একের পর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে পঞ্চগড়-বাংলাবান্ধা মহাসড়ক। অদক্ষ চালক আর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অবহেলাকে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করছেন স্থানীয়রা। সর্বশেষ শুক্রবার রাতে ১০ জন নিহতের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।
এদিকে এ দুর্ঘটনায় হতাহতদের পরিবারে চলছে কেবলই শোকের মাতম। শনিবার সকালে সরেজমিন সদর উপজেলার সাতমেরা ইউনিয়নের জোতহাসনা গ্রামের সাইদুল ইসলামের বাড়ি গিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে তিনি শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভুগছেন। তার বড় মেয়ে অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া সেলিনা আক্তারও দীর্ঘদিন ধরে রক্তশূন্যতায় ভুগছে। সাত বছর বয়সী ছেলে ইয়াছিন আলীকে নিয়ে মেয়ের জন্য ওষুধ নিতে পঞ্চগড় শহরে গিয়েছিলেন সাইদুলের স্ত্রী লাভলী বেগম (২৯)।
কিন্তু মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় ছেলে ইয়াছিন আলীসহ লাভলী আক্তার মারা যান। বেলা ১১টায় বাড়ির পাশে গোরস্থানে তাদের দাফন করা হয়েছে। লাভলী আক্তার এবং সাইদুল ইসলামের সংসারে ইয়াছিন আলী ছিল একমাত্র ছেলে। তাদের আরও দুই মেয়ে স্কুলে লেখাপড়া করে।
স্ত্রী ও সন্তান হারা সাইদুল ইসলাম বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। আমার স্ত্রী লাভলী আক্তারের উপর সংসারের সব দায়িত্ব ছিল। সে কাজ করে সংসার পরিচালনার পাশাপাশি আমাদের দেখভাল করত। এখন কি হবে আমাদের? কি নিয়ে বাঁচবো আমরা। আমি এই হত্যাকাণ্ডের উপযুক্ত বিচার চাই।
ভজনপুর বানিয়াপাড়া এলাকার সাদেকুল ইসলাম বলেন, গাড়িতে ৪৫ থেকে ৫০ জন যাত্রী ছিল। ছিট না পেয়ে আমি দাঁড়িয়েছিলাম। হঠাৎ একটি ধাক্কা অনুভব করি এবং গাড়ির মেঝেতে পড়ে যাই। এরপর বুঝতে পারি আমার শরীরের উপর ৫/৭ জন পড়ে আছে। এরপর দেখি এদের মধ্যে তিন জনের মাথা নেই। ঘটনা বুঝে ওঠার আগেই আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।
পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি দুর্ঘটনার শিকার দশমাইল সাহেবীজোত এলাকার মাটিকাটা শ্রমিক এরাজুল ইসলাম (৩৫) বলেন, দশমাইল বাজার এলাকায় মিনিবাস থামার জন্য ধীরগতি ছিল। আমি বাজারেই নামার জন্য গাড়ির দরজার কাছে দাঁড়িয়েছিলাম। পাশে একটি বাস দাঁড় করানো ছিল। এ সময় পাগলের মতো বিদ্যুতের খুঁটিবাহী ট্রাকটি ছুটে আসছিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ট্রাকটি আমাদের বাসটিকে সামনাসামনি ধাক্কা দেয়। আমি ছিটকে পড়ে যাই। এরপর আর কিছুই বলতে পারি না।
স্থানীয়রা জানান, গত মাসের মাঝামাঝি সময়ে পঞ্চগড়-ঢাকা মহাসড়কের বোদা বাইপাস মোড়ে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার মির্জা আবুল কালাম দুলাল নিহত হন সড়ক দুর্ঘটনায়। এর এক সপ্তাহ আগে দুই শিশুসহ একই পরিবারের তিন জন মারা যান। এর আগে এই মহাসড়কেই সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের ৬ জন মারা যান।
মহাসড়কে একের পর এক মৃত্যুর মিছিল বাড়লেও যেন দেখা কেউ নেই। অদক্ষ চালক এবং ওভারলোড নিয়ে বেপরোয়া যান চলাচলের কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটছে বলে দাবি স্থানীয়দের। এসব দাবি নিয়ে স্থানীয় সামাজিক সংগঠন একাধিকবার মানববন্ধনসহ আন্দোলন সংগ্রাম করেও কোনো প্রতিকার হয়নি।
পঞ্চগড় নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক এরশাদ হোসেন সরকার বলেন, আন্দোলন সংগ্রামের পরও পঞ্চগড়-বাংলাবান্ধা মহাসড়কে মৃত্যু মিছিল থামছে না। এই মহাসড়কে অসংখ্য মানুষের প্রাণ গেছে।
অপরদিকে দুর্ঘটনার পরপরই পালিয়ে যান বাস ও ট্রাকের চালক। সড়ক দুর্ঘটনায় ১০ জন নিহতের ঘটনায় শনিবার বিকেল পর্যন্ত চালক বা পরিবহন মালিককে আইনের আওতায় আনতে পারেনি পুলিশ। বিকেলে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো মামলাও করা হয়নি। তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানায় পুলিশ বিভাগ।
হাইওয়ে পুলিশের বগুড়া অঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, শনিবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। এখানে মূলত বাজারের পাশে দাঁড় করানো বরযাত্রীর গাড়িটির জন্য দুর্ঘটনাটি ঘটে। যথাযথ আইনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, পঞ্চগড়ে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আগে ঘটেনি। তাৎক্ষণিক নিহতের প্রত্যেক পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে নগদ প্রদান করা হয়। আরও সহযোগিতার জন্য ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
উল্লেখ্য, শুক্রবার রাত পৌনে ৮টার দিকে তেঁতুলিয়া-ঢাকা মহসড়কের দশমাইল বাজার এলাকায় ভাইবোন পরিবহন নামে একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় জেমকন লিমিটেডের বিদ্যুতের খুঁটিবাহী একটি ট্রাকের। দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই ৫ জন নিহত হন। পরে হাসপাতলে নেয়ার পর দুই শিশুসহ আরও ৫ জন মারা যান। গুরুতর আহত হন ১৫ জন।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক নিহতদের পরিবার প্রতি ২০ হাজার টাকা করে নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
এফএ/এমএস