় এখন তার জীবন অনেকটাই সাদামাটা। নির্দিষ্ট অফিস, নির্দিষ্ট সময়সূচি এসবের বাইরে এক মুক্ত জীবন কাটাচ্ছেন তিনি। কিন্তু এতে কোনো আক্ষেপ নেই তার। আরিফুর রহমান বলেন, ‘আগে হয়তো বড় বড় খবরের ছবি তুলতাম। এখন ছোট ছোট কাজ করি। কিন্তু এখন যে তৃপ্তি পাই, সেটা অন্যরকম।’ তার বিশ্বাস, প্রকৃতি রক্ষা করা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়, সাধারণ মানুষেরও দায়িত্ব রয়েছে।
অনুপ্রেরণা হয়ে উঠছেন অনেকের কাছেসৈকতে ময়লা কুড়িয়ে নেওয়া কিংবা মানুষকে সচেতন করার এই উদ্যোগ অনেক পর্যটকের কাছেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কেউ কেউ তার কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেরাও ময়লা তুলে ফেলেন বা অন্যদের সচেতন করার চেষ্টা করেন। পরিবেশ সচেতনতার এই ছোট উদ্যোগই ধীরে ধীরে বড় বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে।
প্রকৃতির জন্য নিবেদিত এক পথচলাব্যস্ত পেশাজীবন ছেড়ে প্রকৃতির কাছে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত খুব বেশি মানুষ নিতে পারেন না। কিন্তু আরিফুর রহমান সেই সাহস দেখিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, প্রকৃতিকে ভালোবাসা শুধু কথায় নয় কাজেও দেখানো যায়। তিনি বলেন, ‘প্রকৃতি আমাদের অনেক কিছু দেয়। আমরা যদি তাকে একটু যত্ন করি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এই সৌন্দর্য দেখতে পাবে।’
পরিবেশবিদ ও বিশিষ্টজনরা মনে করেন, একজন ফটো-সাংবাদিক থেকে প্রকৃতি সংরক্ষণের এক নীরব যোদ্ধায় পরিণত হয়েছেন আরিফুর রহমান। উপকূলীয় সেচ্ছাসেবী সংগঠন সোশ্যাল ডেভলপমেন্ট ওয়ারকার ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা স্বেচ্ছাসেবী সুমন শিকদার মনে করেন, এই পথচলা নিঃসন্দেহে ভিন্নধর্মী এবং অনুপ্রেরণাদায়ক। তার মতো মানুষদের ছোট ছোট উদ্যোগই হয়ত একদিন প্রকৃতিকে রক্ষা করার বড় আন্দোলনে রূপ নেবে।
আরও পড়ুনজলবায়ুর বিরূপ প্রভাব: ঋতুবৈচিত্র্যে ছন্দ পতনঘন ঘন ভূমিকম্প, হুমকির মুখে বিশ্ব প্রকৃতি
কেএসকে