দেশজুড়ে

পঞ্চগড়ে পানির জন্য হাহাকার

উপকূলের মানুষরা যখন একটুখানি আশ্রয়ের খোঁজে দিশেহারা, তখন উত্তরাঞ্চলের মানুষরা প্রচণ্ড তাপদাহে হাসফাস করছে। প্রকৃতির এই অমোঘ নিয়তির কাছে অসহায় আমরা সবাই। আষাঢ়-শ্রাবণেও বৃষ্টি নেই। আকাশে প্রখর রোদ আর গরম হাওয়া।

বৃষ্টিপাতের বদলে প্রতিকুল আবহাওয়া উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে। টানা ১৫ দিন ধরে খরার প্রভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে আমনের বীজতলা। জমিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানির অভাবে রোপা লাগানো যাচ্ছে না।

কিছু জমিতে রোপা লাগানোর পর খরায় সেসব জমিতে ফাটল ধরেছে। বাধ্য হয়ে বর্ষকালেও রোপা লাগানো জমিতে সেচ দিতে শুরু করেছেন কোনো কোনো কৃষক।

এতে চলতি আমন মৌসুমে আমন উৎপাদনে অতিরিক্ত খরচের আশঙ্কা করছেন চাষিরা। আবার অতিরিক্ত খরচের কারণে জমিতে সেচ দিতে না পেরে বিপাকে পড়েছেন অনেক আমন চাষিরা। বর্ষকালের এমন আবহাওয়া অচেনা বলছেন স্থানীয়রা।

শহরের তেঁতুলিয়া রোডের ফুল ব্যবসায়ী আবুল কালাম আজাদ বলেন, বর্তমানে আজব দুনিয়া দেখছি। ভরা বর্ষা মৌসুমে রাস্তায় ধুলা উড়ছে। আষাঢ় শ্রাবণেও বৃষ্টি নেই। তীব্র গরম আর বৈদ্যুতিক লোডসেডিংয়ে রাতে ঘুমানো যাচ্ছে না। মানুষ রোপা লাগাতে পারছে না। ফুল ফলের চারা মরে যাচ্ছে। বর্ষাকালেও এখন জমিতে সেচ দিতে হচ্ছে। খবরে দেখি দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা হচ্ছে। আর আমাদের এখানে যে মরুভূমি হয়ে যাচ্ছে। আরও কত কি যে দেখতে হবে।

ঋতুর বৈচিত্রে বাংলা মাসের আষাঢ়-শ্রাবণ বর্ষাকাল। উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে সাধারণত আষাঢ়ের শুরুতেই বর্ষা নামে। প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টি ঝরে অঝর ধারায়। শ্রাবণের মাঝামাঝি ফসলের মাঠসহ চারিদিকে পানিতে থইথই করে।

কৃষকরা দলবেঁধে ফসলের মাঠে রোপা আমন লাগাতে ব্যস্ত সময় পার করেন। কিন্তু চলতি আমন মৌসুমে পরিমিত পরিমাণ পানির অভাবে বিপাকে পড়েছেন আমন চাষিরা। ছয় ঋতুর সেই বর্ষাকাল তো দূরের কথা, পরিমিত পরিমাণের বৃষ্টিপাতেরও দেখা নেই।

ফলে সময়মত বীজতলা প্রস্তুত করেও কৃষকরা জমিতে আমন চারা রোপন করতে পারছেন না। পানির অভাবে বীজতলা নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তবে সামর্থ্যবান কোনো কোনো কৃষক শ্যালোমেশিনে সেচের মাধ্যমে জমিতে পানি দিয়ে আমনের চারা রোপন করছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি আমন মৌসুমে জেলায় ৯৬ হাজার হেক্টর জমিতে রোপা আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু পরিমিত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় এ পর্যন্ত কিছু নিচু জমিসহ সেচের মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চারা রোপন সম্ভব হয়েছে। পানির অভাবে বিভিন্ন এলাকার রোপা লাগানো ফসলের মাঠ ফেটে যাচ্ছে। বৃষ্টির আশায় কৃষকদের বড় একটা অংশ জমি চাষ দিয়ে রেখেছেন। জুলাই মাসের মধ্যে বৃষ্টি হলে তারা রোপা লাগাতে পারবেন।

জেলার বিভিন্ন এলাকায় মূলত বর্ষাকালে বৃষ্টিতে জমে থাকা পানিতেই কৃষকরা রোপা আমন চাষ করেন। এবার আষাঢ়ের শুরু থেকেই প্রায় বৃষ্টিহীন পঞ্চগড় এলাকা। মাঝে মধ্যে হালকা বৃষ্টিপাত হলেও সেই পানি জমিতে লেগে থাকেনি। এতে অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে পানি না থাকায় এখনও পতিত পড়ে আছে আবাদি জমি।

কৃষি বিভাগ জানায়, গত জুনে জেলায় প্রতিদিন গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৯২ মিলি.। আর জুলাইয়ের ১৯ তারিখ পর্যন্ত মোট বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১৪৬ দশমিক ৮ মিলি.। অথচ গত বছর জুলাই মাসে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ৩৭৫ মিলি.। জেলায় সর্বশেষ বৃষ্টি হয়েছিল ১২ জুলাই। এরপর সপ্তাহ জুড়ে (১৯ তারিখ পর্যন্ত) কোথাও বৃষ্টির দেখা মেলেনি। তবে জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে শেষের দিকেও বৃষ্টিপাত হলে সংকট কেটে যাবে বলে কৃষি বিভাগের দাবি।

সদর উপজেলার গরিনাবাড়ি এলাকার কৃষক আব্দুল মতিন বলেন, জমি প্রস্তুত রেখেছি আমন আবাদের জন্য। বৃষ্টি অভাবে রোপা লাগাতে পারছি না। এ পর্যন্ত মাত্র দুই বিঘা জমিতে রোপা লাগিয়েছি। জমিতে সেচ দিতে বিঘাপ্রতি ৩ হাজার টাকা খরচ হয়। কীভাবে কী করবো বুঝতে পারছি না।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. শামছুল হক বলেন, জুলাইয়ের শুরুতে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছিল। সর্বশেষ ১১ জুলাই পর্যন্ত ৮০ মিলি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এ পর্যন্ত কৃষকরা প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে রোপা লাগিয়েছে। এরপর ১৯ জুলাই পর্যন্ত প্রায় এক সপ্তাহ বৃষ্টি নেই। আশা করছি কয়েক দিনের মধ্যে বৃষ্টি হলে কৃষকরা রোপা লাগাতে পারবে। তবে বৃষ্টি একেবারে না হলে কৃষকদের সেচের মাধ্যমে আমন চারা রোপনের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

সফিকুল আলম/এএম/জেআইএম