কক্সবাজারের ঈদগাঁও-ঈদগড় সড়কে অপহরণের ৯৯ ঘণ্টার মাথায় নিজেদের বুদ্ধিমত্তায় পালিয়ে এসেছেন সেই দুই যুবক। অপহৃত হেলালের চাচাত ভাই বেলাল উদ্দিন ও ঈদগড় পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এএসআই মোরশেদ আলম তাদের ফিরে আসার খবরটি নিশ্চিত করেছেন।
শনিবার রাত একটার দিকে ঈদগড়ের ছগিরাকাটা এলাকার পশ্চিমের পাহাড় থেকে বেরিয়ে স্থানীয়দের সহায়তায় বাড়ি ফিরেছেন তারা। ডাকাতের প্রহার ও অভুক্ত থাকার কারণে দু’জনই শক্তিহীন হয়ে গেছেন।
অপহরণের শিকার হেলাল ও নুরুল আমিন বলেন, ‘২৮ নভেম্বর অপহরণের শিকার হওয়ার পর প্রায় ২ ঘণ্টা হাঁটিয়ে আমাদের আস্তানায় নিয়ে যায় অপহরণকারীরা। সেখানে রামু গর্জনিয়া থেকে অপহৃত অপর দু’কৃষককে চোখ বাঁধা অবস্থায় দেখেছি। ২৯ নভেম্বর ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা হাতে আসার পর ওই দু’কৃষককে ছেড়ে দিয়ে আসে অপহরণকারীরা। বিকেলে আমাদের প্রহার করে টাকা চাইতে বলে। ’
তারা বলেন, ‘ আমাদের উদ্ধারে পুলিশের অভিযানের খবর জানতে পেরে তারা নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। কখনো চোখ-হাত বেঁধে আবার কখনো চোখ খোলা রেখে মাইলের পর মাইল পাহাড় ডিঙানো হয়েছে। বিভিন্ন দিক থেকে পুলিশি অভিযান হচ্ছে বুঝতে পেরে তারা মূল আস্তানা থেকে আমাদেরকে পানিশ্যাঘোনা গ্রামের পশ্চিমে আতর আলীর হেডম্যানের ফিশারির পাশের দূর্গম পাহাড়ে ২ দিন ২ রাত রেখেছিল। দেন দরবারে ৪৪ হাজার টাকা পাওয়ার পর ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে বিরোধ হওয়ায় আমাদেরকে না ছেড়ে আরো দু’লাখ টাকা দাবি করে।
পরে পুলিশি অভিযানের পাশাপাশি র্যাবের অভিযান হবে এটি সোর্সের মাধ্যমে জানতে পেরে আমাদের নিয়ে শনিবার রাতে তারা হাঁটা দেয়। মাঝপথে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ে সবাই। এক পর্যায়ে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে প্রথমে মুখ দিয়ে হাতের বাঁধন ও পরে পায়েরটা খুলে আমরা পূর্ব দিকে হাঁটা শুরু করি। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক হাঁটার পর ছগিরাকাটা এলাকায় পৌঁছে ঈদগড়-বাইশারী সড়ক পাই। ক্লান্ত হয়ে সড়কেই শুয়ে পড়ি আমরা। স্থানীয় এক লোক আমাদের দেখে চিৎকার করলে পার্শ্ববতী বাড়ির লোকজন এসে আমাদের পরিচয় পেয়ে খাবার দেয় এবং বাড়িতে ফোন করে। খবর পেয়ে বেলাল মেম্বার, মনিসহ অন্যরা এসে বাড়িতে নিয়ে যায়।’
তারা জানান, ‘অপহরণকারী দলের ৯ সদস্যের হাতে ৪টি লম্বা বন্দুক ও ধারালো অস্ত্র থাকত। রাতে এক বেলা খাবার দিলেও দিনে রাতে অপহরণকারীরা কয়েকবার ইয়াবা খেতে বসত যা তাদের ভাষায় ‘ভাত’ হিসেবে উচ্চারণ করতো। খাটো সাইজের লিডার যুবকটি অপহৃতদের ‘গরু’ বলে সম্বোধন করতো।’
সাবেক মেম্বার বেলাল উদ্দিন জানান, অপহৃত দুজনই দরিদ্র। নুরুল আমিন শ্রমজীবী আর হেলাল মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। তাদের পরিবার থেকে ১০ হাজার করে বিশ হাজার ও বাজারের ব্যবসায়ী এবং পাড়ার অন্যদের সহযোগিতায় পাওয়া সর্বমোট ৪৪ হাজার টাকা অপহরণকারীদের চাহিদামতো তিনটি বিকাশ নম্বরে দেয়া হয়। কিন্তু এরপরও তাদেরকে ছাড়া হয়নি। শনিবারও পুলিশের অভিযান চালানো হয়। চাওয়া হয় র্যাবের সহযোগিতা।
তিনি বলেন, রোববার সকাল থেকে র্যাব কম্বাইন্ড অপারেশনের উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু শনিবার রাত একটার দিকে ছগিরাকাটা এলাকা থেকে ফোনে খবর পায় দু’জনকে রাস্তায় বিধ্বস্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। তখন লোকজনসহ গিয়ে তাদের শনাক্ত করে বাড়ি নিয়ে আসি। খবর পেয়ে পুলিশ বাড়ি এসে তাদের সঙ্গে কথা বলেন। দু’জনই অসুস্থ হওয়ায় ডাক্তার এনে তাদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
তবে রামুর ঈদগড় পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এএসআই মোরশেদ আলম বলছেন অন্য কথা। তিনি বলেন, ‘ছগিরাকাটার পশ্চিমের পাহাড়ে ডাকাতদল অবস্থান করছে এমন খবরে অভিযান শুরু করলে ডাকাতদল অপহৃতদের রেখে পালিয়ে যায়। পুলিশ সেখান থেকে অপহৃত দু’যুবককে উদ্ধার করে ক্যাম্প হেফাজতে নিয়ে আসে।’
ঈদগাঁও পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মহিউদ্দিন বলেন, যেভাবেই হোক একটি উৎকণ্ঠার অবসান হয়েছে। এখন অস্থিতিশীল পরিবেশ বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থায় ঊর্ধ্বতন মহলের নির্দেশনা পালন করা হবে।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার (২৮ নভেম্বর) রাত সোয়া ১০টার দিকে ঈদগাঁও-ঈদগড় সড়কের গজালিয়া পানেরছরা ঢালা এলাকায় সিএনজি ট্যাক্সি ও মোটরসাইকেল থামিয়ে ডাকাতির পর কক্সবাজারের রামু উপজেলার ঈদগড় ইউনিয়নের বায়তুশ শরফ এলাকার খুইল্যা মিয়ার ছেলে নুরুল আমিন ও মৃত আছহাব মিয়ার ছেলে হেলাল উদ্দিনকে (২০) অপহরণ করে নিয়ে যায় অপহরণকারীরা। ২০১৬-২০১৭ সালে ঈদগড়-ঈদগাঁও-বাইশারী সড়কে এ পর্যন্ত প্রায় ৪০ জন লোক অপহরণের শিকার হন। তাদের উদ্ধারে প্রশাসন অভিযান চালালেও মুক্তিপণ ছাড়া কেউই উদ্ধার হয়নি। তাই অপহরণকারীদের নিমূর্ল করতে যৌথ অভিযানের দাবি ভুক্তভোগীদের।
সায়ীদ আলমগীর/এফএ/আইআই