বিনোদন

‘সোনাবন্ধু’ দেখতে হলে দর্শকদের ভিড়

সিনেমা হল কথাটি শুনলেই মনে হয় ঠান্ডা হাওয়া, আরাম চেয়ারে বসে তিন ঘণ্টার পরিপূর্ণ বিনোদনকেন্দ্র। তবে ঠাকুরগাঁওয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি মোটেও এমন আরামদায়ক ছিল না। দেশের অধিকাংশ সিনেমা হলের চিত্র দেখলে মনে হয় কেন মানুষ এত কষ্ট করে এখনও সিনেমা দেখতে আসেন।

কিন্তু হঠাৎ ঠাকুরগাঁও বলাকা সিমেনা হলের সেই আগের জৌলুস ফিরে এসেছে। ঠাকুরগাঁওয়ের মতো দেশের অন্যান্য জেলায় গতকাল ঈদুল আজহা উপলক্ষে বলাকা সিনেমা হলে মুক্তি পেয়েছে ‘সোনাবন্ধু’ সিনেমাটি।

সম্পূর্ণ মৌলিক ও দেশীয় লোকজ ঐতিহ্য ঘিরে তৈরি এই সিনেমাতে প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী বারী সিদ্দিকীর গান রয়েছে। যা ইতোমধ্যে ইউটিউবে ঝড় তুলেছে। সেই সঙ্গে ঠাকুরগাঁও বলাকা সিনেমা হলে ‘সোনাবন্ধু’ ছবিটি দেখার জন্য উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

রোববার বিকেলে সোনাবন্ধু ফ্যান ক্লাব ঠাকুরগাঁও শহরের রোড সুগার মিলের প্রায় শতাধিক যুবক সিনেমাটি হলে গিয়ে দেখেছেন।

গ্রাম বাংলার গল্প ও পটভূমি নিয়ে নির্মিত, মাহবুবা শাহরীন মিতু’র কাহিনী, সংলাপ ও চিত্রনাট্যে জাহাংগীর আলম সুমন পরিচালিত, জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা পরিমনি, পপি ও সুপার হিরোইন লামিয়া মিমো অভিনীত চলচ্চিত্র ‘সোনাবন্ধু’। সেই সঙ্গে ছোট পর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা ডি এ তায়েব’র বাংলা চলচ্চিত্রে অভিষেক এ সিনেমার মধ্য দিয়ে।

ছোট পর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা ডি এ তায়েব একজন পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি বাংলাদেশ পুলিশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার কর্মকাণ্ডে পুলিশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে বলে ঠাকুরগাঁও পুলিশের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

এবারের কোরবানি ঈদে সিনেমা দেখতে আসা এক চলচ্চিত্রপ্রেমী সেলিম বলেন, আগের সময়কার সিনেমাগুলোর গান, কাহিনীতে প্রাণ ছিল। এখন কোথায় সেই গল্প, গান বা নায়ক-নায়িকা। পরিবার নিয়ে সিনেমা দেখতে এসে লজ্জায় পড়তে হয়। আমি পাঁচ বছর পর ঈদে ‘সোনাবন্ধু’ সিনেমাটি দেখতে এসেছি। ইউটিউবে সিনেমার ট্রেইলার দেখে খুব ভালো লেগেছে। পরিবারসহ দেখার মতো একটা সিনেমা।

ঠাকুরগাঁও বলাকা সিনেপ্লেক্সের দায়িত্বে থাকা নুরুজ্জামান নুরু জানান, আকাশ-সংস্কৃতি উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের নির্মাতারা নকল সিনেমা বানানো শুরু করেন এবং দর্শক এই সিনেমাগুলো না দেখার কারণে সিনেমা হল বন্ধ হওয়া শুরু করেছে। কিন্তু সম্প্রতি কিছু বাংলা সিনেমার কারণে হলের সেই জৌলুস ফিরে এসেছে। গ্রামীণ পটভূমিতে তৈরি ‘সোনাবন্ধু’ ছবি আসলেই অসাধারণ।

‘সোনাবন্ধু’ সিনেমার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ও ডি এ তায়েবের চাচা ঠাকুরগাঁও জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেওয়ান লালন আহমেদ জানান, দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের স্বাদ সম্বলিত এই সিনেমাটি আমাদের গ্রাম বাংলার কথা বলে। আমাদের কৃষ্টিকে তুলে ধরে গ্রামীণ পটভূমিতে লোকজ প্রেম-বিরহ-বিচ্ছেদ ফুটে উঠেছে এই চলচ্চিত্রে।

তিনি আরও বলেন, আমার বিশ্বাস এই ছবিটি দর্শক গ্রহণ করবে এবং ঠাকুরগাঁও জেলার সকল শ্রেণিপেশার মানুষ সিনেমাটি দেখবে। সেই সঙ্গে পরিবারবর্গ সঙ্গে নিয়ে সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমাটি দর্শকদের দেখার জন্য অনুরোধ জানান তিনি।

জেলা প্রশাসক আব্দুল আওয়াল বলেন, কিছুদিন আগে দেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা সিনেমা ‘ভুবন মাঝি’ আমি নিজে হলে গিয়ে দেখেছি। অসাধারণ লেগেছে সিনেমাটি।

তিনি আরও বলেন, আমরা আগে লুকিয়ে হলে গিয়ে সিনেমা দেখতাম। বর্তমান প্রজন্ম সিনেমা হলবিমুখ। বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিভিন্ন প্রেক্ষাপট নিয়ে সিনেমা তৈরির জন্য নির্মাতাদের আহ্বান জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, গ্রাম বাংলার প্রেক্ষাপট আলোকে মুক্তি পাওয়া ‘সোনাবন্ধু’ সিনেমাটি খুব ভালোভাবে তৈরি করেছেন পরিচালক। সিনেমা হলের ঐতিহ্য ফিরে পেতে পরিবারসহ সকলকে হলে গিয়ে সিনেমা দেখার অনুরোধ করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, পুরনো কোনো সিনেমা হলের সামনে গেলে বোঝার উপায় নাই এটা একটা সময় সিনেমা হল ছিল। একটা সময় ছিল যখন সিনেমার টিকিটের জন্য হলের সীমানা পেরিয়ে মানুষের লাইন চলে যেত রাস্তার ওপর।

গ্রীষ্মের দুপুর কিংবা শীতের সকালে ধাক্কা-ধাক্কি, মারামারি, ব্ল্যাকারদের নির্বিকার মুখ হল্লা, হয়তো কখনও বৃষ্টিতে কাকভেঁজা শরীরে হাতের মুঠোয় একটা কিবা দুটো টিকিট পেয়ে আনন্দে ফেটে পড়তো মানুষ। এটা ছিল একটা সময়ের সিনেমা হলের দৃশ্য।

চলচ্চিত্রের এই বেহাল দশার কারণে একে একে মুখ থুবড়ে পড়েছে সিনেমা হলগুলো। ঠাকুরগাঁও শহরে টিকে আছে শুধু বলাকা সিনেমা হল।

সব মিলিয়ে জেলার দুটি একটি বাদে সকল প্রেক্ষাগৃহ এখন বন্ধ। চলচ্চিত্রশিল্প ধসের কারণেই এ পরিস্থিতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। তাই এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের সমন্বিত পরিকল্পনা ও উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন সিনেমা হল মালিকরা।

এএম/এমএস