বছর দেড়েক আগে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বহুল আলোচিত স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের পর ৬৮ বছরের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয় বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দারা।
ন্যূনতম নাগরিক সুবিধাবঞ্চিতসহ যুগের পর যুগ অবহেলিত ছিল পঞ্চগড়ের ৩৬ বিলুপ্ত ছিটমহলের ২০ হাজারের বেশি মানুষ। সরকারের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে এখন বদলে গেছে সেখানকার চিত্র, বদলে গেছে বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মান।
সরেজমিন বিলুপ্ত বিভিন্ন ছিটমহল ঘুরে দেখা গেছে, বিশেষ করে সেখানকার শিশুরা নিজের মা-বাবা এবং নিজেদের ঠিকানা ব্যবহার করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করছে। যা বছর দুয়েক আগে কল্পনাও করা যেতো না। সেখানকার শিশুরা মিথ্যা নাম ঠিকানা ব্যবহার করে পাশের বাংলাদেশি কোনো স্কুল মাদরাসায় লেখাপড়া করতো। এখন তারা গর্বিত বাংলাদেশি নাগরিক।
দীর্ঘদিন পর হলেও এখন তারা নাগরিকত্বের সকল প্রকার সুবিধা ভোগ করছে। শিক্ষার্থীরা উপবৃত্তি, বাসিন্দাদের বয়স্কভাতা, বিধবাভাতাসহ প্রতিবন্ধী ভাতাও পাচ্ছে।
২০১৬ সালের ৩১ জুলাই বাংলাদেশি ভূখণ্ডে যোগ হয় ১১১ তৎকালীন ভারতীয় ছিটমহলের ১৭ হাজার ১৬০ দশমিক ৬৩ একর জমি। এরই ধারাবাহিকতায় পঞ্চগড়ের ৩ উপজেলার ৩৬ ছিটমহল বিলুপ্ত করে বিভিন্ন ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ, বোদা এবং সদর উপজেলার বিলুপ্ত ৩৬ ছিটমহলের মধ্যে ১৭ ছিটমহলে জনবসতি রয়েছে। প্রায় ২০ হাজার জনসংখ্যা অধ্যুষিত এসব এলাকায় দেড় বছর আগে ১০৫ দশমিক ২৫ কিলোমিটার সড়ক এবং ১৯৩ মিটার ব্রিজ-কালভার্ট, ১০ দশমিক ৫ কিলোমিটার খাল খনন, ১১টি বাজার সেট, ৭টি মসজিদ এবং ৫টি মন্দির নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের (এলজিইডি) অর্থায়নে এসব প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয় ৮২ দশমিক ৬৬ কোটি টাকা। জেলা পরিষদ ১৬২ কোটি টাকার ২৫টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। ২৫০ কিলোমিটার সঞ্চালন সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে ৯ হাজারের বেশি গ্রাহককে বিদ্যুত সুবিধার আওতায় আনা হয়।
বিশেষ করে সরকারি-বেসরকারি অর্থায়নে স্কুল, কলেজ, মাদরাসাসহ মসজিদ ও মন্দির নির্মাণ হয়। ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫টি বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ শেষ হয়েছে। চলতি অর্থবছরে আরও ৫০ কোটি টাকার কয়েকটি নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে বলে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।
এছাড়া কৃষি ক্ষেত্র উন্নয়নে সাইট্রাস ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের আওতায় বিলুপ্ত ছিটমহলের ৩০০ কৃষককে প্রশিক্ষণ প্রদান, চারা বিতরণ ও প্রদর্শনী খামার তৈরির ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্বাস্থ্যক্ষেত্র উন্নয়নে ৫টি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের অনুমোদন হয়েছে।
এর মধ্যে দেবীগঞ্জ উপজেলার বিলুপ্ত কোটভাজনি ছিটমহলে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয়েছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগ প্রায় আড়াই হাজার হাস-মুরগিকে টিকা দান ও ৭০০ অসচ্ছল নাগরিকের মাঝে বিভিন্ন প্রাণি (গরু, ছাগল, সোনালী মুরগি ও হাঁস) বিতরণ করেছে।
মৎস অধিদফতরের অওতায় মৎস চাষে উদ্বুদ্ধকরণ ও সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মৎস চাষিদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন জলাশয়ে ১ হাজার ৮০০ কেজি পোনা অবমুক্ত করা হয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধায়নে বিলুপ্ত ছিটমহলের গৃহহীন ছিন্নমূল জনগোষ্ঠির বাসস্থানের জন্য গুচ্ছগ্রাম ২য় পর্যায়ের (সিডিআরপি) প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৫৫ লাখ টাকা ব্যায়ে ৩০টি পরিবারের জন্য স্যানিটেশন ব্যবস্থাসহ দেবীগঞ্জ উপজেলার বিলুপ্ত কোট ভাজনী ছিটমহলের বালাসুতি এলাকায় একটি গুচ্ছগ্রাম নির্মাণ করা হয়েছে।
২০১১ সালের হেডকাউন্টিং অনুযায়ী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় থেকে পঞ্চগড়ের তিনটি উপজেলার ছিটমহলগুলোতে ২০ হাজার মানুষের গেজেট প্রদান করা হয়েছে। সে মোতাবেক ইতোমধ্যে ৯ হাজার ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন এবং তারা ইতোমধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।
সদর উপজেলার বিলুপ্ত গারাতি ছিটমহলের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আলিম মাদরাসার তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী জেমমিন আক্তার, ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী চাম্পা আক্তার জানায়, আগে মিথ্যা নাম পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশের স্কুল ও মাদরাসায় লেখাপড়া করতে হতো। এখন নিজেদের নাম, মা-বাবার নাম এবং সত্যিকারের ঠিকানা ব্যবহার করে লেখাপড়া করছি। এটাই তাদের কাছে বড় পাওয়া।
গারাতি ছিটমহলের রাজমহল উচ্চবিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী আয়শা ছিদ্দিকা জানায়, মোমবাতি আর কুপি বাতি দিয়েই এতোদিন পড়তে বসেছিলাম। আর এখন বিদ্যুতের আলোয় লেখাপড়া করি। খুব ভালো লাগে। আগে অনেক কষ্ট হতো।
ছিটমহলের বাসিন্দা মোজাম্মেল হক বলেন, নিজেদের স্কুল কলেজে লেখাপড়ার কথা আমরা ভাবতেও পারতাম না। এখন এখানেই স্কুল কলেজ হয়েছে, পাকারাস্তা হচ্ছে, নিজের পরিচয়ে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসেবা নিচ্ছি, মসজিদ মাদরাসা হয়েছে, ঘরে ঘরে বিদ্যুত পেয়েছি। এত দ্রুত আমাদের এলাকার এমন উন্নয়ন হবে কেউ ভাবতে পারিনি।
বিলুপ্ত ছিটমহল বাসিন্দা চাঁনমিয়া বলেন, এখনো আমাদের পাশের বাংলাদেশি এলাকার অনেকে পরিবারেই বিদ্যুতের আলো দেখেনি। আমরাতো ছিটমহলে ছিলাম। স্বপ্নেও ভাবিনি এমন এলাকায় কখনো বিদ্যুতের আলো আসবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের মানুষ বানিয়েছেন, মানুষের মর্যাদা দিয়েছেন। একটা দেশ দিয়েছেন, বাঁচার সাহস জুগিয়েছেন।
জেলা প্রশাসক অমল কৃষ্ণ মন্ডল বলেন, জেলার ৩ উপজেলার ৩৬ ছিটমহল বাংলাদেশি ভূখণ্ডে যোগ হওয়ার পর বিভিন্নমুখী উন্নয়ন কর্মকাণ্ড গ্রহণ করা হয়েছে। সকল নাগরিকদের ভোটার তালিকা প্রণয়ন করে ভোট সম্পন্ন করা হয়েছে। ভূমি জরিপের কাজ শেষ পর্যায়ে। শিগগির সেখানে নাগরিক সনদ হিসেবে এনআইডি এবং স্মার্টকার্ড বিতরণ করা হবে। প্রতিটি ঘরেই বিদ্যুত সংযোগ দেয়া হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন দফতর রাস্তাঘাট, ব্রিজ কালভার্ট, ড্রেন, মসজিদ, মন্দির নির্মাণ করছে। বর্তমান অর্থবছরে আরও ৫০ কোটি টাকা মূল্যের প্রকল্প শুরু হয়েছে। আগামী দেড় বছরের মধ্যে চলমান বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ শেষ করা হবে বলে আশা করছি।
সফিকুল আলম/এএম/পিআর