দেশজুড়ে

নারী শিক্ষকদের অশ্লীল ছবি দেন পিটিআইয়ে প্রশিক্ষণার্থীরা

‘আমরা ডিপিএড ২০১৮-২০১৯ শিক্ষাবর্ষ’ নাম দিয়ে ফেসবুকে গ্রুপ খুলে প্রশিক্ষণরত শিক্ষকদের গ্রুপে যুক্ত করে মেসেঞ্জারে অশ্লীল বার্তা দিচ্ছেন কুড়িগ্রাম প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে (পিটিআই) প্রশিক্ষণরত কতিপয় শিক্ষক।

একই সঙ্গে প্রশিক্ষণরত নারী শিক্ষকদের ফেসবুক মেসেঞ্জারে অশ্লীল বার্তা ও ছবি এবং ভিডিও পাঠিয়ে উত্ত্যক্ত করছেন এসব শিক্ষক। বিশেষ করে নারী শিক্ষকদের নিয়ে অশ্লীল মন্তব্য ও উত্ত্যক্ত করাই এই গ্রুপের মূল বিষয়। গ্রুপ ছেড়ে চলে গেলে কিংবা ব্লক করলে ওই নারী শিক্ষককে নিয়ে বাজে মন্তব্য করেন তারা।

শুধু মেসেঞ্জারেই সীমাবদ্ধ নয়; ক্লাসে কিংবা ইনস্টিটিউট ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষকদের অশালীন ইঙ্গিতের মাধ্যমে যৌন নিপীড়ন করা হয়। ফলে চরম যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন পিটিআইয়ে প্রশিক্ষণরত নারী শিক্ষকরা। এ নিয়ে প্রতিবাদ করলে বিপদে পড়তে হয় নারী শিক্ষকদের।

পিটিআই সূত্র জানায়, স্থানীয় ও সরকারি দলের পরিচয় দিয়ে এসব কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন এসব শিক্ষক। তাদের টার্গেট বিভিন্ন উপজেলা থেকে প্রশিক্ষণ নিতে আসা নারী শিক্ষকরা। নারী শিক্ষকদের দিনের পর দিন হয়রানি করলেও লোকলজ্জায় কিংবা ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন না।

প্রশিক্ষণরত নারী শিক্ষকরা জানান, ২০১৮-২০১৯ শিক্ষাবর্ষে পিটিআইয়ে প্রশিক্ষণার্থীদের নিয়ে একটি গ্রুপ খোলা হয়েছে। সেই গ্রুপের মেসেঞ্জারে বেশ কয়েকজন প্রশিক্ষণরত পুরুষ শিক্ষক আঞ্চলিক ভাষায় অশ্লীল কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছেন। গ্রুপ ছেড়ে গেলে আবার যুক্ত করা হয়, ব্লক করলে বাজে মন্তব্য করা হয়। তাদের এমন কর্মকাণ্ডে বিব্রত নারী শিক্ষকরা।

মুকুল নামের এক প্রশিক্ষণার্থী মেসেঞ্জারে স্কেচ করা একটি মেয়ের ছবি দিয়ে বুঝিয়েছেন, ‘মেয়েরা প্রেমে পড়ার আগে তাদের শরীর কেমন থাকে এবং প্রেমে পড়ার পর কেমন হয়।’

লিয়াকত নামের আরেক প্রশিক্ষণার্থী গর্ভবতী নারীর পেটে পুরুষের চুম্বনের ছবি দিয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। তার ওই ছবিতে অন্য পুরুষ শিক্ষকরা আঞ্চলিক ভাষায় নোংরা মন্তব্য করেছেন। নারীদের শারীরিক ভাষা ব্যবহারের পাশাপাশি তারা একে অন্যের স্ত্রীকে ধার নিতে চান বলেও মন্তব্য করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক প্রশিক্ষণার্থী নারী শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শিক্ষক নামের মর্যাদাকর শব্দটির অপব্যবহার করছেন এখানে প্রশিক্ষণরত পুরুষ শিক্ষকরা। তারা নারী শিক্ষকদের বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত করেন। কখনো ফেসবুক গ্রুপে কখনো ক্যাম্পাসের ভেতরে। তারা স্থানীয়, আমরা সবাই অন্য স্থান থেকে ট্রেনিং নিতে এসেছি। প্রতিবাদের সাহস পাচ্ছি না। দু’একজন প্রতিবাদ করলে তাদের হুমকি দেয়া হয়।

নারী শিক্ষকদের অভিযোগ, ক্লাসে অশ্লীল কথাবার্তা থেকে শুরু করে অশালীন অঙ্গভঙ্গি করে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে কতিপয় পুরুষ শিক্ষক। এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করলে আরও বেশি উত্ত্যক্ত করেন তারা। যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। একপ্রকার বাধ্য হয়েই এসব হজম করছেন নারী শিক্ষকরা। স্যারদের কাছে অভিযোগ দিলেও বিপদ। নারী শিক্ষকদের ওপর নেমে আসে বিভিন্ন ঝামেলা। বাইরের উপজেলা থেকে যারা আসে তাদেরকে বেশি টার্গেট করা হয়। যারা এরকম অশ্লীল কথাবার্তা বলেন বা লেখেন তারা সবসময় স্থানীয় ও সরকারদলীয় লোক পরিচয় দিয়ে প্রভাব খাটিয়ে পিটিআইয়ে চলাচল করেন। বিগত বছরগুলোতেও ডিপিএড প্রশিক্ষণার্থীদের এরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। তারা কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় নতুনরা কোনো অভিযোগ করেন না।

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি অ্যাডভোকেট আহসান হাবীব নীলু বলেন, শিক্ষকদের কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ কাম্য নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যমে তারা শিক্ষক সমাজের মর্যাদাহানি করেছেন। এদের চিহ্নিত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ কুড়িগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক প্রতিমা চৌধুরী বলেন, কর্মক্ষেত্রে নারীরা সবসময়ই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে আসছেন। এক শ্রেণির পুরুষরা নারীদেরকে ভোগের সামগ্রী ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেই পারে না। এদের অসভ্যতা ও লালসার কারণে পদ পদে লাঞ্ছিত হচ্ছেন নারীরা। এদের মুখোশ উন্মোচন করা দরকার।

এ ব্যাপারে কুড়িগ্রাম পিটিআই ইনস্টিটিউটের সুপার আবু আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সানাউল্লাহ বলেন, ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে অশ্লীল বার্তা আদান-প্রদানের বিষয়টি আমার জানা নেই। কে বা কারা গ্রুপটি চালাচ্ছেন আমি জানি না। শিক্ষকরা যদি এর অপব্যবহার করে থাকেন তাহলে বিষয়টি দুঃখজনক। এছাড়া ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষকদের উত্ত্যক্ত করলে কেউ যদি অভিযোগ দেয় তাহলে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এএম/আরআইপি