দেশজুড়ে

ঝালকাঠিতে বাড়ছে আয়োডিনবিহীন লবণের ব্যবহার

সরকার আয়োডিনযুক্ত লবণের উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়াতে আমদানি করা লবণের ওপর ভর্তুকি দিয়ে মিলমালিকদের তা সরবরাহ করছে। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ’র সহযোগিতায় আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারে চলছে ব্যাপক প্রচারণা। তা সত্ত্বেও ঝালকাঠির বিভিন্ন হাটবাজারে ব্যাপকহারে বিক্রি হচ্ছে আয়োডিনহীন শিল্পলবণ (খোলা লবণ)। যা ব্যবহার হচ্ছে রান্নার কাজেও। ফলে বাড়ছে আয়োডিনের অভাব জনিত বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি। যদিও এ লবণ শুধুমাত্র গরুর খাদ্য ও চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহার করার কথা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঝালকাঠি জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের গরীব ও অসহায় মানুষগুলো রান্নার কাজে শিল্পলবণ ব্যবহার করছেন। এ লবণে আয়োডিন নেই জেনেও নির্বিঘ্নে তা ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে তারা আক্রান্ত হচ্ছেন আয়োডিনের অভাবজনিত বিভিন্ন রোগে।

ঝালকাঠির কাঠালিয়া, আমুয়া, নবগ্রাম, বাউকাঠিসহ বিভিন্ন জনবহুল এলাকার বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রকাশ্যেই বাজারে আয়োডিনবিহীন শিল্পলবণ (খোলা লবণ) বিক্রি হচ্ছে। সাদা বস্তাভর্তি শিল্পলবণ মিল থেকে এনে দোকানে বসেই ছোট পলিথিনে করে তা খাবারের জন্য প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে।

ক্রেতারা জানান, গরুর খাবারসহ রান্নায়ও ব্যবহার করা যায়। দাম কম হওয়ায় তারা আয়োডিযুক্ত প্যাকেট লবণের পরিবর্তে এ লবণ কিনছেন।

বাউকাঠি বাজারের মুদি ব্যবসায়ী আলাউদ্দিন জানান, তিনি প্রতি হাটে ৫০ থেকে ৬০ কেজি খোলালবণ বিক্রি করেন। প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) ১২শত টাকায় কিনে ২০-২২ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন। এ লবণ তারা ঝালকাঠির বিভিন্ন মিল থেকে সংগ্রহ করেন। বেশিরভাগ ক্রেতাই এ লবণ রান্নায় ব্যবহারের জন্য নিয়ে থাকেন।

বাউকাঠি ও আমুয়া বাজারের লবণক্রেতা আ. ছত্তার, হামেদ মিয়া, জাহানারা, ছোবাহান সিকদার, বেল্লাল হোসেন, নবগ্রামের জয়নাল মিয়াসহ আরও অনেকে জানান, খোলা লবণের ক্ষমতা বেশি, দাম কম। আর এতে কোনো কেমিক্যাল মেশানো হয় না। এ কারণে আমরা এ লবণ রান্নার কাজেও ব্যবহার করি।

নবগ্রাম বাজারের কুদ্দুস মল্লিক, আ. রহিম, আমুয়া বাজারের হালিমসহ আরও অনেক বিক্রেতা জানান, প্রতি হাটে আয়োডিনযুক্ত প্যাকেট লবণের চেয়ে খোলালবণ বেশি বিক্রি হয়। হাটের দিন প্যাকেট লবণ বিক্রি হয় ৮ থেকে ১০ কেজি। পক্ষান্তরে খোলা লবণ বিক্রি হয় ৫০ থেকে ৬০ কেজি।

শিল্পলবণ খাবারের কাজে ব্যবহার না করার জন্য সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে বস্তার গায়ে ‘মানুষের খাবারে ব্যবহারের জন্য নয়’ বা অন্য কোনো কথা লেখা হয় না কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে ঝালকাঠির ‘লাকি সল্ট’র মালিক হুমায়ুন কবির বলেন, এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আমরা শিগগিরই তা কার্যকর করার কথা ভাবছি।

ঝালকাঠি বিসিকের উপ-ব্যবস্থাপক জালিস মাহমুদ বলেন, মানুষের খাবার কাজে শিল্পলবণ বিক্রি প্রতিরোধে আমাদের কিছুই করার নেই। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে পারলেই এটা রোধ করা সম্ভব। তাদের নিজেদেরই বুঝাতে হবে আয়োডিন শরীরের জন্য কতটা প্রয়োজনীয়, এর অভাবে কী কী ক্ষতি হয়।

এ প্রসঙ্গে ঝালকাঠি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের সহকারী পরিচালক সাফিয়া সুলতানা বলেন, আমি শিল্পলবণ কোনোভাবেই ব্যবহার না করার জন্য খাবার হোটেলমালিকদের সবসময় সতর্ক করে থাকি। তবে গ্রামপর্যায়ে এ নিয়ে আরও প্রচার-প্রচারণা বাড়ানো হলে মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে।

ঝালকাঠি সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. গোলাম ফরহাদ জানান, আয়োডিন একটি রাসায়নিক পদার্থ যা আমাদের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান থাইরয়েড হরমোন তৈরিতে সহায়তা করে। শরীর নিজে আয়োডিন তৈরি করতে পারে না। তাই আমাদের খাবারের সঙ্গে এটি গ্রহণ করতে হয়।

তিনি আরও বলেন, থাইরয়েড হরমোন প্রধানত মস্তিষ্ক, মাংসপেশী, হৃৎপিণ্ড, বৃক্ক ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসমূহের স্বাভাবিক ক্রিয়াকলাপে অপরিহার্য। আয়োডিনের অভাবে গলায় গলগণ্ড (টিউমারের মতো) রোগ দেখা দিতে পারে।

মো. আতিকুর রহমান/এমএমজেড/আইআই