মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে সেখানে বসবাসরত লাখো বাংলাদেশি প্রবাসী চরম অনিশ্চয়তা ও ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন। কাজ হারানো, আয় কমে যাওয়া, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা শঙ্কা—সব মিলিয়ে কঠিন সময় পার করছেন তারা।
মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীরা জাগো নিউজকে জানান, প্রায় প্রতিদিনই হামলা হচ্ছে। বিশেষ করে ১ এপ্রিলের পর থেকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। অনেকের দেড় থেকে দুই মাস ধরে নিয়মিত কাজ নেই। একই সঙ্গে রুম ভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। আগে যে জিনিস এক টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা তিন টাকায় কিনতে হচ্ছে। বিমান টিকিটের দামও বেড়েছে, ফলে দেশে ফেরাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রবাসী শ্রমিকদের মাধ্যমে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স আসে দেশে/ফাইল ছবি
বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের বড় অংশ কাজ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনে। এই ছয়টি দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি রয়েছে। সবশেষ ২০২৫ সালে এই দেশগুলোতে শ্রমিক গেছে ৯ লাখ ১৯ হাজার ৪৩৫ জন। এছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) থেকে ক্লিয়ারেন্স নিয়েছেন এক লাখ ৫৭ হাজার ৯৮১ জন।
বিএমইটি বলছে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ফ্লাইট সংকট আর টিকিটের দাম বেশি হওয়ার কারণে ক্লিয়ারেন্স নেওয়া কিছু শ্রমিক যাওয়ার অপেক্ষায়। তবে চলতি বছর ক্লিয়ারেন্স পাওয়াদের সিংহভাগই চলে গেছে।
আরও পড়ুনমধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ: দুশ্চিন্তায় প্রবাসীরাযুদ্ধের ছবি-ভিডিও ধারণ বা প্রকাশ না করতে বার্তা সৌদি প্রবাসীদেরযুদ্ধে নিহত বাহরাইন প্রবাসী তারেকের মরদেহ দেশে আসবে শুক্রবারশাহ আমানতে দুই দিনে আরও ১৭ ফ্লাইট বাতিলইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বে বেড়েছে খাদ্যের দাম
বিএমইটির একটি সূত্র বলছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের ওই ছয়টি দেশে বর্তমানে ৬০ লাখের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করেন। দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি ও সংকটে রয়েছে আরব আমিরাতে থাকা শ্রমিকরা। যুদ্ধের প্রভাবে দেশটিতে এ পর্যন্ত দুজন বাংলাদেশি শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন।
উপসাগরীয় অঞ্চলের ওই ছয় দেশ—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনে বর্তমানে ৬০ লাখের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করেন। দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি ও সংকটে রয়েছে আরব আমিরাতে থাকা শ্রমিকরা। যুদ্ধের প্রভাবে দেশটিতে এ পর্যন্ত দুজন বাংলাদেশি শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন।
আরব আমিরাতের সাইনওয়ার্ক কোম্পানিতে কাজ করেন সাইফুল ইসলাম। মুঠোফোনে জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘মার্চ মাসের অর্ধেক বেতন দিয়েছে। যুদ্ধের অজুহাত দেখাচ্ছে কোম্পানি। আমাদের সঙ্গে আরও অনেককে হঠাৎ বাদ দিয়েছে, আমাকে বাধ্যতামূলক ছুটি দিচ্ছে। এখানে জিনিসপত্রের দাম বেশি, খরচ বেড়ে গেছে। এদিকে ছুটিতে পাঠালে টিকিটের দাম বেশি, কীভাবে কী করবো বুঝতে পারছি না। কোম্পানি যদি হঠাৎ বাদ দিয়ে দেয়, সেই আশঙ্কাও আছে।’
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)
সাইফুল ইসলাম বলেন, দুবাইয়ের ডন ও আল রওবা কোম্পানিতেও অনেকের চাকরি গেছে। চাকরি হারিয়ে সবাই কাজের খোঁজে আছেন। এমন অস্থিরতার মধ্যে ঘরের বাইরেও খুব একটা বেশি থাকা যায় না।
আরব আমিরাতের আজমানে বসবাসকারী বাংলাদেশি প্রবাসী নুরনবী জানান, সৌদি আরবসহ গালফের ছয়টি দেশে ব্যবসা পরিচালনা করে এমন বহু প্রতিষ্ঠান যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপসাগরীয় এক দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্য পরিবহন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে অনেক শ্রমিক কাজ হারাচ্ছেন বা জোরপূর্বক ছাঁটাইয়ের শিকার হচ্ছেন। অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের বেতন অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে।
প্রবাসী শ্রমিক/ফাইল ছবি
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জের বাসিন্দা কুয়েতে থাকা প্রবাসী পিয়াস হাসান জাগো নিউজকে বলেন, শহরের অনেক হোটেলের মালিক সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার নাগরিক। যুদ্ধের ভয়ে তারা কুয়েত ছেড়ে নিজ দেশে চলে গেছেন। এতে অনেক হোটেলে খাবার সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে।
‘সৌদি আরবসহ গালফের ছয়টি দেশে ব্যবসা পরিচালনা করে এমন বহু প্রতিষ্ঠান যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপসাগরীয় এক দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্য পরিবহন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে অনেক শ্রমিক কাজ হারাচ্ছেন বা জোরপূর্বক ছাঁটাইয়ের শিকার হচ্ছেন। অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের বেতন অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে।’ —নুরনবী, আরব আমিরাতের আজমানে বসবাসকারী বাংলাদেশি
বেশি সংকটে বৈধ ভিসাবিহীন শ্রমিকরাসবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন ফ্রি ভিসা বা কোম্পানির বৈধ ভিসা ছাড়া শ্রমিকরা। দুবাইয়ে থাকা মামুনুর রশিদ বলেন, ‘গত বছর এখানে এসেছি। একেক সময় একেক জায়গায় দিনমজুরের মতো কাজ করি। কিন্তু এখন যুদ্ধের কারণে কাজ পাওয়া যাচ্ছে না। সামনে ইকামা করার টাকাও নেই। তিন মাসের মধ্যে ইকামা না করতে পারলে অবৈধ হয়ে যাব। এ অবস্থায় দেশেও যেতে পারছি না। যারা কোম্পানিতে আছেন, তারা কিছুটা ভালো আছেন আমাদের চেয়ে।’
আরও পড়ুনমধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে ৫ বাংলাদেশি নিহত, ইরান থেকে নিরাপদে ফিরেছেন ১৮৬ জনমধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ইরানেরইরান যুদ্ধে তীব্র পানিসংকটের ঝুঁকিতে মধ্যপ্রাচ্যমধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশিদের নিরাপদ রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে সরকারমধ্যপ্রাচ্যে বিদেশি শ্রমিকরা কোথা থেকে আসেন, বাংলাদেশির সংখ্যা কত?
তিনি আরও বলেন, ‘হঠাৎ করেই অনেক সময় বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মানুষের কাছে রুম ভাড়া দেওয়ার টাকা নেই, খাবারের টাকাও নেই। শুয়ে-বসে দিন কাটছে। আমিও এক সপ্তাহের মধ্যে দেশে ফেরার চেষ্টা করবো।’
অ্যালার্ট মেসেজ ও সাইরেনে আতঙ্কপ্রবাসীরা জানান, আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত হলেই মোবাইলে সাইরেন বেজে উঠে, অ্যালার্ট মেসেজ আসে।
দুবাই প্রবাসী মামুনুর রশিদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আরব আমিরাত প্রশাসন সবার মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠায়। ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা রকেট দেশের আকাশসীমায় প্রবেশ করলেই আমাদের মোবাইল ফোনে সাইরেন বেজে ওঠে। এ সময় খুব ভয় পাই। কেউ বাইরে থাকলে ছোটাছুটি করে।’
মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ইরানের/ফাইল ছবি: এএফপি
কাতারে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসী ইয়াসিন হামিদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি অ্যালুমিনিয়ামের কাজ করি। প্রতিদিন হামলা হয় না। মাঝে মধ্যে দিনে কয়েকবার ক্ষেপণাস্ত্র আসে। প্রত্যেক প্রবাসীর মোবাইলে অ্যালার্ট মেসেজ আসে। বাইরে থাকলে ভয় লাগে। দোকান বা বাসায় কাজের সময় কিছুটা স্বস্তি থাকলেও রাস্তায় চলাফেরার সময় আতঙ্কে থাকতে হয়।’
গ্রেফতার আতঙ্কও বাড়ছেমধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ভিডিও ও ছবি টিকটক কিংবা ফেসবুকে শেয়ার করার অভিযোগে অনেক প্রবাসীর গ্রেফতার হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। এছাড়া অনেককেই জরিমানাও গুনতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসীরা।
আমিরাতে বসবাসরত নুরনবী জাগো নিউজকে মুঠোফোনে বলেন, ‘যুদ্ধসংক্রান্ত ভিডিও বা তথ্য শেয়ার করায় অনেককে গ্রেফতার ও জরিমানা করা হচ্ছে। আমরা এখন ভয়ে কোনো ভিডিও করি না, ছবি তুলি না, এমনকি ফোনে বা এসএমএসেও এসব নিয়ে আলোচনা করি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেককে এরই মধ্যে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। সামনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। সব মিলিয়ে আগামী কয়েক মাস প্রবাসীদের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন প্রবাসীরা।’
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরাএ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব হেদায়েতুল ইসলাম মণ্ডল জাগো নিউজকে বলেন, ‘গ্রেফতারের বিষয়ে আমরা নিশ্চিত কিছু জানি না। এ বিষয়ে হাইকমিশন কোনো তথ্য পেলে সেটি আমাদের জানাবে।’
‘আমাদের দেশের কর্মীদের ভরসার জায়গা হাইকমিশন। এই পরিস্থিতিতে তাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে হবে। রেমিট্যান্সের গুরুত্ব বুঝে প্রবাসী শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াতে হবে। অন্যায়ভাবে কারও চাকরি গেলে কিংবা বেতন নিয়ে সমস্যা করলে অবশ্যই হাইকমিশনকে সে বিষয়ে নজরদারি করতে হবে।’—শাকিরুল ইসলাম, চেয়ারম্যান, অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ)
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। সাময়িক একটা সংকট হচ্ছে, এটাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। তা না হলে নতুন কর্মসংস্থান কমে যাওয়া ও বিদ্যমান শ্রমিকদের ফিরে আসার ঝুঁকি তৈরি হবে। এরই মধ্যে শ্রমিকদের ফিরে আসার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
প্রবাসী শ্রমিক/ফাইল ছবি
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীল পরিবেশ কিন্তু কয়েক বছর পরপরই হচ্ছে। আমাদের সিংহভাগ শ্রমিক সেখানে থাকে। এসব মাথায় রেখে পরিকল্পনা সাজাতে হবে। ইউরোপ, এশিয়া কিংবা স্থিতিশীল শ্রমবাজারে অনেক বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। বিকল্প খুঁজে রাখতে হবে।
শ্রমিকদের চাকরি থেকে ছাঁটাই কিংবা বেতন-ভাতা নিয়ে সৃষ্ট সংকট হাইকমিশনকে তদারকি করতে হবে বলে উল্লেখ করেন অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলাম।
জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের কর্মীদের ভরসার জায়গা হাইকমিশন। এই পরিস্থিতিতে তাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে হবে। রেমিট্যান্সের গুরুত্ব বুঝে প্রবাসী শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াতে হবে। অন্যায়ভাবে কারও চাকরি গেলে কিংবা বেতন নিয়ে সমস্যা করলে অবশ্যই হাইকমিশনকে সে বিষয়ে নজরদারি করতে হবে।’
আরএএস/এমএমকে/এমএমএআর/এমএফএ