দেশজুড়ে

রশিদ নিলে ৮০ রশিদ ছাড়া ৫০!

রশিদ নিলে ৮০ আর রশিদ না নিলে ৫০ টাকা! এমনি ঘোঘণা দিয়ে প্যাথলজি টেস্ট করাচ্ছেন টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সের প্যাথলজিস্ট মোছা. লিপি খাতুন।

ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছেন ওই ব্যক্তি নিজেই। এ কাজ তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন কয়েক বছর ধরে। অন্যদিকে কর্তৃপক্ষ লিপি খাতুনের দুর্নীতি-অনিয়মের কথা জানলেও নিশ্চুপ রয়েছেন অজানা কারণে।

স্থানীয় বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হোসনে আরা তার আত্মীয়কে ডায়াবেটিক পরীক্ষার জন্য বুধবার নিয়ে যান ভূঞাপুর স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে। এ সময় হাসপাতালের প্যাথলজিস্ট বিভাগের সামনে লম্বা লাইন দেখতে পান। দেখেন দায়িত্বরত প্যাথলজিস্ট রশিদ নিলে টাকা বেশি এবং রশিদ না নিলে টাকা কম এমন কথা বলে রশিদ ছাড়াই কম টাকায় প্যাথলজিকাল টেস্ট করিয়ে দিচ্ছেন।

এ বিষয়ে তার সন্দেহ হলে তিনি লিপি খাতুনের কর্মকাণ্ড প্রমাণের সিদ্ধান্ত নেন। এর প্রমাণেই তিনি লিপি খাতুন মাধ্যমে জানতে পারেন রশিদ নিলে ৮০ টাকা এবং রশিদ ছাড়া পরীক্ষা করালে ৬০ টাকা লাগবে । পরে ওই শিক্ষিকা রশিদ ছাড়া ৫০ টাকায় ডায়াবেটিক পরীক্ষা করান।

এছাড়া ভূঞাপুর হাসপাতালটিতে সঠিক তদারকি না থাকার অভিযোগ তুলে সাধারণ রোগীরা জানান, তাদের কাছ থেকে অনিয়মের মাধ্যমে হাসপাতালের একটি সিন্ডিকেট প্রতিদিন নানাভাবে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। হাসপাতালটিতে সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনরা।

হাসপাতালে ডায়াবেটিক পরীক্ষার জন্য আসা হালিমা বেগম বলেন, বুধবার সকালে হাসপাতালে ডায়াবেটিক পরীক্ষার জন্য আসি। এ সময় হাসপাতালের প্যাথলজিস্ট লিপি খাতুন জানান রশিদ ছাড়া করালে ৫০ টাকা এবং রশিদ নিয়ে করালে ৮০ টাকা।

পরে তিনি রশিদ ছাড়াই ৫০ দিয়ে ডায়াবেটিক পরীক্ষা করান। জোবেদা বেগম নামের আরেকজন হাসপাতালে ডায়াবেটিক পরীক্ষার জন্য রশিদ ছাড়াই ৬০ টাকা নেয়া হয়েছে বলে জানান।

একই সময়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উপস্থিতিতে সবুজ (৭) নামের আরেক রোগীর স্বজনরা বলেন, শিশুটির রক্ত ও অন্যান্য টেস্ট বাবদ ২৫০ টাকা নিলেও কোনো ধরনের রশিদ দেয়া হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা, কর্মচারী ও রোগীর অভিযোগ, লিপি খাতুনের এসব দুর্নীতি ওপেন সিক্রেট। একাধিক প্যাথলজিস্ট না থাকার সুযোগে লিপির এমন কর্মকাণ্ডে মুখ বুজে সহ্য করতে হচ্ছে। আর এ সুযোগ নিয়ে লিপি সরকারি কোষাগারে টাকা জমা না দিয়ে নিজেই আত্মসাৎ করছেন।

এ সময় হাসপাতালটির আবাসিক চিকিৎসক ডা. জাহিদুজ্জামান জুয়েল রোগীদের এমন অভিযোগ ও হাসপাতালে আসা এরকম একাধিক রোগীর কাছ থেকে রশিদ ছাড়া প্যাথলজি পরীক্ষার টাকা গ্রহণের সত্যতা পান।

প্যাথলজি পরীক্ষা করতে আসা কায়সার হোসেন বলেন, রক্ত, প্রসাবসহ কয়েকটি পরীক্ষা করিয়েছি হাসপাতালে। পরীক্ষার টেস্ট বাবদ প্রথমে ২৭০ টাকা নিয়েছেন লিপি খাতুন। টেস্টের রিপোর্ট দেয়ার সময় আরও ২৫ টাকা দিয়েছেন। তবে তিনি রিপোর্টের সঙ্গে কোনো ধরনের রশিদ পাননি।

এছাড়া হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের পরীক্ষার টেস্ট না করিয়েই রিপোর্ট প্রদান করার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। এতে ভুল চিকিৎসায় রোগীরা প্রতিনিয়তই বিপদের সম্মুখীন হচ্ছেন। এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে গত মাসের ৬ তারিখে।

মালেকা (৭০) নামের একজন বৃদ্ধা মহিলার কোনো টেস্ট না করিয়েই রিপোর্ট প্রদান করা হয়। এতে তার অবস্থা অবনতি হলে পরে তাকে ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্টের সিএমএইচে ভর্তি করানো হয়।

এ প্রসঙ্গে ভূঞাপুর মডেল পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা হোসনে আরা বলেন, অনিয়মের বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ার জন্য রশিদ ছাড়াই ৫০ টাকায় ডায়াবেটিক পরীক্ষা টেস্ট করানো হয়। হাসপাতালে আসা অনেক রোগীই টাকার রশিদ ছাড়া টেস্টের রিপোর্ট নিয়ে গেছে। পরে নিজের দায়িত্ববোধ থেকেই সাংবাদিকদের হাসপাতালের অনিয়মের বিষয়টি জানাই।

অভিযোগ অস্বীকার করে ভূঞাপুর স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সের প্যাথলজিস্ট লিপি খাতুন কৌশলে বলেন, হাসাপাতালে আসা রোগীদের পরীক্ষার টেস্ট করানোর পর রিপোর্টের সঙ্গে রশিদ দিয়ে দেয়া হয়। তবে ওই রোগীদের রেজিস্ট্রার এন্টিসহ রিপোর্টের সঙ্গে রশিদ বিষয়টি প্রমাণ করতে পারেননি তিনি।

এ বিষয়ে ভূঞাপুর থানা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আবু সামা বলেন, স্থানীয় রোগীদের অভিযোগ ও আবাসিক চিকিৎসকের মাধ্যমেই অনিয়মের এই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হলাম। তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।

আরিফ উর রহমান টগর/এএম/আরআইপি