কখনো অন্যের জমিতে কাজ করে, কখনো শিক্ষক ও পরিচিতজনদের সাহায্যে চলেছে তার পড়াশোনা। পরিবারের আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে তাও থমকে গেছে বারবার। তবু পড়াশোনার প্রতি অদম্য আগ্রহ আল-আমিনকে এনে দিয়েছে সেরা সাফল্য।এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে রাজবাড়ী সদর উপজেলার মুলঘর ইউনিয়নের রশোরা গ্রামের মো. সাঈদ বিশ্বাসের ছেলে মো. আল-আমিন বিশ্বাস।কিন্তু, ভালো ফলাফল করেও আল-আমিনের চোখে-মুখে শঙ্কা। টানাপোড়েনের বৃহৎ সংসারে এসএসসি শেষ করতেই যে সংগ্রাম, উচ্চশিক্ষার বাকী পথটুকুর কি হবে? এই ভাবনায় অস্থির আল-আমিন ও তার বাবা-মা। এদিকে, আল-আমিনের এ সংগ্রাম ও সাফল্যে তার সহপাঠী ও শিক্ষকরা খুশি হলেও চিন্তিত তার ভবিষ্যত নিয়ে।আল-আমিনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পদ্মার সর্বনাশা ভাঙনে সহায়-সম্বল হারিয়ে দিশেহারা তার বাবা-মা তাদের ৩ ভাই ও ২ বোনকে নিয়ে চলে আসেন মুলঘর ইউনিয়নের রশোরা গ্রামে।এই গ্রামেই অন্যের জমিতে ঘর বেঁধে সন্তানদের নিয়ে দিনযাপন শুরু করেন তারা। ভাই-বোনের মধ্যে আল-আমিন তৃতীয়। কিন্তু, ৭ জনের পরিবারের খাবার জোগাতে এক সময় বাবার সঙ্গে আল-আমিনকেও নামতে হয় কৃষিকাজে। অন্যের জমিতে কাজ শুরু করে আল-আমিন।কিন্তু, শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ও অদম্য মনোভাবের কারণে বাবা তাকে ভর্তি করেন স্কুলে। পরিবারের অভাব তার বড় ২ ভাই-বোনের পড়াশোনা শেষ করে দিলেও থেমে যায়নি আল-আমিন। বাবার সঙ্গে অন্যের জমিতে কাজ ও পড়াশোনা সমানে চলতে থাকে তার।২০০৯ সালের পিএসসি পরীক্ষায় ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়ে নিজের মেধা জানান দেয় আল-আমিন। নজরে আসে স্কুলের শিক্ষক ও প্রতিবেশীদের। মুলঘর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য সিরাজুল ইসলাম তখন তাকে মুলঘর উচ্চ বিদ্যালয়ে এনে ভর্তি করে দেন।টানাটানির সংসারে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে থাকে তার পড়াশোনা। মেধাবী ছাত্র হওয়ায় তাকে স্কুলের শিক্ষকরা টাকা ছাড়াই প্রাইভেট পড়াতেন। এতে আল-আমিনে মনোবলও বড়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালের জেএসসি পরীক্ষাতেও ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায় আল-আমিন।এরপর তার প্রতি পবিরারের গুরুত্ব বেড়ে যায়। কিন্তু, পড়াশোনার খরচ যোগাতে বাবাকে অব্যাহত সাহায্য করতে থাকে আল-আমিন। নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর শিক্ষক-সহপাঠীদের সহায়তায় এবার এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পায় সে। তার এ সাফল্যে আল-আমিন তার শিক্ষক-সহপাঠী আর সহায়তাকারী সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে।আল-আমিনের কাছে তার ভবিষৎ সম্পর্কে জানতে চাইলে সে বলে, আমি লেখাপড়া করে অনেক বড় হতে চাই এবং আমার পরিবারের অভাব-অনটন দূর করতে চাই। আমি পড়ালেখা করতে চাই, কিন্তু কি হবে আমি জানি না। পড়ালেখার করার টাকা দেবে কে?এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুলঘর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাকির হোসেন মোল্লা জানান, আল-আমিন মেধাবী ছাত্র। ওকে একটু সহযোগিতা করতে পারলেই ওর দ্বারা কিছু পাওয়া সম্ভব। আমার স্কুল থেকে ওকে বিনামূল্যে বই দিয়েছি। অন্য শিক্ষকদের কাছে বিনাবেতনে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছি। জেএসসিতে ভালো রেজাল্ট করাতে ওকে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আমরা সংবর্ধনা দিয়েছি। আমি আল-আমিনের শিক্ষা জীবনের উন্নতি কামনা করি।মুলঘর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান মুসল্লী জানান, আল-আমিন শুধু আমার ইউনিয়ন না আমার রাজবাড়ী জেলাবাসীর গর্ব। আমি ওর জন্য দোয়া করি আল-আমিন যেন ওর সেরাটা আমাদের দিতে পারে। আমি ওর পড়াশোনার ব্যাপারে অতীতে সহযোগিতা করেছি এবং ভবিষতেও করবো।আল-আমিনের শিক্ষকদের আশা যদি সমাজের বিত্তবানরা আল-আমিনের পাশে এসে দাঁড়ায় তাহলে তার উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করার পথ সুগম হবে।এমএএস/আরআই