আসন্ন ঈদুল ফিতরের টানা ছুটিকে সামনে রেখে অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে পর্যটকদের ব্যাপক সমাগমের প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। একপাশে পাহাড়, আরেক পাশে সাগর আর অন্যপাশে নদী বেষ্টিত উপজেলাটির ডজনখানে পর্যটন স্পট ইতোমধ্যে পর্যটকদের বরণে প্রস্তুত।
পাহাড় বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ঝরনার পানি। পাশেই আঁকাবাঁকা হ্রদ। কয়েক কিলোমিটার দূরে সমুদ্র সৈকত ঘেঁষে ছোটাছুটি করছে নৌকা। মাঝে মাঝে দেখা মিলবে মায়া হরিণ, শিয়াল, বন মোরগের। এমন সব দৃশ্যের দেখা মেলে মিরসরাইয়ে। ফলে মিরসরাইয়ে ভ্রমণে এসে খুব অল্প সময়েই মুগ্ধ হন পর্যটকেরা। মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে ব্যস্ততম ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। মহাসড়কের পূর্ব পাশে সারি সারি পাহাড়। আর সেখানেই রয়েছে ঝরনা ও হ্রদ। আর পশ্চিম দিকে সমুদ্রসৈকত। উত্তর পাশে বহমান নদী। সেখানে বসে উপভোগ করা যায় লাল কাঁকড়ার ছোটাছুটি, সাগরের গর্জন ও মাছ ধরার নৌকাসহ মনোরম নানা দৃশ্য।
এখানে রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃত্রিমে লেক মহামায়া, দেশের ৬ষ্ঠ সেচ প্রকল্প মুহুরী প্রজেক্ট, উপজেলার অলিনগরে অবস্থিত হিলসডেল মাল্টি ফার্ম ও মধুরিমা রিসোর্ট, করেরহাট ফরেস্ট ডাক বাংলো, আরশিনগর ফিউচার পার্ক, সোনাপাহাড় প্রকল্প, ডোমখালী সমুদ্র সৈকত, মিরসরাই শিল্পনগর সমুদ্র সৈকত, রূপসী ঝরনা, বাওয়াছড়া লেক ও হরিনাকুন্ড ঝরনা, রূপসী ঝরনা, সোনাইছড়ি ঝরনা, সোনাইছড়া ঝরনা, নাপিত্তাছড়া ঝরনা, বোয়ালিয়া ঝরনা, খৈয়াছড়া ঝরনা ও মেলখুম গিরিপথ।
আরশিনগর ফিউচার পার্কউপজেলার জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের সোনাপাহাড় এলাকায় প্রায় ২২ একর জায়গা জুড়ে ব্যক্তি উদ্যোগে আরশিনগর ফিউচার পার্ক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বিনোদনের জন্য নির্মিত আরশিনগর ফিউচার পার্কে আছে কৃত্রিম ঝরনা, বাগান, নাগর দোলা, স্পিডবোট, প্যাডেল বোটসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় রাইড, কার্টুন ও ভাস্কর্য, কিডস জোন, কাবাব ঘর, রেস্টুরেন্ট, কনভেনশন সেন্টার, বার-বি-কিউ এবং আলোকসজ্জার ব্যবস্থা।
শতাধিক বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষের ছায়া ঘেরা আরশিনগর ফিউচার পার্কে আগত অতিথিদের রাত্রিযাপনের জন্য রয়েছে ৫টি আধুনিক কটেজ এবং ২৪ ঘণ্টা সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এছাড়া পার্কের ভেতরে ২৫টি পিকনিক স্পট ছাড়াও বিয়ে এবং সেমিনারের জন্য ৫টি বড় হল রুম রয়েছে। আরশিনগর ফিউচার পার্কে সব ধরণের সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজনের সুব্যবস্থা রয়েছে। শিশুদের খেলার জন্য রয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক খেলার আইটেম।
শিল্পনগর সমুদ্র সৈকতপ্রথমে শিল্পনগরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দেখার পর এবার সবাই ছুটছেন সাগর ঘেঁষে নির্মাণ করা সুপার ডাইকে। এর পাশেই সমুদ্রসৈকত। জোয়ার-ভাটার খেলায় অপরূপ হয়ে ওঠে এই সৈকত।
২০১২ সালে সর্বপ্রথম মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ শুরু। এরপর বঙ্গপোসাগর ঘেঁষে নির্মাণ করা হয় সুপার ডাইক। সুরক্ষার জন্য ডাইকে বসানো হয়েছে হাজার হাজার ব্লক।
মূলত এরপর আবিষ্কার হয় সমুদ্রসৈকতের। বিশেষ করে বসুন্ধরা পয়েন্টে বেশি পর্যটক চোখে পড়ে। গত তিন বছর ধরে সেখানে ঘুরতে যাচ্ছেন হাজার হাজার পর্যটকরা।
সাহেরখালী ইউনিয়নের ডোমখালী থেকে গজারিয়া পর্যন্ত এতে বাঁধ ঘেঁষে জেগে ওঠা চর ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় বিশাল এলাকা এখন পর্যটন স্পটে পরিণত হয়েছে। প্রায় ৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দৃষ্টিনন্দন সাগরপাড়ে মানুষের আনাগোনা চোখে পড়ার মতো।
খৈয়াছড়া ঝরনার অপরূপ সৌন্দর্যপ্রকৃতির নান্দনিক তুলিতে আঁকা সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হচ্ছে দেশের ভ্রমণ পিয়াসী মানুষ। অনেকে রাতের বেলায় চাঁদের আলোয় ঝরনার অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পাহাড়ের পাদদেশে তাবু টাঙ্গিয়ে অবস্থান করছে।
প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি সেতুবন্ধন করে, সবুজের চাদরে ঢাকা বনানী রূপের আগুন ঝরায়, যেখানে প্রকৃতি খেলা করে আপন মনে, ঝুম ঝুম শব্দে বয়ে চলা ঝরনা ধারায় গা ভিজিয়ে মানুষ যান্ত্রিক জীবনের অবসাদ থেকে নিজেকে ধুয়ে সজীব করে তুলছে খৈয়াছরা ঝরনায়।
হিলসডেল মাল্টি ফার্ম ও মধুরিমা রিসোর্টমিরসরাই উপজেলার করেরহাট ইউনিয়নের অলিনগর এলাকায় হিলসডেল মাল্টি ফার্ম ও মধুরিমা রিসোর্টে এ দৃষ্টিনন্দন হরিণের খামারটি রয়েছে। রয়েছে নানা প্রজাতির ফুল ও ফল গাছ। হরিণের খামার ঘিরে গড়ে উঠেছে পর্যটনকেন্দ্র। উপজেলার করেরহাট ইউনিয়নে ৩৫ একর জায়গায় প্রায় চল্লিশ হাজার নানা প্রজাতির গাছ দিয়ে সাজানো এই খামার। শুধু হরিণ নয়, নানা প্রজাতির গাছ দিয়ে সাজানো এই খামারে রয়েছে হরেক রকমের পাখি আর জীবজন্তু।
সূর্যের দেখা মেলে মুহুরীর চরেপ্রকৃতির আরেক নাম মুহুরী। যেখানে আছে আলো-আঁধারির খেলা। আছে জীবন-জীবিকার নানা চিত্র। মুহুরীর চর, যেন মিরসরাইয়ের ভেতর আরেক মিরসরাই। অন্তহীন চরে ছোট ছোট প্রকল্প।
এপারে মিরসরাই, ওপারে সোনাগাজী। ৪০ দরজার রেগুলেটরের শোঁ শোঁ আওয়াজ শোনা যায় দূর থেকে। পশ্চিমে মৎস্য আহরণের খেলা, আর পূর্বে মন কাড়ানিয়া প্রকৃতি। নুয়ে পড়া মনোবল জেগে উঠবে পূর্বের জেগে ওঠা চরে। ডিঙি নৌকায় ভর করে কিছুদূর যেতেই দেখা মিলবে সাদা সাদা বক।
এখানে ভিড় করে সুদূরের বিদেশি পাখি, অতিথি পাখি বলেই অত্যধিক পরিচিত এরা। চিকচিকে বালিতে জল আর রোদের খেলা চলে সারাক্ষণ। সামনে পেছনে, ডানে-বামে কেবল সৌন্দর্য আর সুন্দরের ছড়াছড়ি।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ মহামায়াদেশের দ্বিতীয় কৃত্রিম হ্রদ মহামায়া অবস্থিত এখানে। উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের ঠাকুরদীঘি বাজার থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরত্বে পাহাড়ের কোলে ১১ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে এ লেক। এর টলটলে পানি আর পাহাড়ের মিতালি ছাড়াও এখানে রয়েছে পাহাড়ি গুহা, রাবার ড্যাম ও অনিন্দ্য সুন্দর ঝরনা।
বোটে চড়ে লেকে ঘুরে বেড়ানোর পাশাপাশি পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা শীতল ঝরনার পানিতে ভিজে শরীর ও মনকে প্রশান্তি দেওয়া যায় এখানে। মহামায়া লেকে রয়েছে কায়াকিংয়ের সুবিধা। এছাড়া রয়েছে রাতে তাঁবু করে ক্যাম্পিংয়ের সুবিধাও। এখানে থাকার জন্য রয়েছে উন্নতমানের হান্ডি আবাসিক হোটেল । রয়েছে খাবার রেষ্টুরেন্টও।
মহামায়া ইকোপার্কের দায়িত্বে থাকা ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার তসলিম উদ্দিন তৌহিদ জানান, ঈদে পর্যটকদের ঘিরে মহামায়া প্রস্তুত রয়েছে। আশা করছি প্রতি বছরের মত এবারও ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের ভিড় হবে।
এম মাঈন উদ্দিন/এনএইচআর/এমএস