সাভারের রানা প্লাজা ধসের দুই বছর পূর্ণ হচ্ছে ২৪ এপ্রিল। রানা প্লাজা ধসে নিহত আর নিখোঁজ হয়েছিলেন জামালপুর সদরের শাহবাজপুর ইউনিয়নের ১১ জন দরিদ্র শ্রমিক। দুই বছর পার হলেও এখনো স্বাভাবিক হতে পারেননি সেসব নিখোঁজ আর নিহতদের পরিবারের মানুষগুলো। তাদের অনেকেরই দাবি টাকা-পয়সা নয়, চাই আমাদের সন্তানের লাশ।স্বজনহারা এই পরিবারগুলোর দিন কাটছে অভাব, কান্না আর হতাশায়। গেলো দুই বছরে কয়েকটি পরিবার কিছু ক্ষতিপূরণ পেলেও সব হারানো অনেক পরিবারের কাছে এখনো পৌঁছেনি ক্ষতিপূরণের অর্থ। সংসারে একটু স্বচ্ছলতা আনতে জামালপুর সদরের শাহবাজপুর ইউনিয়নের সাউনিয়া গ্রামের বৃদ্ধ তোফাজ্জল হোসেন আর মর্জিনা বেগমের একমাত্র সন্তান রিপন চাকরি নিয়েছিলেন সাভারের রানা প্লাজার একটি গার্মেন্টে। রানা প্লাজা ধসের পর থেকে নিখোঁজ একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে রিপনের বাবা-মা পড়েছেন অথৈ পাথারে। শোকের জগদ্দল পাথর আর নিত্য অভাবে তাদের এমনিতেই দিশেহারা অবস্থা। তার উপর দুই বছর কেটে গেলেও আজও মেলেনি একমাত্র সন্তানের লাশ। ছেলের কবরের পাশে একটু দোয়া করবেন সেই সান্তনাও নেই তাদের। সব হারানো এই পরিবারটি পায়নি ঘোষিত ক্ষতিপূরণের একটি টাকাও। এখন তাদের একটাই দাবি টাকা-পয়সা চাই না, আমাদের একমাত্র সন্তানের লাশ দিন। বাড়ির পাশে কবর দিয়ে সেই কবর দেখেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেব। একই অবস্থা নুরুন্নাহার বেগমের। অভিশপ্ত রানা প্লাজা ট্রাজেডিতে তিনি হারিয়েছেন একমাত্র মেয়ে নুসরাত জাহান রুনাকে। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও রুনার লাশ মেলেনি, তাই মেলেনি ক্ষতিপূরণের একটি টাকাও। একমাত্র মেয়ে নানজীবা নওরীন নাওফি আর ছোট ভাইয়ের ভরণ-পোষণ ছাড়াও সংসারের খরচ চালিয়ে আসছিলেন রুনা। সংসারের উপার্জনক্ষম মেয়ে রুনাকে হারিয়ে নুরুন্নাহার বেগমের সামনে এখন শুধুই অন্ধকার। কি করে মানুষ করবেন রুনার রেখে যাওয়া একমাত্র মেয়েকে। আর কিভাবেই বা চালাবেন তার সংসার। আর সারাদিন মাতৃহীন নাতি নাওফির মুখে মার কথা শুনে নুরুন্নাহার আচলে মুখ লুকিয়ে শুধুই চোখের পানি ফেলেন। একই ঘরের নিখোঁজ রুনার দাদী তাম্বিয়া বেওয়া হারিয়েছেন নাতি রুনা ছাড়াও ছেলে শহিদুল্লাহকে। ছেলের লাশ ফিরে পেলেও পাননি নাতনি রুনার লাশ। ছেলের লাশ ফিরে পেয়ে বাড়ির পাশে কবর দিলেও নিহত শহিদুল্লাহর রেখে যাওয়া একমাত্র ছেলেটি সবার মধ্যে খুঁজে ফেরে তার বাবাকে। নুরুন্নাহার বেগম জানান, দুই বছর হয়ে গেল মেয়ের লাশটিও পাইনি, তাই ক্ষতিপূরণের টাকাও মেলেনি। এখন নাতনিকে কিভাবে মানুষ করবেন আর কিভাবেই বা চালাবেন তার ভরণ-পোষণ? রানা প্লাজা ধসের পর সরকারসহ বিভিন্ন সংগঠন অনেক অনুদান দেয়ার আশ্বাস দিলেও, কেউ কথা রাখেনি। সরকার নিহত শ্রমিকের সন্তানদের ভরণ-পোষণ ছাড়াও লেখাপড়ার খরচ চালানোর কথা বললেও, তারা একটিবারের জন্যও তাদের খোঁজ নেয়নি বলে অভিযোগ তার।এদিকে ঝইড়াপাড়া গ্রামের গার্মেন্ট কর্মী শাহিদা, বিয়ারা গ্রামের শেফালী আর সাউনিয়া গ্রামের একই পরিবারের খোকন, হালিমা আর আনিসের লাশ মিলেছে, মিলেছে ক্ষতিপূরণের সামান্য টাকাও। কিন্ত, উপার্জনক্ষম প্রিয় মানুষগুলোকে হারানো এসব পরিবারের কেউই ভালো নেই। শাহিদার মা মেয়ের নামে ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়েছেন ঠিকই তবুও মেয়ে হারানোর শোক খুঁজে ফেরে তাকে। আর বিয়ারা গ্রামের শেফালীর লাশ ১৮ দিন পর বাড়িতে ফিরলেও দুই বছরেও মেলেনি ক্ষতিপূরণের একটি টাকাও। রানা প্লাজার অভিশপ্ত ধসে মার স্নেহ, আদর বঞ্চিত শেফালীর মেয়ে ভাবনা আর সোহাগের দু’চোখ খুঁজে ফেরে তার মাকে। তাই ভাঙা সংসার আর অবুঝ দুটি শিশু নিয়ে শেফালীর মা বানেছা বেওয়ার দিন কাটছে এখন নিত্য অভাব, কান্না আর ভয়াবহ শূণ্যতায়। আর ছেলে খোকন, মেয়ে হালিমা এবং মেয়ে জামাই আনিসকে হারানো সাউনিয়া গ্রামের আলিম উদ্দিন আর তার স্ত্রী তরুজা বেগমের দিন কাটছে এখন বুক ফাঁটা কান্না আর হাহাকারে। অভিশপ্ত রানা প্লাজা একমাত্র ছেলে আর মেয়েকে কেড়ে নেয়ায় এখন তারা নিঃসন্তান হয়ে গেছেন। খোকন আর হালিমার বাবা আলিম উদ্দিন একরাশ হতাশা আর ক্ষোভ নিয়ে জাগো নিউজকে বলেন, ছেলে-মেয়ে আর মেয়ের জামাই রানা প্লাজা ভাইঙ্গা মইরা গেছে, তাদের ঘরে কোনো সন্তানাদিও নাই। আমরা বুড়াবুড়ি যদি ঘরে অসুক হইয়া মইরাও যাই আমাগো মুখে পানি কিংবা কবরে লাশ নামানির লোকও নাই। এছাড়াও আগুলাই গ্রামের বৃদ্ধা হাজেরা বেওয়া অভিশপ্ত রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিতে হারিয়েছেন নাতনি হেলেনা আর নাতবৌ সুলতানা পারভীনকে। ক্ষতিপূরণের যে সামান্য টাকা পেয়েছিলেন তা ফুরিয়েছে অনেক আগেই। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও বৃদ্ধা হাজেরা বেওয়ার খোঁজ নেননি কেউ। এ ব্যাপারে জামালপুরের জেলা প্রশাসক মো. শাহাবুদ্দিন খান জানান, রানা প্লাজা ধসে যারা আহত এবং নিহত হয়েছেন তারা সবাই আর্থিক ক্ষতিপূরণসহ অন্যান্য সহযোগিতা পেয়েছেন। তারপরও যদি কেউ ক্ষতিপূরণ না পেয়ে থাকেন তবে তাদের ব্যাপারে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়া হবে।রানা প্লাজা ধসের দুই বছর অতিক্রান্ত হলেও জামালপুরের নিহত আর নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিবারের দিন কাটছে অভাব, বুকফাঁটা কান্না আর হতাশায়। গেলো দুই বছরে একটিবারের জন্যও সব হারানো এইসব পরিবারের খোঁজ নেয়নি কেউ। এখনো অনেক পরিবারের কাছে পৌঁছেনি তাদের ক্ষতিপূরণের টাকা। আর নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিবারের দাবি ক্ষতিপূরণের টাকা নয়, অন্তত সন্তানের লাশটা যেন সরকার ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করে। এমজেড/এমএএস/আরআইপি