পঞ্চগড়ের বিভিন্ন বোরোখেতে গলা পচা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ধানখেতে নেক ব্লাস্ট রোগ ছড়িয়ে পড়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।
বিশেষ করে বোদা উপজেলায় রোগের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এক খেত থেকে অন্য খেতে। কৃষি বিভাগের পরামর্শে কীটনাশক প্রয়োগেও কাজ হচ্ছে না।
কৃষকদের দাবি, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) সরকারি বীজ কিনেই তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আর কৃষি বিভাগ বলছে, সংক্রামণ সামান্য এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
কষ্টে আবাদ করা বিস্তীর্ণ বোরোখেতে ধানের শীষ শুকিয়ে সাদা হয়ে যাচ্ছে। বছরের বড় এই আবাদে সম্ভাব্য লোকসানের আশঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বোরো চাষিরা।
রোববার বিকেলে সরেজমিনে বোদা উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের বোরোখেতে ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন এলাকার খেতে ধান গাছ ভালো হয়েছে। ফলনও হয়েছে ভালো। তবে ধান গাছের শীষ বড় হতে না হতেই শীষের গোড়া বেঁকে পচে শুকিয়ে যাচ্ছে।
পাতা বাদে ধানের শীষ সাদা হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ময়দানদীঘি ইউনিয়নের কোয়ারীমিল এলাকার কয়েকশ একর বোরো খেত নেক ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়েছে।
এ রোগের প্রাদুর্ভাব এক খেত থেকে অন্য খেতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। রোগের প্রকোপ ঠেকাতে কৃষকরা হরেক রকম কীটনাশক প্রয়োগ করছেন। কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী তদারকি করছেন তারা। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। এ নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বোরো চাষিরা। পাশের উপজেলা দেবীগঞ্জের কিছু এলাকার বোরো খেতের একই অবস্থা বলে জানা গেছে। এতে প্রাথমিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন কয়েকশ কৃষক।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, ১ লাখ ৩৭ হাজার ৯৩৮ মেট্রিক টন বোরো ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় ৩০ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
তবে লক্ষ্যমাত্রার অতিরিক্ত ৪০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়। কৃষি বিভাগের দাবি বৈরি আবহাওয়া, জমিতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ বৃদ্ধি ও বীজের সমস্যার কারণে সাধারণত এমন রোগের আশঙ্কা থাকে। তাদের তদারকি আর পরামর্শে প্রয়োজনীয় কীটনাশক ব্যবহার করে স্বল্প পরিসরেই রোগটি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি করেছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
বোদা উপজেলার ময়দানদীঘি ইউনয়িনের কোয়ারীমিল এলাকার বোরো চাষি মো. ইসলাম বলেন, বিঘা প্রতি ৫ মণ করে ধান প্রদানের শর্তে অন্যের ৬ বিঘা জমি চুক্তি নিয়ে বোরো চাষ করি। ভালো উৎপাদনের আশায় পঞ্চগড় বিএডিসি অফিস থেকে প্যাকেট করা সরকারি বীজ নিয়েছিলাম। কিন্তু ধান ফোটার আগেই পুরো খেতের ধানের শীষ শুকিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, বীজ নেয়ার সময় অফিস থেকে রশিদ চেয়েছি। কিন্তু তারা দেননি। খারাপ বীজের জন্যই এমনটা হয়েছে।
একই এলাকার বোরো চাষি যাদব চন্দ্র শর্মা বলেন, আমি সাড়ে ৮ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছি। এখন পুরো ধান খেতে রোগে আক্রান্ত। সন্ধ্যায় রেখে যাই এক রকম আর সকালে এসে দেখি খেত আরেক রকম হয়ে গেছে।
ধানের শীষ শুকিয়ে যাচ্ছে। ভালো ধানের আশায় কীটনাষকসহ সেচ দিয়েই চলেছি। ধার দেনা করে আবাদ করে এখন কি হবে কিছুই বুঝতে পারছি না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. শামছুল হক বলেন, ব্লাস্ট একটি ছত্রাক জনিত ও বীজবাহিত রোগ। এটি কোনো বীজে থাকলে পরবর্তীতে তা জমিতে আসতে পারে। এছাড়া আকাশ মেঘলা এবং গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হলেও এই রোগের সংক্রামণ দেখা দিতে পারে।
কিছু দিন ধরে দিনে রোদ আর রাতে ঠান্ডার কারণে এবং মাঝে মাঝে মেঘলা আকাশের সঙ্গে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির কারণে কিছু এলাকায় ব্লাস্ট রোগ দেখা দিয়েছে। তবে এই রোগ শুধু বোদা উপজেলা কয়েকটি খেতে দেখা দিয়েছে এবং স্বল্প পরিসরেই আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছি। এক খেত থেকে আর অন্য খেতে এটি ছড়ায় না।
তবে বীজের সমস্যার কথা অস্বীকার করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) পঞ্চগড় বীজ বিপনন কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল হাই বলেন, এবার সারা দেশেই বোরো ধানে ব্লাস্টের আক্রমণ দেখা দিয়েছে। ব্লাস্ট এক প্রকার বীজবাহিত রোগ হলেও এবার বৈরি আবহাওয়ায় এই রোগের প্রার্দুভাব দেখা দেয়। বিএডিসি থেকে বীজ কিনলে অবশ্যই রশিদ দেয়ার কথা। আমাদের বীজের জন্য এ ধরনের রোগ হয়েছে সেটা সত্য নয়।
সফিকুল আলম/এএম/জেআইএম