পরীক্ষার আগের রাতে মিথ্যা মামলায় তার বাবাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। পরের দিন তার এইচএসসি পরীক্ষা শুরু। একদিকে বাবাকে নিয়ে চিন্তা, অন্যদিকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। অবশেষে সিদ্ধান্ত নিল ছোট ভাই-বোনরা যেন ভেঙে না পড়ে তাদের সান্তনা দেয়া প্রয়োজন। সারারাত তাদেরকে সান্ত্বনা দিকে সকালে পরীক্ষা দিতে যায় শিরিন আক্তার। এমন বিপদকে অতিক্রম করে এবার উপজেলার বড়খাতা ডিগ্রি কলেজ থেকে প্রায় ৩শ জন ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে মানবিক শাখা থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে শিরিন। আর তার এই ফল এলাকার প্রতিটি মানুষকে অবাক করে দিয়েছে।শুধু তাই নয়, পরীক্ষার আগে তিন বোন পালা করে প্রতিদিন বিকেলে তাদের ক্ষুদ্র মুদির দোকানে বসেছে। দিনে যা বিক্রি হয় তা দিয়েই কোনোমতে সংসার চলে তাদের। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার বড়খাতা দোয়ানী মোড়ের পার্শ্বে তিন বোনের ক্ষুদ্র মুদির দোকানটিতে যে কারো চোখ আটকে যাবে। কারণ এ দোকানে তাদের বাবা ছাড়াও তিন বোন প্রতিদিন নিয়ম করে বিক্রয়কর্মীর কাজ করে। এ দোকানের উপর নির্ভর করে চলে পরিবারের নয় সদস্যের ভরণপোষণ। দারিদ্রতার শেষ নেই, সংসারে শুধুই অভাব আর অভাব। জমি বলতে বাড়ি ভিটে সাত শতক মাত্র। বাবা জহুরুল হক মণ্ডল, মা গৃহিণী নুরজাহান বেগমসহ ছয় বোন এক ভাইসহ নয়জনের পরিবার তাদের। অভাবের সংসারে লেখাপড়ার খরচ মেটাতে বাবার সঙ্গে মেজবোন শিরিন আক্তার মুদির দোকান করে। পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যেত। শত কষ্টে তার পড়াশোনা থেমে যেতে পারতো। তবুও এগিয়ে গেছে শিরিন।মেধাবী শিরিন আক্তার ২০১৩ সালের এসএসসি পরীক্ষায় মানবিক শাখা থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করে। তার বড় বোন শারমিন আক্তার বড়খাতা ডিগ্রি কলেজে বিএ প্রথম বর্ষের ছাত্রী, ছোট বোন শিউলী আক্তার বড়খাতা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণিতে ও সবার ছোট বোন মোরশেদা আক্তার ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। ছোট ভাই রাকিবুল হাসান দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়েশোনা করে। আর দুই বোন ছোট। মুদির দোকান করে পাঁচ ভাই-বোনের পড়াশোনা চালাতে তার বাবাকে হিমশিম খেতে হয়। ধার-দেনা করে প্রতি মাসে ছেলে মেয়েদের পড়াশোনার খরচ বহন করেন তিনি।শিরিন আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, আমার সবচেয়ে কষ্টের দিন হলো পরীক্ষার আগের দিন মিথ্যা মামলা দিয়ে আমার বাবাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। তখন আমরা পরিবারের সকলেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। অনেক কষ্টে পরীক্ষা দিয়েছি। আজ ভালো ফলাফল আমাকে ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার স্বপ্ন দেখায়। তাই দারিদ্রতার মাঝেও স্বপ্ন দেখি উচ্চতর ডিগ্রি নেয়ার। কিন্তু এ অদম্য মেধাবীর কি সে স্বপ্ন পূরণ হবে?অভাবের সংসারে পড়াশোনার খরচ চালিয়ে শিরিন আক্তারে ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার স্বপ্ন আর সাধকে স্বার্থক রূপ দেয়া যাবে কী না এমন দুশ্চিন্তার অন্ত নেই মা নুরজাহান বেগমের।শিরিনের বিষয়ে বড়খাতা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ নূরে এলাহী বকুল জাগো নিউজকে জানান, ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে শিরিন আক্তার খুবই মেধাবী। সে পড়াশোনায় খুবই আগ্রহী। আমি তার মঙ্গল কামনা করি।এমজেড/এমএএস/এমআরআই