দেশজুড়ে

রাজশাহী অঞ্চলে বাড়ছে মুসুর চাষ

ভালো দাম ও ফলন ভালো হওয়ায় রাজশাহী অঞ্চলে মসুর চাষে আগ্রহ বাড়ছে চাষিদের। পাঁচ বছরে রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় মসুর চাষ বেড়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় উৎপাদন হয়েছে ১৮ হাজার ৭৬২ মেট্রিক টন মসুর।

আঞ্চলিক কৃষি দফতরের হিসেবে, সবচেয়ে বেশি চাষ বেড়েছে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। প্রতি দুই অর্থ বছর এ অঞ্চলে অন্তত সাড়ে ৪ হাজার হেক্টর জমিতে মসুর চাষ বেড়েছে। আর উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৬ হাজার মেট্রিক টন।

সর্বশেষ ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে এ চার জেলায় ৫৬ হাজার ৪৯৫ হেক্টর জমি থেকে মসুর উৎপাদন হয়েছে ৭২ হাজার ৩৪০ মেট্রিক টন। এর আগে ২০১২-২০১৩ অর্থ বছরে ৩৬ হাজার ৯০৩ হেক্টর জমিতে উৎপাদন ছিল ৫৩ হাজার ৫৭৮ মেট্রিক টন। মাঝে ২০১৪-২০১৫ অর্থ বছরে মসুর চাষ হয়েছিল ৪৫ হাজার ৭ হেক্টর। এ থেকে উৎপাদন ছিল ৬১ হাজার ২০৮ মেট্রিক টন।

রাজশাহী আঞ্চলিক কৃষি দফতর বলছে, রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ডালের বর্তমান চাহিদা এক লাখ ৩২ হাজার ৩৮ মেট্রিক টন। অর্ধেকের বেশি ডালের যোগান আসছে স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদিত মসুর থেকে। যোগান আসছে ছোলা, মাসকলাইসহ অন্যান্য ডাল থেকেও।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৬-২০১৭ মৌসুমে কেবল রাজশাহীতেই ২৫ হাজার ২৯৫ হেক্টর মসুর চাষ হয়। এ থেকে উৎপাদন হয় ৩১ হাজার ৩৪১ মেট্রিক টন। ওই মৌসুমে নওগাঁয় ৩০৭ হেক্টরে ৪৬৫ মেট্রিক টন, নাটোরে ২৪ হাজার ২৫০ হেক্টরে ৩১ হাজার ৫২০ মেট্রিক টন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৬ হাজার ৫৮০ হেক্টরে ৯ হাজার ১৪ মেট্রিক টন মসুর উৎপাদন হয়।

এর আগে ২০১৪-২০১৫ মৌসুমে মসুর উৎপাদন ছিল রাজশাহীতে ১৮ হাজার ১১০ হেক্টরে ২২ হাজার ৪৫৭ মেট্রিক টন, নওগাঁয় ২৭০ হেক্টরে ৩৪০ মেট্রিক টন, নাটোরে ২৬ হাজার ১৮৮ হেক্টরে ৩৭ হাজার ৯৭২ মেট্রিক টন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪৪৫ হেক্টরে ৪৩৯ মেট্রিক টন। ২০১২-২০১৩ মৌসুমে রাজশাহীতে ১৩ হাজার ১০০ হেক্টরে ১৬ হাজার ৬০২ মেট্রিক টন, নওগাঁয় ২৮০ হেক্টরে ৩৬৪ মেট্রিক টন, নাটোরে ২৩ হাজার ২০ হেক্টরে ৩৬ হাজার ১৮৫ মেট্রিক টন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫০০ হেক্টরে ৪২৭ মেট্রিক টন মসুর উৎপাদন হয়।

কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) খামার গবেষণা বিভাগের বরেন্দ্র সেন্টারের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সাখাওয়াত হোসেন জানান, কেবল বরেন্দ্র অঞ্চলেই নয়, সারা দেশেই ডালের ঘাটতি রয়েছে। বিষয়টি মাথায় রেখে গত মৌসুমে ডাল গবেষণা কেন্দ্র এ অঞ্চলের প্রায় ৫০০ বিঘা জমিতে মসুর চাষ করেছিল। কৃষকদের মাঝে মসুর চাষের আধুনিক কলাকৌশল ও উচ্চফলনশীল জাত ছড়িয়ে দেয়া ছিলো এ প্রকল্পের উদ্দেশ্যে।

তিনি আরও বলেন, উচ্চ ফলনশীল বারি মসুর-৩ বরেন্দ্র অঞ্চলে চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী। এছাড়া রয়েছে খনিজ সমৃদ্ধ বারি মসুর -৬ ও বারি মসুর-৭। এগুলো মসুরের বায়ো-ফর্টিফাইড জাত। ভালো ফলন ও গুণগত মানসম্পন্ন হওয়ায় বাজারে দামও ভালো। এতে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন।

বরেন্দ্রে ধান ও পাট চাষ সম্প্রসারণে কাজ করছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। সংস্থাটির উপ-ব্যবস্থাপক (কৃষি) এটিএম রফিকুল ইসলাম জানান, বিনা সেচেই মসুর চাষ করা যায়। এ জন্য আমন সংগ্রহের পর তারা কৃষকদের চাষে উদ্বুদ্ধ করে থাকেন।

জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার বোজোড়া এলাকায় সাড়ে তিন বিঘা জমিতে মসুর চাষ করেছেন ফরিদপুর গ্রামের কৃষক তেজামুল হক। তিনি জানান, মসুরের গাছে ফুল আসার শুরুতেই আকাশ মেঘলা ছিল। ওই সময় হাল্কা বৃষ্টিপাত হয়। এরপর থেকে ছিল ঘন কুয়াশা। এতে ক্ষেতে মড়ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে প্রতিশেধক প্রয়োগ করেন। এতে ফলন কিছুটা কমে গেছে বলে জানিয়েছেন ওই চাষি।

একই অবস্থা জেলার তানোরের পাঁচন্দর ইউনিয়নের কচুয়া এলাকার চাষি আব্দুস সাত্তারেরও। বরেন্দ্রের বিভিন্ন এলাকায় মসুর ক্ষেতে মড়ক লেগেছিলো বলে জানান আব্দুস সাত্তার। এনিয়ে স্থানীয় কৃষি দফতরকে চাষিরা পাশে পেয়েছেন বলেও জানান তিনি।

তবে মড়কে মসুরের সর্বোচ্চ পাঁচ শতাংশ ফলন বিপর্যয় হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক দেব দুলাল ঢালি। তিনি বলেন, আবহাওয়ার প্রতিকূলতায় ছড়িয়ে ছিল মড়ক। তবে কৃষি কর্মকর্তাদের তৎপরতা তা নিয়ন্ত্রনে চলে আসে।

দেব দুলাল ঢালি বলেন, প্রতি বছরই এ অঞ্চলে মসুর চাষের পরিধি বাড়ছে। কারণ গত কয়েক বছর ধরে ধানে অব্যহত লোকসান গুণছেন চাষিরা। হিসেব-নিকেশ করেই মসুর চাষে ফিরেছেন তারা। মসুর চাষ সম্প্রসারণে সংরক্ষণশীল কৃষি প্রযুক্তিও কিছুটা কাজে এসেছে বলে জানান ওই কৃষি কর্মকর্তা।

এদিকে, বর্তমানে রাজশাহীর বাজারে রকমভেদে মসুর বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১২০ থেকে ১৪০ টাকায়। আসছে রমজানে দাম আরও বাড়তে পারে- এমনটিই আভাস দিয়েছেন বিক্রেতারা।

আরএআর/পিআর