দিনাজপুর শহরে পাতার হাটে পাতা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে সুবিধাবঞ্চিত ১৬টি নারী পরিবার। পাতার এই হাটটি গড়ে উঠেছে দিনাজপুর শহরের বাহাদুরবাজার টিঅ্যান্ডটি সড়কে। যে সড়ক দিয়ে হাঁটলে কানে ভেসে আসবে নারী কণ্ঠে ‘পাতা লাগে পাতা’। চারপাশ থেকে ডাকাডাকি ‘নেন ভাই পাতা নেন, আমারটা নেন, দাম কম।’ ছাগলের সবচেয়ে উৎকৃষ্ঠ ও প্রিয় খাবার কাঁঠাল পাতা। শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে ছাগল পালনকারীরা এসে এই কাঁঠাল পাতা কিনে নিয়ে যায়। তারাই এই পাতার বাজারের নাম দিয়েছে পাতার হাট। এই হাটের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো রোদ, বৃষ্টি, ঝড়সহ প্রাকৃতিক যত দুর্যোগই আসুক না কেন, পাতার বাজার বসবেই। আর এই পাতা বিক্রি করে সুবিধাবঞ্চিত ১৬ নারী। সকাল থেকে শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত চলে এ পাতার হাট। পাতা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই পাতার হাটে যারা পাতা বেচাকেনা করে তাদের সিংহভাগই নারী। তারা কোনো না কোনোভাবে সমাজে বঞ্চিত কিংবা স্বামী নির্যাতনের শিকার। তাদের সর্বনিম্ন পুঁজি ৩০০ টাকা আর সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা। কবে থেকে এই পাতার বাজার শুরু হয়েছিল, আর কবে থেকে এই সুবিধাবঞ্চিত নারীরা এ হাটে পাতা বিক্রি করছে সে বিষয়ে স্থানীয়দের সুনির্দিষ্ট কোনো ধারণা নেই। তবে পাতা বিক্রেতা ৫০ বছর বয়সী নারী মহসিনা জানালেন নানা তথ্য। এখানে পাতা বিক্রির সঙ্গে সংযুক্ত আছেন ১৬ জনের মতো নারী। এরা প্রায় সবাই এই ব্যবসা করছে ২২-২৫ বছর ধরে। তারও পূর্বে তারা পাতা বিক্রি করতো স্বল্প পরিসরে। মহসিনা জানান, তিনি প্রতি আঁটি পাতা বিক্রি করেন ১০থেকে ২০ টাকায়, যা লাভ হয় তা দিয়েই চলে তার পাঁচজনের সংসার। কেমন লাভ হয়? মহসিনার উত্তর ‘দাদা কহনো লাভ, কহনো আবার লচ। আল্লা চালায় নেয়।’ মহসিনার বাড়ি পঞ্চগড়ে। মেয়ের সুখের জন্য বাবা-মা মহসিনাকে বিয়ে দেন স্থানীয় খুরশেদের সঙ্গে। বিয়ের পরই বাবা মায়ের স্বপ্ন রূপ নেয় দুঃস্বপ্নে। জুয়াড়ি স্বামীর অত্যাচার থেকে রক্ষা পেতে ছেলেমেয়ে নিয়ে মহসিনা চলে আসেন দিনাজপুরে। শুরু করেন পাতার ব্যবসা। সেই থেকেই মহসিনার বেঁচে থাকার সংগ্রাম চলছে। পিছনের কথা এখন আর মনে করতে চান না মহসিনা। পাতার ব্যবসার সঙ্গে সঙ্গেই বদলে যায় তার জীবনের পাতাটিও। পাতার বাজারে রাশেদা দুটি পাতার আঁটি বেঁধে দিচ্ছেন এক ক্রেতার সাইকেলের সামনে। কথা হয় তার সঙ্গে। লাভের কথা জানতে চাইলে উত্তরে বলেন, ‘ছাওয়াল-পাওয়াল নিয়ে বাঁচতে পারি।’ রাশেদার বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দায়। ১০ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়। বাবার মৃত্যুর পরে স্বামী সালামের হাত ধরে চলে আসেন দিনাজপুরে। কোনো কাজ না পেয়ে মাত্র ৩০০ টাকা পুঁজিতে শুরু করেন পাতার ব্যবসা। পাতা ব্যবসায়ী করিমন জানান, গ্রাম থেকে একটি গাছের সমস্ত পাতা কিনে নিয়ে তারা বাজারে বিক্রি করেন। গাছপ্রতি তাদের কখনো ৩০০ আবার কখনো ৫০০ টাকা লাভ হয়। তিনি জানান, গ্রামের যেসব গাছ কাঠ হিসেবে বিক্রি করা হয় কেবল সেই গাছের পাতাই কিনেন তারা। তাছাড়া কখনো ঝড়ে গাছের ডাল ভেঙে পড়লে সেগুলো কুড়িয়ে বাজারে বিক্রি করেন। তিনি জানান, পাতা বিক্রির কাজ করেই তার পরিবারের চার সদস্য খেয়ে-পড়ে বেঁচে আছে। এ যেন অনেক অন্ধকারের মধ্যে একটু আলো। পাতা কিনতে আসা দিনাজপুরের রামনগর এলাকার মোকলেস জানান, শহরে ছাগলের খাওয়ার জন্য কোথাও কোনো ঘাস কিংবা পাতা পাওয়া যায় না। এ বাজার থাকায় তাদের কিছুটা সুবিধা হয়েছে। আর কাঁঠাল পাতা ছাগলের প্রিয় খাবার। পাতা বিক্রেতা এই নারীরা জানান, এই বাজারে কোনো প্রকার স্থান ভাড়া দিতে না হলেও এলাকার কিছু মাদকসেবী যুবক এসে ওইসব পাতা ব্যবসায়ীকে মাঝে মধ্যেই সমস্যা করেন। এমএএস/জেআইএম