চাল সিন্ডিকেট ভাঙতে কুষ্টিয়ায় চলছে দফায় দফায় অভিযান। রোববার সিন্ডিকেটের হোতা আব্দুর রশিদের মিলে অভিযানের পর সোমবার দুপুরে অভিযান চালানো হয় জেলার দ্বিতীয় বৃহত্তম চালকল বায়জীদ এগ্রো ফুডে। ধারাবাহিক অভিযানের পর কিছুটা হলেও প্রভাব পড়েছে কুষ্টিয়ার মোকামে। তবে মিলগেটে সব ধরনের চালের দাম কেজি প্রতি ২ টাকা করে কমলেও কুষ্টিয়ার খুচরা বাজারে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। এখনও বেশি দামেই চাল বিক্রি হচ্ছে।
মঙ্গলবার কুষ্টিয়ার খুচরা বাজারে গিয়ে দেখা যায়, মিনিকেট চাল ৬২ টাকা, বাশমতি চাল ৭০ টাকা, আটাশ ও কাজললতা ৫৬ টাকা এবং স্বর্ণা (মোটা) চাল ৪৪ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মোকামে অন্যদিনের তুলনায় ব্যাপারীর (ক্রেতা) সংখ্যাও কম ছিল। ওই অভিযানের পর থেকে মজুদদার চালকল মালিকদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। তারা মুজদ করা ধান রাতের আঁধারে সরিয়ে নিচ্ছে বলে একটি সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে চালের সংবাদে নাখোশ ব্যবসায়ীরা গণমাধ্যমের সামনে কথা বলতে চাইছেন না। চালকল মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুর রশিদের মিলে ঢুকতে গেলে আটকে দেয়া হয়, মুঠোফোনে কথা বলার চেষ্টা করলেও ফোন ধরেননি তিনি। তবে অনেক চেষ্টায় কথা হয় দু’জন হাস্কিং মিল মালিকের সাথে।
তারা জানান, রোববার রশিদের মিলে অভিযানের পর থেকেই বাজার কিছুটা পড়েছে। বাইরের ব্যাপারীদেরও উপস্থিতি কম। তাই কেনাবেচাও কমে গেছে। এসব কারণে মিনিকেট চালে কেজিতে অন্তত ১-২ টাকা কমেছে।
খাজানগরের আলিফ মিমি এগ্রো ফুডের মালিক আনোয়ার হোসেন জানান, এই মোকামে সোমবার মিনিকেটসহ সব ধরনের চালের দাম কেজিতে দেড় থেকে ২ টাকা কমে বিক্রি হয়েছে। মোকামে অভিযানের ফলে অনেকেই আতঙ্কে আছেন। একারণে ব্যাপারীর সংখ্যাও কম। তবে খুচরা বাজারে এই প্রভাব এখনও পড়েনি। ২-৩ দিনের মধ্যে খুচরা বাজারেও চালের দাম কমবে বলে তিনি জানান।
জেলার দৌলতপুরে অবস্থিত দ্বিতীয় বৃহৎত্তম চালকল বিশ্বাস এগ্রোফুড লিমিটেডেও বাজার নিয়ন্ত্রণ কমিটি অভিযান চালিয়েছে। সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক তানভীর রহমানের নেতৃত্বে এ অভিযান চালানো হয়। অভিযানে বাজার নিয়ন্ত্রণ কমিটির সদস্যবৃন্দ বায়জীদ বিশ্বাস এগ্রোফুড রাইস মিলে চাল বা ধানের অতিরিক্ত মজুদ আছে কিনা তা তদারকি করেন।
বিশ্বাস এগ্রোফুডের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জেলার বিভিন্ন রাইস মিলে বাজার নিয়ন্ত্রণ মনিটরিং কমিটির অভিযানের পর থেকে গত দুই তিন ধরে রাতের আঁধারে বায়জীদ বিশ্বাস এগ্রোফুড রাইস মিলের চাল ট্রাক ভর্তি করে গোপনে বিভিন্ন স্থানে পাচার করা হয়েছে। এছাড়াও রাইস মিলের ভিতরের একাধিক গুদামসহ মিলের পার্শ্ববর্তী স্থানের বিভিন্ন গোপন গুদামে চাল ও ধানের অতিরিক্ত মজুদের কথা জানিয়েছেন এলাকার লোকজন ও মিলের এক কর্মচারী।
অপরদিকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চালের মোকাম কুষ্টিয়ার খাজানগরের ছোট চালকল মালিকরা অভিযোগের আঙুল তুলেছেন বাংলাদেশ চালকল সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি কুষ্টিয়ার আব্দুর রশীদের মত বড় বড় চালকল মালিকদের দিকে।
খাজানগর মোকাম ঘুরে ছোট (হাস্কিং) চালকল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কুষ্টিয়ার আব্দুর রশীদের মত বড় বড় চালকল মালিকরা চায়লেই ব্যাংক থেকে শত শত কোটি টাকার ঋণ পান। তারা এই ঋণের টাকায় বোরো মৌসুমে ধান কাটা শুরু হলেই সারাদেশের মোকাম থেকে লাখ লাখ টন ধান কিনে গুদামাজাত করে। নিজস্ব চালকল ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে তারা এসব ধান গুদামজাত করে রাখে।
ক্ষুদ্র চালকল মালিকরা বলেন, কৃষকের ঘরে এখন কোনো ধান নেই। কারণ কৃষকরা ধান কাটার পর নিজেদের জন্য রেখে বাকি ধান বিক্রি করে ফেলে। সে কারণে এখন বাজারে ধানের দাম চড়া। তাই 'বাজার থেকে চড়া দামে ধান কিনে চাল প্রস্তুতের ফলে দাম বেশি পড়ছে' বলে যে কথা বলা হচ্ছে তা ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন খাজানগর মোকামের এসব ক্ষুদ্র চালকল মালিকরা।
আর এসবের মধ্যেই চালের দাম কমিয়ে আনাসহ বাজার সহনীয় রাখতে মঙ্গলবার থেকে কুষ্টিয়াতেও ওএমএসের চাল বিক্রি শুরু হয়েছে।
শহরের আমলা পাড়ায় কুষ্টিয়ার ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) হাবিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এ চাল বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পর ৬ ডিলারের মাধ্যমে ৩০ টাকা কেজি দরে সরকারি এই চাল বিক্রি কার্যক্রম শুরু হয়।
এসময় ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, চালের অতিরিক্ত দাম বৃদ্ধির এই সময়ে ওএমএসের চাল বিক্রির সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী হয়েছে। তবে এই চাল বিক্রিতে কোনো ডিলার অনিয়ম করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
আল-মামুন সাগর/এফএ/আইআই