নিজেদের কোনো আবাদি জমি ছিল না। বাবার একমাত্র আয় দিয়েই চলতো আট সদস্যের সংসার। অভাব যেন নিত্যসঙ্গী এই পরিবারের। অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করে দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের জোগাড় করতে বাবা হিমশিম খেতেন। তাই লেখাপড়া বাদ দিয়ে আমাকেও রোজগারে নামতে হয়। শুরু হয় জীবন সংগ্রাম। পরিশ্রম করলে সফলতা আসবেই- এ কথাটি বেশ আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গেই বললেন, যশোর সদরের চাঁচড়া গ্রামের সফল মৎস্য চাষি নুরুল ইসলাম বাবু। নিষ্ঠা, সততা ও পরিশ্রমের ফলে অল্প সময়ের মধ্যে তিনি তেলাপিয়া চাষ করে জিরো থেকে হিরো হয়েছেন। অর্জন করেছেন অভাবনীয় সাফল্য। তেলাপিয়া মাছ উৎপাদনে সফলতা স্বীকৃতিস্বরূপ তার শাহ আলী মৎস্য খামার পেয়েছে জাতীয় পুরস্কার ও সনদ। এ বছর তার নিট আয় এক কোটি ১৬ লাখ টাকা। ব্যবসায়িকভাবে তিনি এখন চাঁচড়ার বড় মাছ চাষিদের মধ্যে একজন।জীবন সংগ্রামের বর্ণনা দিতে গিয়ে অতীতে ফিরে যান নুরুল ইসলাম বাবু। বলেন, প্রায় ২০ বছর আগের কথা। নিজেদের কোনো আবাদি জমি ছিল না। বাবা মোহাম্মদ আলীর আয়ে চলে আমাদের আট সদস্যের সংসার। অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। এজন্য লেখাপড়া করতে পারিনি। তবে সাহস আমাদের দমাতে পারেনি। ১৯৯৭ সালের দিকে বাবার সঙ্গে মাছ চাষে নেমে পড়ি। নুরুল ইসলাম বলেন, আমরা ছয় ভাইবোন। নিজেদের কোনো জমি না থাকায় অন্যের পুকুর লিজ নিয়ে বাবা মাছ চাষ করতাম। আমি ছিলাম ভাইবোনদের মধ্যে বড়। বাবার একমাত্র আয়ে সংসার চলে না। তাই অষ্টম শ্রেণির পর আর লেখাপড়া করা হয়নি। লেখাপড়া ছেড়ে বাবার সঙ্গে মৎস্য খামারে কাজ শুরু করি। মাছ চাষে সফলতাও আসে আমাদের। সংসারের অভাব কিছুটা লাঘব হতে শুরু করে। নিজের সংগ্রামী জীবনের কথা তুলে ধরে নুরুল ইসলাম বলেন, ২০০০ সাল আমার কাছে ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় পারিবারিকভাবে আমাকে বিয়ে দেয়া হয়। নতুন সংসার। নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। বাবার সঙ্গে পরামর্শ করে এক বিঘার একটি পুকুর লিজ নেই। তখন বাবার কাছ থেকে পুঁজি হিসেবে ১০ হাজার টাকা নেই। ১০ হাজার টাকা আমার ভাগ্য খুলে দিয়েছে। নিজের ভাগ্য বদলের কথা উল্লেখ করে নুরুল ইসলাম বলেন, প্রথম বছর তেলাপিয়া চাষ করি। এতে তিন লাখ টাকা লাভ হয়। এরপর ২০০৫ সালে আরও দুটি পুকুর লিজ নেই। বর্তমানে আমার ‘শাহ আলী মৎস্য খামার’র আয়তন আরও বাড়িয়েছি। গত বছর ১০০ বিঘা আয়তনের ৯টি পুকুরে তেলাপিয়া চাষ করেছি। এতে আমার লাভ হয়েছে প্রায় ৫০ লাখ টাকা। চলতি বছর আশা করছি আমার আয় কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। তিনি বলেন, কঠোর পরিশ্রম আর অদম্যতা আমার জীবন পাল্টে দিয়েছে। এক সময় দারিদ্র্যের ছাপ থাকা ঘর পরিবর্তন করে নির্মাণ করেছি বহুতল ভবন। যেখানে শোভা পাচ্ছে দামি আসবাবপত্র। দুই ছেলেমেয়েকে স্কুলে লেখাপড়া করাচ্ছি। তোলাপিয়া মাছ চাষে সফলতা অর্জন করায় ‘জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ-২০১৫’ উপলক্ষে আমাকে সম্মাননা ও পুরস্কার দেয়া হয়েছে। আর কী চাই। এটাই আমার সফলতা।সরেজমিনে নুরুল ইসলামের তেলাপিয়া খামারে গিয়ে দেখা যায়, তার খামারে ছয়জন নারী-পুরুষ কাজ করছেন। এছাড়া অনিয়মিত আরও ১৩-১৫ শ্রমিক কাজ করেন। সব মিলে শাহ আলী মৎস্য খামারে ২০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। তার সফলতা দেখে নূর আলম, মিন্টুসহ অনেক বেকার যুবক তেলাপিয়া মাছ চাষ শুরু করেছেন।যশোর জেলা মৎস্য অফিসের সিনিয়র সহকারী পরিচালক আক্তার উদ্দীন বলেন, যশোর জেলায় প্রতি বছর দুই লাখ পাঁচ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হচ্ছে। এর মধ্যে শুধু তেলাপিয়াই রয়েছে ১৮ হাজার ২৭৪ মেট্রিক টন। জেলায় তেলাপিয়ার উৎপাদন ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের অন্যান্য জেলার তেলাপিয়া উৎপাদন হলেও গুণগত মানের দিক থেকে যশোরের মাছের চাহিদা বেশি। যে কারণে দিন দিন এ মাছের চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এসব মাছ চাষ করে অনেকেই ভাগ্য বদল করেছেন।মিলন রহমান/এএম/আরআইপি