দেশজুড়ে

সিডরে নিখোঁজ, মোরার পর মিলল খোঁজ, তবে...

বরগুনার আমতলী উপজেলার চাওড়া ইউনিয়নের ঘটখালী গ্রামের প্রান্তিক জেলে সোহেল। ২০০৭ সালের প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় সিডরের আগের দিন বিকেলে অন্য ১১ জন জেলের সঙ্গে ট্রলারে করে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যান। কিন্তু রাতেই ঘূর্ণিঝড় সিডরের কবলে পড়ে সাগরে ট্রলার ডুবে নিখোঁজ হন সবাই।

ঘটনার দু’দিন পর নিখোঁজ দুই জেলে বাড়ি ফিরলেও অন্যরা কেউ আর ফিরে আসেনি। এরপর অন্যান্য জেলেদের মত সোহেলসহ অপর নয় জেলের নাম লিপিবদ্ধ করা হয় নিখোঁজের তালিকায়।

একদিকে ছেলে নিখোঁজ অপরদিকে সিডরের তাণ্ডবে বাড়ি-ঘর বিধ্বস্ত হয়ে অভাব-অনটন ও শোকে পাথরপ্রায় সোহেলের পরিবার। সিডর পরবর্তী সময়ে দেশি-বিদেশি সহায়তায় অভাব-অনটন দূর হলেও কখনোই দূর হয়নি সোহেলের অভাব। সোহেলের জন্য গত ১০ বছর ধরে কেঁদে চলেছেন তার মা। ভাইকে খুঁজে না পাওয়ার শোক অনেকটা ভুলতে বসেছিলেন ভাই-বোনরা। এ অবস্থায় গত ১১ জুন (রোববার) বাড়ি ফিরেছেন সোহেল।

ঘটখালী গ্রামের স্থানীয় অধিবাসী এনসান আলীর দুই ছেলে এবং দুই মেয়ের মধ্যে সবার বড় সোহেল। দারিদ্র্যের কারণে প্রাথমিক শিক্ষার পরে আর এগোয়নি তার পড়াশোনা। সোহেল যখন নিখোঁজ হন তখন তার বয়স ছিল ১৭ বছর। আর এখন ২৭। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডরের কবলে পড়ে বঙ্গোপসাগরে নিখোঁজ হয়েছিলেন সোহেল।

তবে দীর্ঘদিন পর সোহেলকে ফিরে পাওয়ার আনন্দের মাঝে বেদনাও আছে দরিদ্র পরিবারটিতে। সোহেল ফিরেছেন ঠিকই; কিন্তু কথা বলতে পারছেন না। ফলে কিভাবে বেঁচে ছিলেন এবং দীর্ঘ ১০ বছর কোথায় ছিলেন এর কিছুই বলতে পারছে না সোহেল। সোহেলের ফিরে আসার খবরে দূর-দূরান্ত থেকে তাকে দেখতে আসছে মানুষ।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বরগুনার আমতলী উপজেলার আরপাঙ্গাশিয়া বাজারে গত শনিবার দুপুরের পর কোনো একসময় কে বা কারা একটি কাভার্ড ভ্যানে সোহেলসহ একই এলাকার অন্য এক যুবক রতনকে নামিয়ে দিয়ে যায়। তখন তারা বড় বড় চুল, দাড়ি এবং গোঁফে আবৃত ছিলেন।

ওইদিনই আরপাঙ্গাশিয়া বাজারে সোহেল এবং রতনকে দেখে তাদের চিনতে পারেন ঘটখালী গ্রামের স্থানীয় অধিবাসী জেসমিন আক্তার। এরপর তিনি মোবাইল ফোনে সোহেল এবং রতনের মা-বাবাকে খবর দেন। খবর পেয়ে আরপাঙ্গাশিয়া বাজার থেকে স্থানীয়দের সহযোগিতায় সোহেল ও রতনকে ঘটখালী গ্রামে নিয়ে আসেন তাঁদের মা-বাবা।

বাড়ি ফিরলেও এখন পর্যন্ত কারো সঙ্গে কোনো কথা বলছেন না সোহেল। নির্বাক তাকিয়ে থাকেন সবার দিকে। খেতে বললে খাচ্ছেন। বসতে বললে বসেই থাকছেন। গোসলের সময় তাকে গোসল করিয়ে দিচ্ছেন মা-বাবা। সারাক্ষণই ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে দেখছেন চারপাশ।

সোহেলকে ফিরে পাওয়ার পর অশ্রুসিক্ত চোখে মা হাজেরা বেগম জানান, গত ১০ বছরে এমন একটি দিন যায়নি যেদিন ছেলের জন্য কাঁদিনি। ছেলের আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। সোহেলকে আর কোনোদিনই সাগরে যেতে দিবেন না বলেও জানান তিনি।

তিনি আরো বলেন, সোহেল পুরোপুরিভাবে সুস্থ নয়। কথা বলতে পারছে না, সবার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। তাই আমতলী নিয়ে গিয়েছিলাম ডাক্তার দেখাতে। সেখানের ডাক্তাররা সোহেলকে ঢাকায় নিয়ে যেতে বলেছে। কিন্তু ঢাকায় নিয়ে সোহেলকে চিকিৎসা করানোর মত টাকা আমাদের নেই। তাই ওর চিকিৎসা করাতে পারছি না। এসময় তিনি সোহেলের চিকৎসার সহায়তার জন্য সমাজের বিত্তবানদের প্রতি অনুরোধ জানান।

এ বিষয়ে চাওড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আক্তারুজ্জামান খান বাদল বলেন, তিনি সোহেলসহ অন্য এক যুবকের ফিরে আসার বিষয়টি জানেন। অফিশিয়াল ব্যস্ততার কারণে এখনো তিনি ওই দুই বাড়িতে যেতে পারেননি। তবে তিনি ওই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।

এ বিষয়ে বরগুনার জেলা প্রশাসক ডা. মহা. বশিরুল আলম বলেন, ঘটনাটি তিনি শুনেছেন। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রকৃত বিষয়টি জেনে ভুক্তভোগী পরিবারের সহযোগিতায় ব্যবস্থা নেবেন।

এফএ/জেআইএম