আমরা না খেয়ে মরি ক্ষতি নেই, কিন্তু ও আমার অবলা জীব-কথা বলতে পারে না, শুধু চেয়ে থাকে আর চোখ দিয়ে জল পড়ে। কথাগুলো অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মহেশ নামক ছোটগল্পের গফুরের।
যে তার প্রিয় পোষা গরু মহেশকে নিজের সন্তানের মতোই মনে করতো। এ নিয়ে ভুপেন হাজারিকা- শরৎ বাবু খোলা চিঠি দিলাম তোমার কাছে, তোমার মহেশ গফুর এখন কোথায় কেমন আছে... শিরোনামে একটি গানও লিখেছিলেন।
আমরা সেই মহেশের শেষ পরিণতি দেখেছিলাম, কিন্তু আজ মহেশের মতো ঠাকুরগাঁওয়ে হঠাৎ বন্যায় প্লাবিত শহরের ডিসি বস্তি এলাকায় সাহেলার অবলা গবাদি পশুর প্রতি ভালবাসা দেখে মুগ্ধ হয়েছেন অনেকেই।
শনিবার ভোর থেকে গত দুইদিনের অবিরাম ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢলে ঠাকুরগাঁওয়ের পৌরশহরসহ ৫ উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
সকলে একটু আশ্রয়ের জন্য নিরাপদ স্থানে যাচ্ছেন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে।
বিকেল সাড়ে ৫টায় ঠাকুরগাঁও শহরের টাঙ্গন নদীর এক পাশে পলিথিন মোড়ানো একটি ছাউনি তৈরি করেছেন বন্যায় প্লাবিত সাহেলা আক্তার নামে এক নারী। পলিথিন মোড়ানো ছাউনির ভেতরে নিজের পোষা কয়েকটি গবাদি পশুকে নিরাপদে রাখার চেষ্টা করছেন। আর সাহেলা নিজে বৃষ্টিতে ভিজে দেখাশুনা করছেন ওই অবলা জীবদের।
এই প্রতিবেদক বন্যা দুর্গতদের প্রতিবেদন করতে গেলে কথা হয় সাহেলার সঙ্গে। তিনি জানান, আমার পরিবারে উপার্জনের কেউ নেই। এই গবাদি পশু পালন করে তাদের দুধ বিক্রি করে সংসার চলে। তাই তাদেরকে আগে নিরাপদে রাখা আমার কাছে আগে প্রয়োজন। কারণ এই গবাদি জীবগুলো না থাকলে যে আমি দু’মুঠো খাবার কিনতে পারবো না। এই গবাদি পশুগুলো আমার সন্তানের মত। তাই তাদের নাম দিয়েছি ‘শনু আর মনু’। এদের নিয়ে খুবই বিপদের মধ্যে আছি। থাকায় জায়গাও খুঁজে পাচ্ছি না। বৃষ্টি যদি আরও বাড়ে তাহলে কোথায় যাব, কি খাবো।
শনু-মনু নামক দুটি গরুর প্রতি সালেহার যে ভালোবাসা তা শরৎ বাবু কিংবা ভুপেন হাজারিকা দেখলে বেশ খুশি হতেন।
উল্লেখ্য, ঠাকুরগাঁওয়ে প্রবল বর্ষণে প্লাবিত হওয়ায় হঠাৎপাড়া, ডিসি বস্তি, সরকার পাড়া ও খালপাড়া, সদর উপজেলার আকচা, রায়পুর, মোহাম্মদপুর, সালন্দর, শুকানপুকুরী ও বালিয়াডাঙ্গী ও রাণীংশকৈল উপজেলায় আশেপাশের অনেক এলাকার বাড়ি-ঘর এখন পানির নিচে। এতে বিভিন্ন এলাকায় ঘর-বাড়ি, রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে।
জেলা প্রশাসক আব্দুল আওয়াল জানান, গত দুই দিনের ভারি বর্ষণে জেলার ব্যাপক ঘর-বাড়ি, ব্রিজ-কালভার্ট, বাস্তা-ঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে নেয়ার জন্য প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস কাজ করছে। বাকিদের উদ্ধারের জন্য রংপুর থেকে সেনাবাহিনীর একটি টিম উদ্ধার কাজে সহযোগতিা করছে। দুগর্তদের জন্য জেলায় প্রায় শতাধিক আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার জায়গা ও ত্রাণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
রিপন/এমএএস/আরআইপি